বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট: দায়, ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ

মো. শামসুল আলম
প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট: দায়, ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ

বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটকে কেবল আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দেশীয় গ্যাস উৎপাদন হ্রাস, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে ধীরগতি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সীমিত অবকাঠামো, দুর্বল মজুত ব্যবস্থা, বিতরণে অদক্ষতা এবং জ্বালানি খাতের দীর্ঘস্থায়ী সুশাসনের অভাব—এসব মিলে পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।

২০২৬ সালে সংকটটি এক নতুন মাত্রা নেয়, যখন প্রধান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘কাতার এনার্জি’ জানায় যে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ মাত্র তারা দিতে পারবে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছিল এই একটি উৎস থেকে। ফলে প্রধান একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা জাতীয় জ্বালানী নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে। এর পাশাপাশি মহেশখালীর ভাসমান সংরক্ষণ ও বাষ্পীভবন ইউনিটের (এফএসআরইউ) যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামালের ঘাটতি যুক্ত হয়ে আগস্টে দেশের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২,২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের (এমএমসিএফডি) নিচে নেমে যায়। গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানাগুলো ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহারে বাধ্য হওয়ায় তেলের চাহিদাও হঠাৎ বৃদ্ধি পায়।

এই সংকট উত্তরণে অবিলম্বে দ্বি-মুখী কৌশল গ্রহণ করা জরুরি

১. প্রথম ধাপ (জরুরি ৯০ দিনের কার্যক্রম): চড়া মূল্যে হলেও খোলা বাজার (স্পট মার্কেট) থেকে এলএনজি সংগ্রহ, এফএসআরইউ ইউনিট পূর্ণ সচল করা, কাতারবহির্ভূত বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে সাময়িক উৎপাদন বৃদ্ধি, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ ও সিস্টেম লস কমানো এবং শিল্প ও বিদ্যুতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ।

২. দ্বিতীয় ধাপ (দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বহুমুখীকরণ): ব্রুনাই, যুক্তরাষ্ট্র, ওমান, অ্যাঙ্গোলা ও নাইজেরিয়ার মতো দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বন্দোবস্ত করা। এবং ব্রুনাইকে কেবল সরবরাহকারী নয়, বরং উপকূলীয় অনুসন্ধান, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা।

সংকটের প্রকৃত চিত্র

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বর্তমানে তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত ঝুঁকির মুখোমুখি: গ্যাসের তীব্র ঘাটতি, এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা এবং জ্বালানি তেলের সরবরাহ শৃঙ্খলের ভঙ্গুরতা।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে। বিপরীতে বিদ্যুৎ, শিল্প, সার, সিএনজি ও গৃহস্থালি খাতে চাহিদা বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এই ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানির ওপর জোর দেওয়া হলেও তা দেশকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথ, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর প্রতিশ্রুতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার) তারল্যের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল করে ফেলেছে। ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে এই কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কেন এই সংকট তৈরি হলো?

ক. দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের পতন

দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে আসায় সেগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই কমছে। কিন্তু সেই অনুপাতে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সময়মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও বিনিয়োগ করা হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত স্থবিরতা ও বিনিয়োগ ঘাটতির ফল। নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার, মূল্যায়ন, উন্নয়ন কূপ খনন এবং সমুদ্রাঞ্চলে (অফশোর) অনুসন্ধানে বিলম্বের কারণে আমদানির ওপর দায় চাপানো হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করেছে।

খ. একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা

বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির বড় অংশই একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীল ছিল। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের (S&P Global) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছিল কাতার থেকে। স্বাভাবিক সময়ে এটি অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও, যুদ্ধ বা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সময় একক উৎসের ওপর এই নির্ভরতা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

গ. ভাসমান টার্মিনাল-নির্ভরতা (FSRU)

দেশে আমদানিকৃত তরল গ্যাসকে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য গ্যাসে রূপান্তরের জন্য মূলত সমুদ্রের মাঝে স্থাপন করা ভাসমান টার্মিনালের (Floating Storage and Regasification Unit - FSRU)  ওপর নির্ভর করতে হয়। কোনো কারণে একটি টার্মিনাল বিকল বা বন্ধ হলে এক লহমায় শত শত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আগস্টে মহেশখালী টার্মিনালে গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়া এবং যান্ত্রিক জটিলতায় সরবরাহ ২২০০ এমএমসিএফডির নিচে নেমে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, জাহাজ আগমন, পণ্য খালাস ও টার্মিনাল পরিচালনার মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের অভাব ছিল।

ঘ. দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও তদারকির অভাব

বর্তমানের সরবরাহ সংকটের পেছনে সরাসরি কোনো নাশকতা বা ষড়যন্ত্রের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না পাওয়া গেলেও, এখানে সরকারি ও বেসরকারি আমদানিকারক, সরবরাহকারীসহ পুরো বিতরণ ব্যবস্থা যে দুর্নীতির কারণে ক্ষতবশত—তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তিতাস গ্যাস সংস্থায় অবৈধ সংযোগ, মিটার টেম্পারিং, ঘুষ এবং কৃত্রিম সিস্টেম লসসহ বাইশটি দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করেছিল। এমনকি ২০২৫ সালেও তিতাসের ২,২১৪ কোটি টাকার স্মার্ট মিটার প্রকল্পে কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগে দরপত্র বাতিল করে পুনরায় আহ্বান করতে হয়।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতের ক্রয়ে স্বচ্ছতা আনতে একটি স্বাধীন 'ফোরেন্সিক এনার্জি অডিট' প্রয়োজন। এর মাধ্যমে খতিয়ে দেখা দরকার—কিসের ভিত্তিতে সরবরাহকারী নির্বাচন করা হয়েছে, জরুরি মুহূর্তে বিকল্প জাহাজ কেন প্রস্তুত ছিল না এবং কোনো মধ্যস্বত্বভোগী অন্যায্য সুবিধা পেয়েছে কি না।

৩. আগামী ৯০ দিনের জরুরি কর্মপরিকল্পনা

দুই বা তিন মাসে পুরো সংকট চিরতরে দূর করা সম্ভব নয়, তবে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপে ঘাটতি সহনীয় মাত্রায় আনা সম্ভব।

৩.১ জাতীয় জ্বালানি জরুরি সেল গঠন

পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক তদারকির জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল), তিতাস, পিডিবি, বিপিসি এবং অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি সেল’ গঠন করা যেতে পারে। এই সেল প্রতিদিন দেশের মোট উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ ও আগামী দুই সপ্তাহের সম্ভাব্য সরবরাহের সঠিক তথ্য সম্বলিত ড্যাশবোর্ড প্রকাশ করবে, যাতে বাজার ও জনমনে বিভ্রান্তি না ছড়ায়।

৩.২. স্পট মার্কেট বা খোলা বাজার থেকে গ্যাস ক্রয়

জরুরি সংকট সামাল দিতে আন্তর্জাতিক খোলা বাজার থেকে চড়া দামে হলেও কিছু এলএনজি কার্গো কেনা ছাড়া উপায় নেই। মার্চ মাসে প্রতি মিলিয়ন বিটিইউ এলএনজি ২৪.৫০ থেকে ২৮ ডলারে কিনতে হলেও, কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রেখে অর্থনীতি অচল করার চেয়ে এটি সাময়িকভাবে মেনে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত। তবে এই কেনাকাটায় উন্মুক্ত দরপত্র এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।

৩.৩. সরবরাহকারীর বহুমুখীকরণ

একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস সন্ধান করতে হবে:

# যুক্তরাষ্ট্র: ২০২৬ সালের মে মাসে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় মার্কিন এলএনজি দীর্ঘমেয়াদি আমদানির ব্যবস্থা করা।

# ওমান: ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে পরিবহন খরচ কম হওয়ায় ওমান সুবিধাজনক উৎস হতে পারে।

# অ্যাঙ্গোলা ও নাইজেরিয়া: আটলান্টিক মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই দেশগুলো থেকেও এলএনজি আমদানির সুযোগ যাচাই করা।

# ব্রুনাই: এই দেশটির সঙ্গে বিএনপি সরকারের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ওপর ভর করে জ্বালানি সংগ্রহের একটি উজ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

৩.৪. কাঁচামাল অদলবদল (এলএনজি সোয়াপ) ব্যবস্থা

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্রুত ও নিশ্চিত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। কোনো দূরবর্তী দেশের জাহাজ যদি অন্য কোনো দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম মেনে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সেই জাহাজ বাংলাদেশে ভিড়ানোর (কার্গো সোয়াপ) ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে সময় ও খরচ উভয়ই বাঁচবে।

৩.৫. ব্রুনাইয়ের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব

জ্বালানি সংকট উত্তরণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তেল ও গ্যাসে সমৃদ্ধ দেশ ব্রুনাই বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক কূটনৈতিক বিকল্প। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ও ব্রুনাইয়ের মধ্যে এলএনজি এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহে সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়েছিল। ২০২৩ সালে ব্রুনাই থেকে বছরে ১০ থেকে ১৫ লাখ টন এলএনজি এবং ২.১০ লাখ টন ডিজেল আমদানির দীর্ঘমেয়াদি আলোচনাও হয়। উল্লেখ করার যায়, ব্রুনাইয়ের সঙ্গে বিএনপি আদি সরকারের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ওপর ভর করে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

বর্তমান সংকটকে সুযোগে পরিণত করে ব্রুনাইয়ের সঙ্গে ‘বাংলাদেশ-ব্রুনাই কৌশলগত জ্বালানি অংশীদারিত্ব ২০২৬-২০৩০’ গঠন করা যেতে পারে। এটি কেবল গ্যাস কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পাঁচটি স্তরে সম্প্রসারণ করা উচিত:

# জরুরি এলএনজি: আগামী ৩ থেকে ৬ মাসের জন্য তাৎক্ষণিক কার্গো সংগ্রহ।

# দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি: ৩ থেকে ১০ বছর মেয়াদি স্থায়ী গ্যাস সরবরাহ চুক্তি।

# জ্বালানি তেল: ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের নিয়মিত সরবরাহ।

# সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধান: বাংলাদেশের অফশোর ব্লকে বিনিয়োগে ব্রুনাইয়ের রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে আমন্ত্রণ।

# অবকাঠামো বিনিয়োগ: টার্মিনাল, গ্যাসের পাইপলাইন ও রিফাইনারিতে ব্রুনাইয়ের যৌথ বিনিয়োগ আকর্ষণ।

এই আলোচনা এগিয়ে নিতে কেবল কূটনৈতিক নোট যথেষ্ট নয়, বরং অবিলম্বে জ্বালানি, পররাষ্ট্র ও পেট্রোবাংলা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ব্রুনাইয়ের রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ানে পাঠানো প্রয়োজন।

৪. দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিতরণ সংস্কার

আমদানির পাশাপাশি দেশের মধ্যকার সম্পদ ও ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো সমান জরুরি:

# কূপ মেরামত (ওয়ার্কওভার): বিদ্যমান চালু কূপগুলোর সংস্কার, কম চাপের কূপগুলোতে কম্প্রেসর বসানো এবং পাইপলাইনের চাপ পুনর্গঠন করে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে উৎপাদন কিছুটা হলেও বাড়ানো।

# অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ: তিতাসসহ বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির অবৈধ সংযোগ, মিটার বাইপাস ও টেম্পারিং বন্ধে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো। এটি ছোট কোনো গ্রাহকের ওপর সীমাবদ্ধ না রেখে প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ওপরও সমভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

# অগ্রাধিকারভিত্তিক বরাদ্দ: গ্যাসের অপ্রতুলতার সময় বিদ্যুৎ, সার কারখানা, হাসপাতাল ও রপ্তানিমুখী শিল্পকে সবার আগে গ্যাস দিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব যেন এই বরাদ্দে হস্তক্ষেপ না করতে পারে।

৫. ৯০ দিনের কার্যবিবরণী (Action Matrix)

সময়সীমা

করণীয় মূল পদক্ষেপসমূহ

প্রথম ৭ দিন

জাতীয় জ্বালানি জরুরি সেল গঠন; দৈনিক ড্যাশবোর্ড চালু; এফএসআরইউ টার্মিনালের যান্ত্রিক পর্যালোচনা ও জরুরি দরপত্র আহ্বান।

৭ – ৩০ দিন

খোলা বাজার থেকে জরুরি এলএনজি ক্রয়; কাতারকে সরবরাহের সময়সূচি পুনর্নির্ধারণের অনুরোধ; ব্রুনাইয়ে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল প্রেরণ; যুক্তরাষ্ট্র ও ওমানের সঙ্গে আলোচনা।

৩০ – ৬০ দিন

দেশীয় কূপ মেরামত ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি; অবৈধ সংযোগ ও পাইপলাইন লিক বন্ধে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান; অগ্রাধিকারভিত্তিক ডিজিটাল গ্যাস বণ্টন ব্যবস্থা চালু।

৬০ – ৯০ দিন

ব্রুনাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি চূড়ান্তকরণ; এলএনজি সোয়াপ কাঠামো গ্রহণ; গ্যাসের বিকল্প মজুত গড়ে তোলার রূপরেখা প্রস্তুত।

৯০ দিনের পর

সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার; দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা (১০ বছর মেয়াদি) বাস্তবায়ন।

৬. দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা ও উপসংহার

বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট কেবল একটি সাময়িক সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করেছে যে দেশীয় অনুসন্ধান বন্ধ রেখে আমদানির ওপর অত্যধিক ভরসা করা এবং সুশাসনের অভাব ঘটালে যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক সংকট দেশের অর্থনীতিকে থমকে দিতে পারে।

অতএব, সমস্যার সমাধান কেবল ‘আরও বেশি গ্যাস কেনা’য় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত— ‘আজ সংকট কাটাতে গ্যাস কিনব, কিন্তু আগামীকাল যেন আর আমদানির কাছে জিম্মি হতে না হয়।’

এজন্য জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস ক্রয়, ব্রুনাই ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের সঙ্গে উৎসের বহুমুখীকরণ এবং দেশীয় কূপ সংস্কারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রাঞ্চলে দ্রুত অনুসন্ধান, বিতরণ ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে হবে। কৌশলগত সাহসিকতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এই সংকটকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে একটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ দেওয়ার সুযোগে পরিণত করা সম্ভব।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর