বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

খবরের ভিড়ে শেষ পর্যন্ত মানুষই সবচেয়ে বড় খবর

মো. শামসুল আলম
প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

খবরের ভিড়ে শেষ পর্যন্ত মানুষই সবচেয়ে বড় খবর

ঢাকার সকালটা আজকাল বড় বিচিত্র। খবরের কাগজ খুললে মনে হয় দেশটি একসঙ্গে সংসদ, কারখানা, বাজার, আদালত, ফেসবুক এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরীক্ষা দিচ্ছে। আজ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন বসছে—৪৩ দিনের বিরতির পর। সংসদে বাজেট পাস হয়েছে, এগারোটি বিলও গেছে; এখন দেখা যাক, আইনপ্রণেতাদের কথার সঙ্গে দেশের মানুষের কথার কতটা মিল হয়। আর সরকারের বিনিয়োগের ডাকও বেশ জোরালো—২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন। স্বপ্নের অসুবিধা একটাই—স্বপ্ন দেখতে টাকা লাগে না, কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বিদ্যুৎ লাগে।

সেই বিদ্যুতের গল্পটি অবশ্য শিল্পাঞ্চলে বেশ করুণ। সাভার-আশুলিয়ার কারখানায় কখনো গ্যাসের চাপ এত কম যে মেশিন চলে না, কখনো বিদ্যুৎ ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকে না; কোথাও উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলের খরচ তিন গুণ হয়েছে, কোথাও সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির আশ্রয় নিতে হচ্ছে। কৃষকের গল্পও খুব আলাদা নয়। আমন মৌসুমে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, অথচ বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে—যে কারণে সম্পাদকীয় পাতাও প্রশ্ন তুলেছে, সার-সিন্ডিকেট থেকে কৃষকের মুক্তি হবে কবে। অর্থাৎ রাজধানীতে আমরা অর্থনৈতিক রূপকথা লিখছি, আর মাঠে কৃষক তার হিসাবের খাতায় অঙ্ক কষছেন। এর মাঝখানে আবার ‘ঘুষ.সাইট’ নামের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের খবর—ছয় দিনে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ২২৭ কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বলতে হয়, বাঙালি এখন ঘুষও ডিজিটাল করেছে—সভ্যতার অগ্রগতি অস্বীকার করার উপায় নেই!

সামাজিক মাধ্যমও আজকাল এক অদ্ভুত দর্পণ—কখনো মুখ দেখায়, কখনো মুখোশ। রাজশাহীতে গরুর মাংসের নামে ঘোড়ার মাংস বিক্রির অভিযোগের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে; নমুনা সংগ্রহ করে বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। আর দূরের হিমালয় থেকে আসা আরও ভয়াবহ একটি ভিডিও যেন আমাদের এই ডিজিটাল যুগের হাসি-ঠাট্টার মধ্যে হঠাৎ নীরবতা নামিয়ে দেয়—নেপাল-তিব্বত সীমান্তে পাহাড়ি ঢলে একটি বন্দর ও জনপদ মুহূর্তে পানির নিচে চলে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রকৃতির সেই নির্মম রসিকতাই আজকের আন্তর্জাতিক পাতার সবচেয়ে বড় সংবাদ। নেপাল-চীন সীমান্তের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যু এবং শত শত মানুষের নিখোঁজ হওয়ার খবর এসেছে; উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে ভেঙে যাওয়া সড়ক ও সেতুর কারণে। হিমালয়ের বরফ, পাথর আর পানি যেন সভ্যতার সমস্ত অহংকারকে এক নিমিষে ধুয়ে নিয়ে গেল।

আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে মানুষ নিজের হাতে তৈরি আরেক বিপদের সঙ্গে লড়ছে—ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে; এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। পৃথিবীর এক প্রান্তে পাহাড় পথ বন্ধ করে দেয়, অন্য প্রান্তে মানুষ নিজেরাই পথ বন্ধ করে রাখে—প্রকৃতি ও রাজনীতি, দুজনেরই রসবোধ বেশ সূক্ষ্ম।

সম্পাদকীয় পাতাগুলো তাই আজ খুব বেশি দূরের কথা বলেনি। কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো চাই, আর সাধারণ মানুষকে অনলাইন ঋণ-প্রতারণা থেকে রক্ষা করতে হবে—দুটি কথাই আসলে একই জায়গায় গিয়ে মেলে: রাষ্ট্রের বড় বড় পরিকল্পনার শেষ পরীক্ষা হয় ছোট মানুষের জীবনে। দশ হাজার কর্মীকে সরকারি খরচ ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগের খবরটিও সেই ছোট মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত—বিদেশে গিয়ে কাজ করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। সুতরাং আজকের বাংলাদেশের গল্পটি হয়তো খুব জটিল নয়।

সংসদে আইন হবে, মন্ত্রণালয়ে পরিকল্পনা হবে, শিল্পাঞ্চলে মেশিন চলবে, কৃষকের মাঠে ধান হবে, প্রবাসী শ্রমিকের হাতে টাকা আসবে—আর নাগরিকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকবে, এই সমস্ত কিছুর মাঝখানে যেন তাকে মানুষ হিসেবেই দেখা হয়। খবরের কাগজের এত খবরের ভিড়ে শেষ পর্যন্ত এই একটি খবরই সবচেয়ে বড়: মানুষ কেমন আছে?

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর