মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

নতজানু পররাষ্ট্রনীতি পেরিয়ে বিশ্ব কূটনৈতিক মঞ্চে স্বমর্যাদার ১৮০ দিন

মাহবুব নাহিদ 
প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:০০ এএম

শেয়ার করুন:

নতজানু পররাষ্ট্রনীতি পেরিয়ে বিশ্ব কূটনৈতিক মঞ্চে স্বমর্যাদার ১৮০ দিন

একটি দেশের সত্যিকারের রূপান্তর কখন ঘটে? এই রূপান্তর তখনই ঘটে যখন রাষ্ট্রের মূল অগ্রাধিকারগুলো নির্ধারিত হয় মেহনতি মানুষের কল্যাণ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও টেকসই পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করে। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করার নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার বিগত ১৮০ দিনে তা বাস্তবায়নে অত্যন্ত দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থেকেছে। দেড় দশকের দীর্ঘ দুঃশাসন, চরম নৈরাজ্য ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির নীতিগত অবসান ঘটিয়ে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রেখে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’— এই সুমহান মূলমন্ত্রকে কেন্দ্র করে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় সরকার একটি স্বাধীন, স্বাবলম্বী, প্রজ্ঞাবান ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে।

বিশ্বরাজনীতির অত্যন্ত জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে কেবল ক্ষমতার আনুগত্য কিংবা অনুকরণ নয়; বরং সাম্য, মানবিক মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করা একটি দায়িত্বশীল ও গণপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারের প্রধান কর্তব্য। বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১৮০ দিনে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠন, পররাষ্ট্রনীতিতে গতিশীলতা আনয়ন ও কূটনৈতিক সফলতা অর্জনে বহুমুখী ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে এক নতুন স্বাবলম্বী ও মর্যাদাপূর্ণ উচ্চতায় আসীন করাই ছিল এই সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।

বিগত ছয় মাসে বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রগুলোতে নতজানু মানসিকতা পরিহার করে সমতা ও ন্যায্যতার নীতি সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ কৌশলগত অগ্রাধিকার হলো বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আন্তর্জাতিক মেলবন্ধন তথা ‘পিপল টু পিপল টাইস’ (People-to-People Ties) সুদৃঢ় করা। শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা, পর্যটন, বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও টেকসই বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি জনমুখী ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক পরিকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে যেকোনো ধরনের বৈষম্য পরিহার করে প্রতিটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।

এই ১৮০ দিনের প্রজ্ঞাবান কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও বিশ্বমানের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই কূটনৈতিক সাফল্যের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্তি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে এক গৌরবময় ও অত্যন্ত প্রভাবশালী আসনে আসীন করেছে। ১৯২টি সদস্য রাষ্ট্রের এই সুবিশাল বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের নীতি, আদর্শ, নিরপেক্ষতা ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের গভীর আস্থা ও সম্মানেরই স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। এই স্বীকৃতি বৈশ্বিক শান্তি রক্ষা, টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশকে নেতৃত্বের মূলধারায় নিয়ে এসেছে।

দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও সরকারের স্বাধীন ও শক্তিশালী নীতির এক নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন মালয়েশিয়া ও চীনে সরকারি সফরে যান, তখন সেখানে তিনি লাভ করেন নজিরবিহীন উষ্ণ অভিনন্দন, গভীর শ্রদ্ধা ও দেশের সম্মান বাড়ানো সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। একজন নির্বাচিত ও জনসম্পৃক্ত সরকার প্রধান হিসেবে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্বকে তিনি অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। আন্তর্জাতিক শীর্ষ বিনিয়োগকারী, প্রাতিষ্ঠানিক প্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের এক অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নতজানু পররাষ্ট্রনীতির শিকল ভেঙে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছে বর্তমান সরকার। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা ও স্বকীয় বিষয়ে কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপকে বরদাশত না করে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে জোরালো ভাষায় ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ খুব স্পষ্ট ও কড়া বার্তা দিয়েছে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ বা একচ্ছত্র অধিকার নেই। কারণ জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতার মূল উৎস দেশের আমজনতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান ভিত্তি হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে ধারণ করে জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া।

আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও বৈদেশিক বাণিজ্যে মেগা প্রজেক্টের নামে অহেতুক ঋণগ্রহণ ও অনিয়মের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও উৎপাদনমুখী প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সংযোগ সুদৃঢ় করা হচ্ছে। বৈশ্বিক মহামারী কিংবা ভৌগোলিক সংঘাতময় পরিস্থিতিতেও দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কৌশলগত আলোচনার মাধ্যমে তেল, গ্যাস ও নিত্যপণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ নিশ্চিত করার সুদৃঢ় প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষা, আন্তর্জাতিক স্তরে বৈষম্যহীন শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ এবং প্রবাসে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদানে প্রতিটি কূটনৈতিক মিশনকে সরাসরি জনগণের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়েছে।

সর্বস্তরে সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও ভিআইপি প্রটোকল ও ক্ষমতার আভিজাত্য ভেঙে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। এই পুরো অগ্রযাত্রায় সরকারের নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত বিনয়ী, দূরদর্শী ও জনমুখী, যা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও দেশকে একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও মানবিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

১৮০ দিনের এই সংক্ষিপ্ত যাত্রায় আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি রন্ধ্রে যে আমূল পরিবর্তনের জোয়ার এসেছে, তা সাময়িক কোনো সাফল্য নয়। এটি প্রমাণ করেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে শীর্ষ সম্মান ও নেতৃত্ব অর্জন করা সম্ভব। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এই সুদৃঢ়, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন অবস্থান আগামী দিনে একটি স্বাবলম্বী, সুরক্ষিত, দুর্নীতিমুক্ত ও স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত নতুন বাংলাদেশের চিরস্থায়ী ও সুদৃঢ় পথচলা নিশ্চিত করছে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর