একটি স্মার্টফোন আজকের তরুণের হাতে জ্ঞান, শিক্ষা, যোগাযোগ ও বিনোদনের অসাধারণ একটি মাধ্যম। কিন্তু সেই একই স্মার্টফোন যখন আসক্তির যন্ত্রে পরিণত হয়, তখন সেটি একটি পরিবারের অর্থনীতি, একটি তরুণের ভবিষ্যৎ এবং শেষ পর্যন্ত একটি সমাজের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে -মোবাইল গেম, অনলাইন বেটিং, ক্যাসিনো ও বিভিন্ন ধরনের জুয়ার অ্যাপ তরুণদের একটি অংশকে এমন এক চক্রে টেনে নিচ্ছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
সমস্যাটি শুধু ‘গেম খেলা’ নয়। সমস্যা তখনই ভয়াবহ হয়, যখন বিনোদনের গেম ধীরে ধীরে অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরার খেলায় পরিণত হয়। প্রথমে বিনামূল্যের গেম, তারপর ভার্চুয়াল কয়েন, এরপর ছোট অঙ্কের টাকা দিয়ে বাজি-এভাবেই একজন তরুণ ধীরে ধীরে অনলাইন জুয়ার গ্রাহকে পরিণত হতে পারে। হারার পর হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় আবার টাকা দেওয়া হয়। একসময় এটি বিনোদন থাকে না; পরিণত হয় আসক্তিতে।
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া আইনত নিষিদ্ধ। ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে সাইবার স্পেসে জুয়াকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৬ সালে সংসদ জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস করেছে, যেখানে অনলাইন বা রিমোট জুয়া, বেটিংসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে নতুন আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আইন থাকার পরও অনলাইন জুয়া বন্ধ হচ্ছে না কেন?
উত্তরটি খুব সহজ নয়। কারণ এটি এখন আর কেবল একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করার বিষয় নয়। এটি একটি বিশাল ডিজিটাল ও আর্থিক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে লড়াই।
ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই জুয়া বন্ধ হয় না
সরকার বা নিয়ন্ত্রণ কমিশন একটি জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিলে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই একই প্রতিষ্ঠান অন্য নামে নতুন ডোমেইন খুলতে পারে। IP address পরিবর্তন করতে পারে। নতুন অ্যাপ তৈরি করতে পারে। APK ফাইলের মাধ্যমে অ্যাপ ছড়িয়ে দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোপন গ্রুপে নতুন লিংক দেওয়া হতে পারে।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে অনলাইন জুয়া প্রতিরোধ নিয়ে এক বৈঠকে সরকার জানিয়েছিল, তখন পর্যন্ত হাজার হাজার MFS নম্বর এবং শত শত ওয়েব পোর্টাল ও লিংক শনাক্ত করা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছিল, একটি নম্বর বা ওয়েবসাইট বন্ধ করার পর সংশ্লিষ্ট চক্র নতুন নম্বর, নতুন IP, নতুন ডোমেইন ও নতুন অ্যাপ নিয়ে আবার সক্রিয় হচ্ছে।
অর্থাৎ আমরা যদি শুধু ‘লিংক ব্লক’ করার নীতিতে থাকি, তাহলে এটি অনেকটা মশা মারার ওষুধ না দিয়ে শুধু মশার একটি ঘর বন্ধ করার মতো হবে। মূল প্রজননস্থল বন্ধ না করলে মশা আবার ফিরে আসবে। অনলাইন জুয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
সবচেয়ে বড় দুর্বল জায়গা হলো টাকা
অনলাইন জুয়ার প্রাণ হলো টাকা। একটি জুয়ার অ্যাপ যতই আধুনিক হোক, যতই বিদেশি সার্ভারে পরিচালিত হোক, বাংলাদেশে বসে যদি টাকা পাঠানো না যায়, টাকা গ্রহণ করা না যায় এবং জেতা টাকা নগদে রূপান্তর করা না যায়- তাহলে তার কার্যক্রম অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
তাই অনলাইন জুয়া বন্ধ করতে হলে ওয়েবসাইটের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে অর্থের প্রবাহ শনাক্ত ও বন্ধ করার ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের অবৈধ অনলাইন জুয়ার লেনদেন শনাক্ত করতে AI-ভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিল। এটি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
একজন সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ১০টি লেনদেন করলে সেটি স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট MFS নম্বরে যদি কয়েকশ ব্যক্তি নিয়মিত টাকা পাঠায়, সেখান থেকে আবার অসংখ্য নম্বরে টাকা যায়, একই সঙ্গে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট বা বিদেশি পেমেন্ট চ্যানেলের সঙ্গে লেনদেনের সম্পর্ক পাওয়া যায়-তাহলে সেটি ‘সন্দেহজনক লেনদেন’ হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ব্যাংক, MFS, BTRC, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে একটি রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
শুধু অ্যাকাউন্ট বন্ধ করলেই হবে না; ওই অ্যাকাউন্টের প্রকৃত মালিক, অর্থের উৎস, অর্থের গন্তব্য এবং পুরো নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে হবে।
শুধু খেলোয়াড় নয়, মূল হোতাদের ধরতে হবে
অনলাইন জুয়া বন্ধের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো- অনেক সময় সাধারণ খেলোয়াড়কে কেন্দ্র করে অভিযান পরিচালিত হয়, কিন্তু মূল অপারেটররা থেকে যায় আড়ালে।
একজন তরুণ ৫০০ বা ১,০০০ টাকা দিয়ে অনলাইন বেটিং করল- এটি অবশ্যই আইনভঙ্গ হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়। কিন্তু সেই তরুণের কাছে বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিল কে? অ্যাপের লিংক দিল কে? টাকা গ্রহণ করল কে? এজেন্ট বানাল কে? টাকা বিদেশে পাঠাল কে? পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে কারা? প্রকৃত অভিযান হতে হবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করার জন্য।
২০২৫ সালে CID অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক হাজারের বেশি MFS এজেন্ট শনাক্ত করার কথা জানিয়েছিল।
এখানে আরও গভীরে যেতে হবে। শুধু এজেন্ট নয়- এজেন্টের নিয়োগকারী, অর্থের মালিক, প্রযুক্তি সরবরাহকারী, বিজ্ঞাপনদাতা এবং আন্তর্জাতিক অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগকারী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়মুক্ত রাখা যাবে না
আজ একজন তরুণকে অনলাইন জুয়ার দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো জুয়ার ওয়েবসাইটে সরাসরি যেতে হয় না। Facebook, YouTube, TikTok, WhatsApp, Telegram, Signal বা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তার কাছে বিজ্ঞাপন বা লিংক পৌঁছে যেতে পারে।
কখনো সেটি সরাসরি ‘জুয়া’ নামে আসে না। আসে ‘স্পোর্টস প্রেডিকশন’,‘গেমিং’,‘বোনাস’,‘ইনকাম’, ‘রেফার করে আয়’ কিংবা ‘দ্রুত টাকা জেতার’ বিজ্ঞাপন হিসেবে।
সেলিব্রিটি বা জনপ্রিয় ব্যক্তির ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে এসব প্রচারণা আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয়। ২০২৫ সালে অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা বন্ধের দাবিতে হাইকোর্টে রিটও হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে আদালত সরকারের কাছে অগ্রগতি প্রতিবেদন চেয়েছিল।
তাই বিজ্ঞাপনদাতা, প্রচারক এবং ইনফ্লুয়েন্সারদের দায় নির্ধারণ করতে হবে।
‘আমি তো শুধু বিজ্ঞাপন দিয়েছি’—এই অজুহাত গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়, যদি জানা থাকে যে বিজ্ঞাপনটি একটি অবৈধ জুয়া প্ল্যাটফর্মের প্রচার করছে।
তরুণদের জন্য ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ প্রয়োজন
তবে আইন দিয়ে সবকিছু সমাধান করা যাবে না। একজন ১৬ বছরের কিশোর যদি প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা মোবাইলে থাকে, তার হাতে সারাক্ষণ যদি উত্তেজনামূলক গেম, বেটিং ভিডিও ও জুয়ার বিজ্ঞাপন থাকে, তাহলে শুধু ওয়েবসাইট ব্লক করে তাকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। পরিবারকে দায়িত্ব নিতে হবে।
স্কুল-কলেজে ডিজিটাল আসক্তি সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। অভিভাবকদের বুঝতে হবে- সন্তানকে স্মার্টফোন দেওয়া আর তাকে ডিজিটাল স্বাধীনতা দেওয়া এক বিষয় নয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ডিজিটাল ওয়েলবিইং’ বা প্রযুক্তির স্বাস্থ্যকর ব্যবহারের বিষয়ে পাঠ চালু করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে- অনলাইনে পাওয়া ‘সহজে টাকা আয়ের’ প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই ফাঁদ।
খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, বই পড়া, বিজ্ঞানচর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের যুক্ত করার ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।
কারণ একটি তরুণের হাতে যদি বিকল্প ইতিবাচক পৃথিবী না থাকে, তাহলে ভার্চুয়াল পৃথিবীই তার প্রধান পৃথিবী হয়ে উঠবে।
মোবাইল অপারেটরদের দায়িত্ব কী?
টেলিযোগাযোগ খাতকেও এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হতে হবে।
মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্কে সন্দেহজনক SMS, USSD, বিজ্ঞাপন বা নির্দিষ্ট ধরনের ক্ষতিকর লিংক ছড়ানোর প্রবণতা শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একইভাবে ISP-দেরও অবৈধ জুয়ার লিংক শনাক্ত ও রিপোর্ট করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবে এখানে একটি ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরি।
অনলাইন জুয়া বন্ধ করতে গিয়ে যেন সাধারণ মানুষের বৈধ ইন্টারনেট ব্যবহার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা বৈধ ওয়েবসাইট ব্যবহারের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। প্রযুক্তিগত ব্লকিংয়ের সঙ্গে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে।
একটি জাতীয় ‘অনলাইন জুয়া প্রতিরোধ সেল’ দরকার
বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে ফলাফল সীমিত থাকবে।
আমার মতে, বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী জাতীয় অনলাইন জুয়া প্রতিরোধ ও মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন।
এই সেলে থাকবে—
* BTRC
* বাংলাদেশ ব্যাংক ও BFIU
* CID ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
* তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান
* মোবাইল অপারেটর
* ISP
* MFS ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রতিষ্ঠান
* সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ
* আর্থিক অপরাধ তদন্তকারী
* মনোবিজ্ঞানী ও তরুণদের প্রতিনিধিত্বকারী বিশেষজ্ঞ
এই সেলের কাজ হবে ২৪ ঘণ্টা অনলাইন মনিটরিং করা।
একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করার পর সেটির নতুন ডোমেইন কোথায় তৈরি হচ্ছে, কোন MFS নম্বর ব্যবহার করছে, কোন Facebook বা YouTube পেজে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, কোন IP থেকে পরিচালিত হচ্ছে—এসব তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে রাখতে হবে।
AI হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র
অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরকারকে AI ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে।
কারণ মানুষের পক্ষে প্রতিদিন লাখ লাখ লেনদেন, ওয়েব লিংক, বিজ্ঞাপন, অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়।
AI দিয়ে শনাক্ত করা যেতে পারে-কোন MFS নম্বরে অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে, কোন ওয়েবসাইট বারবার ডোমেইন পরিবর্তন করছে, কোন বিজ্ঞাপনের সঙ্গে কোন জুয়ার প্ল্যাটফর্মের সম্পর্ক রয়েছে, কোন নম্বর বা অ্যাকাউন্টগুলো একই নেটওয়ার্কে যুক্ত এবং কোন নতুন APK বা লিংক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
এভাবে সরকার ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ না হয়ে ‘পূর্বাভাসভিত্তিক’ ব্যবস্থা নিতে পারবে।
হাজার কোটি টাকার অপচয় রোধের পাশাপাশি অর্থপাচারও ঠেকাতে হবে।
অনলাইন জুয়া শুধু তরুণদের আসক্ত করছে না; এটি দেশের অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি।
জুয়ার মাধ্যমে টাকা বিদেশে চলে গেলে সেটি অর্থপাচারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। আবার অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে প্রতারণা, জালিয়াতি, হুন্ডি এবং অন্যান্য অপরাধের যোগসূত্রও তৈরি হতে পারে।
২০২৬ সালের জুনে সংসদে জানানো হয়েছিল, অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির অভিযোগে প্রায় **৫৫ হাজার MFS অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত বা ফ্রিজ করা হয়েছে।
এটি প্রমাণ করে যে সমস্যাটি শুধু ‘গেম খেলা’ নয়; এর সঙ্গে বড় আর্থিক নেটওয়ার্ক জড়িয়ে থাকতে পারে।
তাই অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযানকে শুধু সাইবার অপরাধ হিসেবে না দেখে আর্থিক অপরাধ ও সম্ভাব্য অর্থপাচারবিরোধী অভিযান হিসেবেও দেখতে হবে।
তরুণকে অপরাধী নয়, প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে দেখতে হবে
আরেকটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে।
অনলাইন জুয়ায় আসক্ত একজন তরুণ সবসময় অপরাধী নয়; অনেক সময় সে একটি ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিগত ফাঁদের শিকার।
প্রথমবার যারা জুয়ায় জড়িয়েছে, বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সচেতনতা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকা দরকার।
পরিবারকে জানতে হবে- সন্তান হঠাৎ কেন টাকা চাইছে, কেন রাতে ঘুমাচ্ছে না, কেন মোবাইল লুকিয়ে ব্যবহার করছে, কেন পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে।
একজন তরুণের জীবন ধ্বংস হওয়ার পর তাকে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে তার জীবন ধ্বংস হওয়ার আগেই তাকে রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক আন্দোলন ছাড়া প্রযুক্তিগত অভিযানও অসম্পূর্ণ
সরকার যতই আইন করুক, BTRC যতই ওয়েবসাইট বন্ধ করুক, বাংলাদেশ ব্যাংক যতই অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করুক—সমাজ সচেতন না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এখানে গণমাধ্যমের বড় ভূমিকা রয়েছে।
অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন থেকে অর্থ উপার্জন করা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তৈরি করে। বিজ্ঞাপন নীতিতে স্পষ্টভাবে অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করা উচিত।
একই সঙ্গে জনপ্রিয় অভিনেতা, খেলোয়াড়, রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার—সবার কাছেই একটি সামাজিক বার্তা পৌঁছাতে হবে:
আপনার একটি বিজ্ঞাপন একজন তরুণের জীবন ধ্বংস করতে পারে।
শেষ কথা: শুধু ‘জুয়া বন্ধ’ নয়, ‘জুয়ার বাজার’ বন্ধ করতে হবে
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া বন্ধ করার জন্য আইন হয়েছে, অভিযান হয়েছে, ওয়েবসাইট ও অ্যাকাউন্ট শনাক্ত হয়েছে, আর্থিক লেনদেন বন্ধ করা হয়েছে। তবুও সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। কারণ আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার উপসর্গ মোকাবিলা করছি; মূল ব্যবসায়িক কাঠামো ভাঙতে পারছি না।
একটি জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ করা সমাধান নয়।
টাকা যাওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে। বিজ্ঞাপনের পথ বন্ধ করতে হবে। এজেন্ট নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা বন্ধ করতে হবে। মূল অর্থদাতা ও অপারেটরদের শনাক্ত করতে হবে। বিদেশি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। AI-ভিত্তিক জাতীয় মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এবং সর্বোপরি- তরুণদের জন্য একটি বিকল্প ইতিবাচক ডিজিটাল সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।
মোবাইল ফোনকে আমরা তরুণদের শত্রু বানাতে চাই না। প্রযুক্তি আমাদের ভবিষ্যতের অন্যতম প্রধান শক্তি। কিন্তু প্রযুক্তি যদি জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার পরিবর্তে আসক্তি, জুয়া ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই দায়িত্ব নিতে হবে।
আজকের তরুণই আগামী দিনের বাংলাদেশ
তার হাতে স্মার্টফোন থাকবে-কিন্তু সেই স্মার্টফোন যেন তার ভবিষ্যৎ কেড়ে না নেয়।
অনলাইন জুয়া বন্ধ করার লড়াই তাই শুধু একটি অপরাধ দমনের অভিযান নয়; এটি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম, পরিবার, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই।
লেখক: মহিউদ্দিন আহমেদ। সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন।
এমআর/এমআই




