১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে যোগদান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পরই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের স্বার্থ, মর্যাদা ও কূটনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও বঙ্গবন্ধু বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পথে এগিয়েছিলেন।
আজ ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সামনে আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রশ্ন— প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর কি হওয়া উচিত? আমার মতে, হ্যাঁ, হওয়া উচিত। তবে সেই সফর হতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌম মর্যাদা ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে।
ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের হুবহু মিল নেই। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ ছিল সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্র; আজকের বাংলাদেশ একটি প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, যার নিজস্ব অর্থনীতি, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান রয়েছে। তাই ১৯৭৪-এর ঘটনাকে ২০২৬-এর বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক হবে না।
তবে একটি মৌলিক শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক— বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো দেশের পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করবে না; সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায়।
বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো অসংখ্য বিষয় রয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং সম্পর্কের মধ্যে যখন সমস্যা থাকে, তখনই উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংলাপ আরও প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রী যদি ভারতে যান, তাহলে সফরটি শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা থাকবে— সীমান্ত হত্যা বন্ধ, অভিন্ন নদীর পানি, বাণিজ্য ভারসাম্য, জ্বালানি ও যোগাযোগ সহযোগিতা, নিরাপত্তা এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে দৃঢ় আলোচনা হবে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি— ভারতে যাওয়া মানেই ভারতের কাছে নতি স্বীকার করা নয়। আবার ভারতে না যাওয়াও সবসময় জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রমাণ নয়।
আধুনিক কূটনীতিতে আলোচনার টেবিল ছেড়ে দেওয়া কোনো শক্তির পরিচয় নয়। বরং নিজের অবস্থান তুলে ধরে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে অধিকার আদায় করার সক্ষমতাই একটি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক শক্তির পরিচয়।
দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা নেতা যদি প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরে না যাওয়ার পরামর্শ দেন, সেটি তাদের রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কেবল রাজনৈতিক আবেগ দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিতে হবে।
১৯৭৪ সালের বঙ্গবন্ধুর কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল— বন্ধুত্ব করা যায়, সম্পর্ক রাখা যায়, কিন্তু জাতীয় সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া যায় না। ২০২৬ সালেও বাংলাদেশের একই নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অংশীদার। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের অভিভাবক নয়। একইভাবে বাংলাদেশও ভারতের প্রতিপক্ষ হয়ে থাকার প্রয়োজন অনুভব করে না। বাংলাদেশের উচিত, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কিন্তু দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা— যেখানে থাকবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা, স্বার্থের ভারসাম্য এবং সার্বভৌম মর্যাদা।
তারেক রহমানের ভারত সফর তাই একটি সুযোগও হতে পারে। এই সফরের মাধ্যমে যদি বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে সরাসরি আলোচনা করতে পারে এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করতে পারে, তাহলে সফরটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
কিন্তু যদি সফরটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা, ছবি তোলা এবং সৌজন্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে জনগণের প্রশ্ন থেকেই যাবে— বাংলাদেশ কী পেল? সুতরাং প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়— ‘তারেক রহমান ভারতে যাবেন কি যাবেন না?’ প্রশ্ন হওয়া উচিত— তিনি কী নিয়ে যাবেন এবং কী নিয়ে ফিরবেন?’
১৯৭৪-এর শিক্ষা আমাদের বলে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে হবে জাতীয় স্বার্থ। আর ২০২৬-এর বাস্তবতা আমাদের শেখায়, সেই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে দরজা বন্ধ নয়, বরং দৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ সংলাপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন তাই হতে পারে— ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি আনুগত্য নয়; জাতীয় স্বার্থ সবার আগে।’ ১৯৭৪-এর শিক্ষা আর ২০২৬-এর বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন এখানেই।
লেখক: আহ্বায়ক, বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজ



