মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

City Bank CityTouch

৪৮ বছরের ইতিহাসকে ভবিষ্যতের আয়না বানানোর সময় বিএনপির

মো. শামসুল আলম
প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

শেয়ার করুন:

৪৮ বছরের ইতিহাসকে ভবিষ্যতের আয়না বানানোর সময় বিএনপির

সেপ্টেম্বরের প্রথম দিনটি বাংলাদেশের রাজনীতির উঠোনে একটু বেশি রঙিন—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮-এর সেই ১ সেপ্টেম্বর থেকে দলটি বহু নদীর জল দেখেছে; আজ সে নিজেই রাষ্ট্রক্ষমতায়, ফলে জন্মদিনের আনন্দের সঙ্গে দায়িত্বের হিসাবটিও এসে বসেছে একই পিঁড়িতে। পাঁচ দিনের কর্মসূচিতে পতাকা উত্তোলন, শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা, আলোচনা, বৃক্ষরোপণ ও মাছ অবমুক্তির আয়োজন আছে—অর্থাৎ রাজনীতির সঙ্গে গাছ ও মাছকেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছে; এ মন্দ কী! কিন্তু সংসদীয় দলের বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা, সার ও বিদ্যুৎ সংকটের কথা উঠেছে—জন্মদিনে কেক কাটার চেয়ে এই তালিকাটিই বোধ হয় সরকারের জন্য বেশি জরুরি। কারণ রাষ্ট্রের আসল জন্মদিন প্রতিদিন, যখন বাজারের মানুষ একটু স্বস্তি পায়, কৃষক সার পায়, কারখানায় বিদ্যুৎ জ্বলে এবং নাগরিক পুলিশ দেখে ভয় নয়, ভরসা পায়।

অর্থনীতিও আজ বেশ দার্শনিক ভঙ্গিতে সরকারকে বলছে-‘বাবাজি, বক্তৃতা পরে, আগে আমাকে একটু সামলাও।’ জ্বালানি সংকটে শিল্পোৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির খবর, আর এর মধ্যেই মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে নবম জাতীয় পে-স্কেল। তিন ধাপে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, কোনো কোনো গ্রেডে প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত।

সরকারি কর্মচারীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান নিঃসন্দেহে আনন্দের সংবাদ; কিন্তু অর্থনীতির খাতায় আনন্দের পাশেই একটি প্রশ্নচিহ্নও বসে যায়—এই অতিরিক্ত অর্থ বাজারে প্রবাহিত হলে তার চাপ সামলাবে কে? বেসরকারি খাতকে বেতন বাড়ানোর চাপ নিতে হবে, আর বাজারও হয়তো নতুন বেতনের গন্ধ পেয়ে নিজের পকেটটা একটু ভারী করতে চাইবে। ফলে বেতন বাড়লেই যেন বাজারের দরও সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে দৌড় না দেয়—এই ভারসাম্য রক্ষা এখন সরকারের বড় পরীক্ষা।

এদিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা আজ থেকে চাহিদামতো মূলধন তুলতে পারবেন। দীর্ঘদিনের উদ্বেগের পর যদি ব্যাংকের দরজায় মানুষের দীর্ঘশ্বাসের বদলে স্বস্তির নিশ্বাস শোনা যায়, তবে সেটিও অর্থনীতির এক ধরনের কবিতা। কিন্তু কবিতা লিখতে হলে কাগজের পাশাপাশি কলমটিও ঠিক রাখতে হয়। কৃষকের ঘরে সার পৌঁছানো, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ দেওয়া, উৎপাদন সচল রাখা এবং বাজারে সরবরাহের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা—এই কাজগুলো না হলে বেতন বাড়ার আনন্দটিও শেষ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির ভিড়ে নিজের ঠিকানা হারাতে পারে।

কৃষকের খাতায় অবশ্য কবিতার চেয়ে বাস্তবের অঙ্কই বেশি। এফএওর আশঙ্কা, আগামী কয়েক মাসে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কৃষিভিত্তিক পরিবার জরুরি সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে পড়তে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকদের জন্য তুলনামূলক সুবিধাজনক শুল্ক পরিস্থিতি নতুন আশার দরজা খুলতে পারে। কিন্তু সেই দরজায় ঢুকতে হলে শিল্পকে গ্যাস-বিদ্যুৎ দিতে হবে, উৎপাদনকে সচল রাখতে হবে। আমাদের অর্থনীতি যেন একই সঙ্গে অ্যাক্সেলেটর ও ব্রেক—দুটোই চাপা গাড়ি; চালকের কাজ তাই শুধু গন্তব্যের নাম বলা নয়, কখন কোন প্যাডেলে চাপ দিতে হবে সেটিও জানা।

রাষ্ট্রের আরেকটি আয়না সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতা। সেখানে আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ যেমন উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুমবিরোধী আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাড়াহুড়ো না করে বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীদের মতামত নেওয়ার আহ্বান এসেছে। কথাগুলো আলাদা মনে হলেও আসলে একই জায়গায় গিয়ে মেলে—রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বাড়ে, তার সংযমের প্রয়োজনও তত বাড়ে। আইন শুধু বইয়ের পাতায় থাকলে রাষ্ট্র হয় কাগজের; আর আইন যদি নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদায় পৌঁছায়, তখনই রাষ্ট্র রক্ত-মাংসের হয়ে ওঠে।

দেশের সীমানার বাইরে পৃথিবীও আজ বেশ অস্থির। কিরগিজস্তানের বিশকেকে চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরানসহ শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার নেতারা বসেছেন—এককেন্দ্রিক পৃথিবী ধীরে ধীরে বহু-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, তারই আরেকটি দৃশ্য যেন সেখানে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা আবার হরমুজের জলকে অশান্ত করে তুলেছে। দূরের ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ শেষ পর্যন্ত তেলের দামে, জ্বালানির সংকটে এবং আমাদের কারখানার চুল্লিতে এসে ধাক্কা খায়। পৃথিবী ছোট হয়েছে—এতটাই ছোট যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের ঝগড়া ঢাকার বাজারে এসে চায়ের কাপ হাতে বসে পড়ে।

আজ বিএনপির জন্মদিন। জন্মদিনে তাই একটি পুরোনো প্রশ্ন করা যাক—মানুষ দল করে রাষ্ট্র পাওয়ার জন্য, না রাষ্ট্রকে মানুষের করে দেওয়ার জন্য? প্রথমটির উত্তর হলে উৎসব শেষ হয় মঞ্চে; দ্বিতীয়টির উত্তর হলে উৎসব শেষ হয় মানুষের ঘরে। ক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বিরোধীকে হারানো নয়, নিজের লোককে সংযত রাখা; সবচেয়ে বড় সাফল্য মিছিলের দৈর্ঘ্য নয়, মানুষের মুখের হাসির দৈর্ঘ্য। আজকের দিনে বিএনপির জন্য শুভেচ্ছা রইল—দলটি যেন নিজের ৪৮ বছরের ইতিহাসকে শুধু স্মৃতির অ্যালবাম না বানিয়ে ভবিষ্যতের আয়না বানায়। তাহলেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পতাকা কেবল দলীয় কার্যালয়ে নয়, মানুষের মনেও উড়বে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর