আজ ২০ আগস্ট। বাংলাদেশের রাষ্ট্রজীবনের ক্যালেন্ডারে একটি বিশেষ দিন। ৩৫ বছর পর আজ আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা। বঙ্গভবনের দরজা আজ নতুন একজন রাষ্ট্রপতির জন্য খুলবে; কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, সংবিধানের একটি প্রতিষ্ঠান আবার নতুন করে মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে আসবে। রাষ্ট্রপতি কে হলেন, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ-রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানটি কতটা সাংবিধানিক মর্যাদা, নিরপেক্ষতা ও ভারসাম্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য শুধু ভোটের বাক্সে নয়, প্রতিষ্ঠানের আচরণেও। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আজ সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার কথা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবশ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনেকটা এমন এক পরীক্ষার মতো, যার প্রশ্নপত্র আগেই বাজারে বেরিয়ে গেছে-উত্তরটিও অনেকের জানা। তবু পরীক্ষা দিতে হয়। কারণ রাষ্ট্রের নিয়ম ব্যক্তির জনপ্রিয়তার চেয়ে বড়। আজকের দিনটি তাই কোনো একজন ব্যক্তিকে বঙ্গভবনে পাঠানোর দিন মাত্র নয়; এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে আনার আরেকটি ধাপ। নতুন বাংলাদেশ যদি সত্যিই নতুন হতে চায়, তবে পুরোনো অভ্যাসের বদলে প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতেই হবে।
রাষ্ট্রের আরেকটি আয়না আজ খুলছে নদীর ওপর। দেশের প্রথম জাতীয় নৌযান শুমারি শুরু হচ্ছে আজ, চলবে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত। কত নৌযান, কোথায় কী ধরনের নৌযান, কোন নৌপথে কতটা চলাচল-এসব তথ্য এতদিন অনেকটাই অনুমাননির্ভর ছিল। নদীকে আমরা কবিতায় যতটা চিনি, প্রশাসনিক খাতায় তার হিসাব ততটা জানি না। অথচ বাংলাদেশে নদী কেবল বর্ষার দৃশ্য নয়; এটি অর্থনীতি, যোগাযোগ, কৃষি ও জীবিকার দীর্ঘতম সড়ক। এবার অন্তত নদীরও একটি নাগরিকত্বের খাতা হচ্ছে।
কিন্তু নদীর দেশে নদী গুনে লাভ কী, যদি ঘরের চুলায় আগুন জ্বালানোর গ্যাসের হিসাবই মেলে না? গত কয়েক দিনে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও জাতীয় চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়ে গেছে। এলএনজি সরবরাহ প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উঠলেও মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২,৪২০ মিলিয়ন ঘনফুট-চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ গ্যাসের টার্মিনাল আছে, গ্যাসও আসছে, কিন্তু গ্যাসের সঙ্গে আমাদের চাহিদার প্রেম এখনো একতরফা। আজকের প্রধান একটি জাতীয় দৈনিকের আলোচনাতেও তাই প্রশ্ন-এলএনজি টার্মিনাল সচল, কিন্তু গ্যাস কোথায়?
এই গ্যাস-গল্পের মধ্যে আরেকটি সরকারি সিদ্ধান্ত চোখে পড়ে-জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি অফিসের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা, বাজার ৬টার মধ্যে বন্ধ, সরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি ব্যয়ে ৩০ শতাংশ কাটছাঁট, বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণেও নিয়ন্ত্রণ। সংকটের সময়ে মিতব্যয়িতা খারাপ কথা নয়; বরং রাষ্ট্রের নিজের ঘরে বাতি কম জ্বালানোই জনগণকে সাশ্রয়ের নৈতিক শিক্ষা দেয়। তবে সাশ্রয় যদি কেবল অফিসের ঘড়িতে হয়, আর অপচয় যদি নীতিনির্ধারণের ঘরে থেকে যায়, তবে ঘড়ি এগোলেও সংকট পিছাবে না।
এরই মধ্যে পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক উঠেছে। ৪৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক বলেছেন, আদিবাসী পরিচয় ও বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়। কথাটি শুনতে খুব সাধারণ; কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ একই সঙ্গে বাঙালি, চাকমা, সাঁওতাল, গারো কিংবা অন্য কোনো নৃগোষ্ঠীর পরিচয় বহন করতে পারেন এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিকও হতে পারেন। রাষ্ট্রের কাজ মানুষের পরিচয় মুছে ফেলা নয়; বরং নানা পরিচয়ের ভেতর একটি অভিন্ন নাগরিকত্বের ছাতা তৈরি করা। ছাতা যত বড় হয়, বৃষ্টিতে ভিজে মানুষের সংখ্যা তত কমে।
সামাজিক মাধ্যমে গত ক’দিনের আলোচিত ঘটনাগুলোও আমাদের আরেকটি আয়না দেখাচ্ছে। একটি স্কুলছাত্রীকে প্রকাশ্যে লাথি মারার ভিডিও ভাইরাল হয়ে মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ভিডিওর যুগে অন্যায় এখন আর চার দেয়ালের মধ্যে থাকে না-একটি মোবাইল ফোন তাকে মুহূর্তে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসে। কিন্তু এখানেও সাবধান হওয়া দরকার। ভাইরাল হওয়া মানেই বিচার হয়ে যাওয়া নয়। সামাজিক মাধ্যম আদালত হতে পারে না; সর্বোচ্চ সেটি সাক্ষী হতে পারে। বিচার করতে হবে আইনকে, আর সমাজের কাজ হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেককে জাগিয়ে রাখা।
আরেকটি ভাইরাল বাস্তবতা হলো-ভুয়া, পুরোনো কিংবা খণ্ডিত ভিডিও দিয়ে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি। আমাদের হাতে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রণযন্ত্র-মোবাইল ফোন। সমস্যা হলো, ছাপার আগে আমরা খবর যাচাই করি না। বলতে হয়, একসময় মানুষ গুজব ছড়াত পায়ে হেঁটে, এখন তার হাতে ফাইভ-জি; ফলে গুজবেরও এখন এক্সপ্রেসওয়ে হয়েছে। অতএব ডিজিটাল নাগরিকত্বের প্রথম শিক্ষা হওয়া উচিত-দেখলাম, বিশ্বাস করলাম, শেয়ার করলাম-এই তিন ধাপের মাঝখানে অন্তত একবার ভাবুন।
আজকের দুটি সম্পাদকীয় প্রশ্ন এখানেই এসে মিশে যায়। রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয়, অসমাপ্ত সেতু, অদক্ষ পরিকল্পনা-এসব নিয়ে বারবার যে প্রশ্ন উঠছে, তার সারকথা খুব সহজ: নতুন প্রকল্পের আগে পুরোনো প্রকল্প শেষ করুন। উন্নয়ন মানে কেবল নতুন ফলক বসানো নয়; জনগণের টাকা দিয়ে তৈরি রাস্তা, সেতু, হাসপাতাল ও অবকাঠামোকে কার্যকর করে তোলাই উন্নয়ন। অসমাপ্ত সেতু দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তার নিচ দিয়ে মানুষের আস্থা বয়ে যায় না।
আরেকটি সম্পাদকীয় প্রশ্ন আরও মানবিক-মধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৃত্যু নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা উদাসীন? বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নকে দালালচক্র যখন মৃত্যুর ব্যবসায় পরিণত করে, তখন কেবল সীমান্ত পাহারা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কর্মসংস্থান, নিরাপদ অভিবাসন, দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বিদেশগামী মানুষের সচেতনতা-সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হবে। মানুষের স্বপ্নকে অপরাধীরা পণ্য বানিয়ে ফেললে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয় সেই বাজারটি বন্ধ করা। এই trafficking network ভেঙে দিয়ে অভিবাসনে শৃঙ্খলা আনা জরুরি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আজকের সবচেয়ে কাছের আগুনটি কলকাতায়। একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন; বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক। আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। কলকাতায় চিকিৎসা কিংবা অন্য প্রয়োজনে যাওয়া মানুষের জন্য শহরটি আমাদের কাছে অনেকটা প্রথম হতে পারে, তাই এই আগুনের ধোঁয়া সীমান্ত মানেনি। দুর্ঘটনা কখনো পাসপোর্ট দেখে আসে না; নিরাপত্তার ব্যবস্থাও তাই নাগরিকত্ব দেখে করা যায় না। তবে আগুনটি দুর্ঘটনা তো?
দূরে হরমুজে বিশ্বের অর্থনীতির আরেক আগুন। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি-সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল কমেছে। বাংলাদেশের জন্য হরমুজ কোনো দূরদেশের ভূগোল নয়; তেলের দাম, এলএনজি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক। পৃথিবীর মানচিত্রে একটি সরু জলপথ কখনো কখনো বাংলাদেশের বাজারে গিয়ে একটি বড় দাগ টেনে দেয়।
আজকের থিম তাই-‘রাষ্ট্র যখন নিজের আয়না দেখে।’ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আমাদের সংবিধানের আয়না দেখায়, নৌযান শুমারি দেখায় নদীর আয়না, গ্যাস সংকট দেখায় অর্থনীতির আয়না, পরিচয়ের বিতর্ক দেখায় নাগরিকত্বের আয়না, আর সামাজিক মাধ্যম দেখায় আমাদের নিজেদের বিবেকের আয়না। আয়নায় মুখ দেখলে দোষ আয়নার নয়-মুখটি কেমন, সেটিই আসল কথা। বাংলাদেশ আজ নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে যদি রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ব্যক্তি ও দল থেকে প্রতিষ্ঠান, স্লোগান থেকে সুশাসন, আর উত্তেজনা থেকে যুক্তির দিকে ফিরে আসে।
সকাল তাই আশাবাদেরই হোক। আজ নতুন রাষ্ট্রপতি আসবেন, নদীর নৌযানের হিসাব শুরু হবে, গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর আমরা হয়তো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করার আগে একবার থামব। ছোট ছোট এই অভ্যাসগুলোই একদিন বড় রাষ্ট্র তৈরি করে। সূর্য প্রতিদিনই ওঠে; কিন্তু প্রতিটি সকাল নতুন হয় না। আজকের সকালটি যেন সত্যিই নতুন বাংলাদেশের একটি সকাল হয়।
লেখক: সাবেক সচিব ও সিনিয়র ব্যুরোক্রেট বিশ্লেষক




