রোববার। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস। বাঙালির কাছে রোববারের সকালটি এমনিতেই একটু বিষণ্ন-ছুটির দিনের অলসতা শেষ, অফিসের ফাইল আবার টেবিলে, আর ঘড়ি যেন বিশেষ উৎসাহে বলে, ‘চলুন, এবার কাজের ভান করা যাক।’
কিন্তু আজকের সকালটি একটু অন্যরকম। আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্ববাসীকে গুমের বিরুদ্ধে ঐক্য ও সংহতির আহ্বান জানিয়েছেন এবং স্বৈরাচারী আমলে ঘটে যাওয়া প্রতিটি গুমের বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন। গুম বড় অদ্ভুত অপরাধ-মানুষটিকে সরিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু তার মায়ের অপেক্ষাকে সরানো যায় না; ফাইল বন্ধ করা যায়, দরজা বন্ধ করা যায়, স্মৃতি বন্ধ করার চাবিটি আজ পর্যন্ত কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি। রাষ্ট্রের জন্য তাই আজকের দিনটি কেবল একটি দিবস নয়-এটি অতীতের সামনে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের কাছে দেওয়া একটি হিসাবের খাতা।
কিন্তু যারা গুম হননি, তারাও যে খুব নিশ্চিন্তে আছেন-এমন কথা বলা যাবে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায় ৫০ কিলোমিটার যানজট। মেঘনা ও গোমতী সেতুর সংস্কার, তার সঙ্গে পথে বিকল গাড়ির বাহিনী-সব মিলিয়ে মহাসড়কটি এখন রাস্তা কম, অপেক্ষার বিশ্ববিদ্যালয় বেশি। এখানে কেউ ছাত্র হয়ে বসে নেই, কিন্তু সবাই ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছেন। রাস্তা সংস্কারের উদ্দেশ্য মানুষের দুর্ভোগ কমানো; আমাদের দেশে কখনো কখনো সংস্কারের সেই মহৎ উদ্দেশ্যটি এমন সফল হয় যে, মানুষ গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই জীবনের নানা দর্শন শিখে ফেলে।
একটি সম্পাদকীয়ও সেই পুরোনো অথচ অতি প্রয়োজনীয় কথাটিই বলেছে-সংস্কার যদি ধীরগতির হয়, উন্নয়ন তখন মানুষের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। রাস্তা মানুষের চলার জন্য; মানুষকে রাস্তার কাছে জিম্মি করার জন্য নয়। এই সময়েই সামাজিক মাধ্যম আমাদের সামনে এনে দিয়েছে নীলা খাতুনকে। জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। তাই বলে কলম থামেনি; পা দিয়েই লিখেছেন, স্নাতকোত্তর করেছেন, এবার শিক্ষকতার চাকরিও পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিয়োগপত্র নেওয়ার ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে-মানুষ প্রশংসা করছে, আবেগে আপ্লুত হচ্ছে। নীলার গল্পটি আসলে আমাদের জাতীয় জীবনের জন্যও একটি ছোট্ট আয়না। আমরা অনেক সময় বলি, ‘আমার হাত নেই’, ‘আমার সুযোগ নেই’, ‘আমার লোক নেই’, ‘সময় নেই’; নীলা যেন পা দিয়ে লিখে বললেন-অজুহাতেরও আবার হাত-পা লাগে, ইচ্ছাশক্তির লাগে না। আরেকটি সম্পাদকীয়-উপনিবন্ধে গ্রামের বাড়িকে গ্রামীণ পর্যটনের সম্ভাব্য আয়ের উৎস হিসেবে দেখার যে কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গেও নীলার গল্পটির কোথায় যেন অদ্ভুত মিল-সুযোগ পেলে অব্যবহৃত জিনিসও সম্পদ হয়ে ওঠে; মানুষ হোক কিংবা গ্রামের পুরোনো বাড়ি।
সম্পাদকীয় দুটি আজ যেন একই কথার দুই দিক। একদিকে সড়ক সংস্কারে ধীরগতি-যেখানে উন্নয়নের নামে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়; অন্যদিকে গ্রামের বাড়ি ও গ্রামীণ পর্যটন-যেখানে একটু বুদ্ধি, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা থাকলে একটি সাধারণ বাড়িও অর্থনীতির দরজা খুলে দিতে পারে। অর্থাৎ আমাদের সমস্যা সবসময় সম্পদের অভাব নয়; অনেক সময় সমস্যা হলো, যা আছে তার দিকে আমরা ঠিকমতো তাকাই না। যে মহাসড়কটি মানুষের চলাচলের পথ, তাকে আমরা অচল করে ফেলি; যে গ্রামটি অর্থনীতির সম্ভাবনা বহন করে, তাকে অবহেলায় পড়ে থাকতে দিই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্ররা একে হয়তো ‘সম্পদ ব্যবস্থাপনা’বলবেন; কিন্তু কেউ হয়তো বলবেন, নিজের উঠানে কাঁঠালগাছ রেখে পাশের বাড়ি থেকে কাঁঠাল কিনে আনার মতো ব্যাপার।
বাংলাদেশের এই ছোট ছোট গল্পের বাইরে পৃথিবী অবশ্য বড় খেলায় ব্যস্ত। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে; মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ভাষায়, ইরানের অর্থনৈতিক শিরা-উপশিরায় আরও কঠোর চাপ দেওয়া হবে। তেহরানও জানিয়ে দিয়েছে, চাপ এলে জবাব আসবে এবং হরমুজ প্রণালি তাদের হাতে থাকা বড় কৌশলগত অস্ত্র। পৃথিবীর মানচিত্রে হরমুজ একটি সরু জলপথ; কিন্তু তেলের বাজারে তার প্রভাব বেশ চওড়া। ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দরজা বন্ধ করতে চায়, তেহরান হরমুজ দিয়ে দরজা আটকে দেওয়ার কথা বলে-দুই পক্ষের দরজার রাজনীতির মাঝখানে পৃথিবীর সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে, জ্বালানি আর নিত্যপণ্যের বিল হাতে।
সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস তাই আমাদের সামনে বেশ কিছু প্রশ্ন রেখে গেল। গুম হওয়া মানুষের জন্য ন্যায়বিচার চাই, জীবিত মানুষের জন্য চলার রাস্তা চাই, নীলার মতো মানুষের জন্য সুযোগ চাই, গ্রামের জন্য নতুন অর্থনীতি চাই-আর দূরের হরমুজ যেন আমাদের ঘরের চুলায় আগুন কমিয়ে না দেয়, সেই প্রার্থনাও চাই। রাষ্ট্রের মহত্ত্ব বড় বড় বক্তৃতায় যতটা নয়, এসব ছোট ছোট প্রয়োজন মেটানোর মধ্যেই বেশি। দিন শেষে মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না-সে শুধু চায় তার প্রিয়জন হারিয়ে গেলে সত্যিটা জানতে, পথে বের হলে গন্তব্যে পৌঁছাতে, যোগ্যতা থাকলে সুযোগ পেতে এবং পৃথিবীর বড় মানুষেরা যখন যুদ্ধের দাবা খেলেন, তখন তার সংসারের হাঁড়িটা যেন চুলায় থাকে। এইটুকু ব্যবস্থা করতে পারলে রোববারের সকালটিও মন্দ নয়। অফিসে যাওয়ার পথে যানজট থাকলেও অন্তত মনে হবে-দেশটি দাঁড়িয়ে আছে, শুধু গাড়িগুলো নয়। শুভ হোক জীবনের পথচলা
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব




