সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

অপরাধীর ভয় নয়, নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা চাই

মো. শামসুল আলম
প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫১ এএম

শেয়ার করুন:

অপরাধীর ভয় নয়, নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা চাই

রাষ্ট্রের কাছে মানুষের প্রথম চাওয়া খুব বড় কিছু নয়-জীবনটা যেন নিরাপদ থাকে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও সহিংস অপরাধের বাড়বাড়ন্তে সেই সামান্য চাওয়াটিই যেন ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠছে। ডেইলি স্টার সম্পাদকীয় তাই যথার্থই মনে করিয়ে দিয়েছে-সহিংস অপরাধকে কখনোই স্বাভাবিক হতে দেওয়া যায় না; পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নির্ভয়ে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। কথাটি শুনতে প্রশাসনিক, আসলে গভীরভাবে মানবিক। যে রাষ্ট্রে অপরাধী নির্ভয় আর সাধারণ মানুষ সতর্ক, সেখানে আইনের বই যত মোটা হোক, ন্যায়বিচারের ছায়া ততটাই পাতলা। সীমান্তে প্রায় ৩২ কোটি টাকা মূল্যের সোনা জব্দের ঘটনাটিও একই ছবির আরেক কোণ-রাষ্ট্রের চোখ খোলা থাকলে চোরাচালানের পথ যতই আঁকাবাঁকা হোক, কোথাও না কোথাও তার পায়ের ছাপ পড়ে।

আর জীবন রক্ষার প্রশ্নে বিদ্যুতের সুইচটি যেন রাষ্ট্রের হাতে থাকা একটি ছোট্ট অথচ ভয়ংকর দায়িত্ব। তীব্র লোডশেডিংয়ের এই সময়ে হাসপাতাল, বিশেষ করে অপারেশন থিয়েটার ও জরুরি বিভাগকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার দাবি উঠেছে; নিউ এজ সম্পাদকীয়ও বলেছে, হাসপাতালকে বিদ্যুৎ সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ এমন এক জায়গা, যেখানে এক মিনিটের অন্ধকার কখনো কখনো এক জীবনের আলো নিভিয়ে দিতে পারে। আমরা বিদ্যুৎকে সাধারণত শিল্পের চাকা, ব্যবসার হিসাব কিংবা শহরের বাতি দিয়ে মাপি; হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটি আমাদের শেখায়-বিদ্যুতের আসল মূল্য কখনো কখনো টাকা নয়, নিঃশ্বাস।

আর দূরপাল্লার স্লিপার বাস নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ‘জীবন্ত কফিন’ কথাটির ছড়িয়ে পড়াও একই অস্বস্তির কথা বলে-রাস্তা, যানবাহন, গতি ও মানুষের জীবনের মধ্যে যে শৃঙ্খলা থাকার কথা, সেখানে সামান্য ফাঁকও কখনো মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট।

তবু দিনের ছবিটি কেবল অন্ধকারের নয়। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে-তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য এটি হতে পারে ভবিষ্যতের একটি দরজা। যে দেশে কর্মক্ষম তরুণের সংখ্যা বিপুল, সেখানে ডিগ্রির চেয়ে দক্ষ হাতের মূল্য দিন দিন বাড়ছে; একটি তরুণের হাতে সনদের পাশাপাশি যদি কাজ শেখার সামর্থ্য দেওয়া যায়, তবে সেটিই হয়তো সবচেয়ে টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাই একদিকে অপরাধীর হাত থামানো, অন্যদিকে তরুণের হাতে কাজের হাতিয়ার তুলে দেওয়া-দুটিই একই রাষ্ট্রচিন্তার অংশ।

দূরের পৃথিবীও আজ খুব শান্ত নয়। নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে মৃতের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন হাজারেরও বেশি মানুষ-হিমালয়ের পাদদেশে প্রকৃতি যেন মানুষের সমস্ত হিসাবের খাতা এক নিমেষে ভিজিয়ে দিয়েছে। আর ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ঘিরে রাশিয়ার নতুন হামলার আশঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান-ওমানের সমঝোতার চেষ্টা ও ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা বিশ্বরাজনীতির উত্তাপ কমতে দিচ্ছে না।

পৃথিবীর মানচিত্রে সীমান্ত আলাদা, কিন্তু মানুষের ভয় প্রায় একই-কোথাও বোমার শব্দ, কোথাও পাহাড়ি ঢল, কোথাও অন্ধকার হাসপাতাল, কোথাও অপরাধীর দাপট। সভ্যতার এত আয়োজনের পরেও শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে পুরোনো দাবিটিই রয়ে গেছে-বাঁচতে চাই। শুভ সকাল। আপনার জন‍্য একটি সুন্দর দিনের প্রত‍্যাশা করি।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর