বর্তমান রাজনৈতিক ও দেশের নানামুখী বিতর্কের মধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের সকল পদক্ষেপ ইতিবাচকভাবে বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা রয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমদানিনির্ভর নীতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে যে মাফিয়াতন্ত্র তৈরি হয়েছিল, তার পরিস্থিতির বাস্তব চিত্রটি এখন দৃশ্যমান। সাথে অর্থ পাচার, ব্যাংক থেকে অবৈধভাবে নেওয়া ঋণের চাপ এবং লাগামহীন অর্থনৈতিক লুটপাটের ফলে আজকের এই অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। তা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে সরকারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং সার ও জ্বালানি সরবরাহে ত্রুটির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পাশাপাশি দলের রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দের জনসম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরি। জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিও দরকার।
দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা কাটিয়ে ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণভার সামলে দলের চেয়ারম্যান দেশ পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। পাশাপাশি, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলে একাধিক প্রার্থী সামলানো বিএনপির জন্য এক বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই তাদেরকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। যে কোনো সংকট উত্তরণে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ ও বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল অবলম্বন করার বিকল্প নেই।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও ২৪ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর জন্ম নেওয়া এনসিপির রাজনৈতিক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচির সাথে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দল (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র দলগুলোর রাজনৈতিক লক্ষ্য ও চাহিদার মৌলিক তফাৎ রয়েছে। এই তফাৎটি সাধারণ জনগণ দুইভাবেই উপলব্ধি করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন।
উল্লেখ্য, বিগত একতরফা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে ছিল জাতীয় পার্টি।
প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর যাবৎ গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। এই সংগ্রাম, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং জন-আকাঙ্ক্ষার তফাৎটি সবার কাছেই পরিষ্কার।
গণতন্ত্রের মাতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ত্যাগ এবং সুদূর লন্ডন থেকে বিএনপির দ্বিতীয় প্রধান নেতা (বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমানের ১৭ বছরের নিরলস প্রচেষ্টা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বর্তমানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি)-সহ দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং দেশব্যাপী প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মী মামলার আসামি হয়েছেন; অনেকে খুন ও গুমের শিকার হয়েছেন।
যুগপৎ আন্দোলনে শরিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন, মামলা ও হামলার মধ্য দিয়ে অবশেষে ২৪ জুলাইয়ের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ঘটে।
গেল ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে এবং দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখে।
এই সময়ে, দলের ৪৮ বছর বয়সে, দলের প্রয়োজনে, দেশের কল্যাণে এবং রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে সর্বস্তরে যত দ্রুত গোপন ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব তৈরি হবে—ততই দল, সরকার এবং দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে, যাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটি 'অনিবার্য বাস্তবতা' হিসেবে দেখেন। দলটির রয়েছে ঐতিহাসিক ভিত্তি ও সুদীর্ঘ জনসমর্থন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিএনপি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছে। দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির ব্যাপক কর্মী-সমর্থক ও সুসংহত অবকাঠামো রয়েছে, যা যেকোনো জাতীয় নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলে।
সংসদীয় দল ও অভ্যন্তরীণ বৈঠকগুলোতে মন্ত্রী ও এমপিদের জনসমক্ষে সরকারের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরার এবং সংকট নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের কাছে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা ও টিকে থাকার সক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত "ফিল্ড" বা রাজপথের ওপর নির্ভর করে। ঘরকুনো অবস্থান নিয়ে কোনো সরকারি দল বা বিরোধী দল রাজপথ জমাতে পারবে না। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দিয়েছিলেন—তারা রাজপথে সভা-সমাবেশ করবেন না। এর মূল অর্থ ছিল, যেহেতু আওয়ামী লীগ সভা-সমাবেশ করবে না, সেহেতু বিএনপিকেও সে সুযোগ দেওয়া হবে না। মাঝখান থেকে প্রশাসনযন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষমতার মাঠটা আওয়ামী লীগের দখলে রাখাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।
এটাই ছিল আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় কৌশল, যদিও যৌক্তিক রাজনীতির ভাষায় একে বলা চলে "অপকৌশল"। কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার গৌরবোজ্জ্বল স্বীকৃতি যে বিএনপির রয়েছে, তাদের ওপর দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা, হত্যা ও গুমের মতো নিষ্ঠুরতম অত্যাচার চালিয়েও কি শেষ রক্ষা হয়েছে? আওয়ামী লীগের শেষ পরিণতি কী হয়েছে—তা আজ দৃশ্যমান।
বিএনপি এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে দল ও সরকার পরিচালনা করবে এবং '৩১-দফা'র ভিত্তিতেই আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবে।
লেখক পরিচিতি: সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী





