শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

সময়ের ভাষ্য

শামসুল আলম
প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

সময়ের ভাষ্য

আজ শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকার বাতাস আজ ‘মাঝারি বা সহনীয়’। সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্বের ১২৫টি শহরের বায়ুদূষণের তালিকায় ঢাকা ছিল ২৬তম; আইকিউএয়ারের হিসাবে দূষণের স্কোর ৭৩। ‘সহনীয়’ শব্দটি শুনে স্বস্তি পাওয়া যায় বটে, কিন্তু ঢাকার বাতাসের সঙ্গে আমাদের পুরোনো পরিচয় বলে, এই স্বস্তি খুব বেশি দিন বুকের মধ্যে রাখা ঠিক নয়। কারণ যে শহরের বাতাস মাঝেমধ্যে নিঃশ্বাস নেওয়ার অনুমতি দেয়, তার খাবার, পানি আর মাটির খবরও নিতে হয়। বিষ শুধু বাতাসে থাকে না; কখনো তা থালায় ওঠে, গ্লাসে ঢোকে, শিশুর খাবারে মিশে যায়।

মানুষের জীবন অবশ্য দপ্তরের মতো আলাদা আলাদা খোপে থাকে না। সকালে যে শিশু বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়, দুপুরে সে খাবার খায়, বিকেলে স্কুলে যায়, রাতে মোবাইল হাতে নেয়। অথচ রাষ্ট্র এসবকে আলাদা ফাইলে ভাগ করে দেখে। আজকের খবরগুলো পাশাপাশি রাখলে তাই মনে হয়, আমাদের আসল কথাটি হওয়া উচিত—শেকড়। কারণ গাছের শেকড় দেখা যায় না, কিন্তু গাছের সমস্ত সবুজ সেখান থেকেই আসে।

আজ ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার শেষ দিন। লাখ লাখ তরুণ-তরুণী আজ পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে জীবনের নতুন দরজায় দাঁড়াবে। কিন্তু একই সময়ে শিক্ষার পথ থেকে অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন কমতে থাকা শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার আবার বেড়েছে। প্রাথমিকে তা ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ, মাধ্যমিকে ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষার ফরমই পূরণ করেনি। পরীক্ষার প্রথম দিন অনুপস্থিত ছিল আরও ২৪ হাজার ৭৮৪ জন।

সংখ্যাগুলো কাগজে সংখ্যা; কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন। দারিদ্র্য, মুদ্রাস্ফীতি, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক দায়িত্ব, যাতায়াতের সমস্যা, শিক্ষার মান নিয়ে হতাশা—সব মিলিয়ে একটি শিশু একদিন বই বন্ধ করে দেয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে সামাজিক ও পারিবারিক বাধা অনেক সময় আরও ভারী। আমরা শেষ দৃশ্যটি দেখি—স্কুলে আর আসছে না। তার আগের দৃশ্যগুলো দেখি না। অথচ একটি শিশু স্কুল ছেড়ে দেয় একদিনে, তাকে স্কুল থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয় অনেক আগে।

এই কারণেই শিক্ষা শুধু বই, পরীক্ষা বা ভবন তৈরির বিষয় নয়। ক্ষুধার্ত শিশুকে স্কুলে ধরে রাখা যেমন শিক্ষানীতির অংশ, তেমনি তার পরিবারকে এমন অবস্থায় রাখা, যাতে শিশুটিকে কাজে পাঠাতে না হয়, সেটিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি সেতু নদী পার করে; একটি ভালো শিক্ষা একটি প্রজন্মকে পার করে দেয়।

কিন্তু যে শিশু বই ছেড়ে দেয়, তার সামনে জীবন থেমে থাকে না। কখনো সে শ্রমের দরজায় যায়, কখনো দ্রুত ধনী হওয়ার প্রলোভনের কাছে। অনলাইন জুয়ার বিস্তার এখন সেই প্রলোভনকে মানুষের পকেটের মোবাইল ফোনে এনে দিয়েছে। দুই টাকা দিয়ে দশ টাকা, দশ দিয়ে একশ—এই সহজ লাভের স্বপ্নে কৃষক, দিনমজুর, ভ্যানচালক থেকে নানা শ্রেণির মানুষ আন্তর্জাতিক বেটিং সাইটে ঢুকছেন। বিকাশ, নগদ, রকেটসহ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে চলছে লেনদেন; সিআইডি এমন লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত এক হাজারের বেশি এমএফএস এজেন্ট শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে।

জুয়ার আসর এখন কোনো অন্ধকার গলিতে নয়—মানুষের পকেটে। মোবাইলের পর্দায় এক টোকায় খুলে যায়। প্রযুক্তি এখানে অপরাধী নয়; মানুষের লোভকে প্রযুক্তির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া সংগঠিত চক্রটিই অপরাধী। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—মানুষ কেন এই ফাঁদে পড়ছে? দ্রুত অর্থের আকাঙ্ক্ষার পেছনে যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, হতাশা ও সামাজিক চাপ আছে, সেদিকেও কি আমরা যথেষ্ট তাকাচ্ছি?

কারণ মানুষ যখন নিঃস্ব হয়, গল্পের শেষ সবসময় মোবাইলের পর্দায় হয় না। কখনো তা ঋণে যায়, কখনো সংসারের অশান্তিতে, কখনো অপরাধে। আর তখন রাষ্ট্রের সঙ্গে তার দেখা হয় কারাগারের দরজায়।

দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ২৮৬ জন; অথচ ৩০ জুলাই পর্যন্ত সেখানে বন্দি ছিল ৯৩ হাজার ৪৪০ জন। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। কারাগারে থাকা সবাই অবশ্য দণ্ডিত অপরাধী নন; অনেকেই বিচারাধীন। বিচার শেষ হতে হতে যদি জীবনের কয়েকটি বছর কেটে যায়, তবে আইন তার কাজ করল—এই কথাটি বলা কঠিন। ছোটখাটো বিরোধ স্থানীয় পর্যায়ে নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়ানো, উপযুক্ত ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত কার্যকর করা এবং চলমান মামলার বিচার দ্রুত শেষ করা—এসব তাই শুধু প্রশাসনিক সংস্কার নয়, মানবিক প্রয়োজন।

স্কুল থেকে হারিয়ে যাওয়া শিশু, মোবাইলের পর্দায় জুয়ার ফাঁদে পড়া মানুষ, আর ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দিতে ভারী হয়ে ওঠা কারাগার—তিনটি আলাদা খবর নয়। প্রথমটিতে ভবিষ্যৎ ঝরে যাচ্ছে, দ্বিতীয়টিতে বর্তমান নিঃস্ব হচ্ছে, তৃতীয়টিতে অতীতের হিসাব জমছে। একটি সুস্থ রাষ্ট্রের কাজ শুধু তৃতীয় ছবিটি দেখে বন্দি গোনা নয়; প্রথম ছবিটি দেখে আগামী দিনের বিপদটিও চিনতে পারা।

এবার খাবারের কথায় আসি। কারণ শিশুকে স্কুলে রাখলাম, জুয়া থেকে দূরে রাখলাম, অপরাধে যেতে দিলাম না—তারপর যদি তার থালার খাবারেই বিষ থাকে, তবে রাষ্ট্রের আয়োজনের কোথাও একটা বড় ভুল রয়ে যায়।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা সত্যিই অস্বস্তিকর। ঢাকাসহ ১৯টি জেলা থেকে সংগৃহীত নমুনায় শাকসবজিতে অতিরিক্ত সিসা ও ক্যাডমিয়াম, সুপেয় পানিতে ফিকাল কলিফর্ম, শিশুখাদ্যে অতিরিক্ত সিসা ও প্রিজারভেটিভ এবং মুড়ি, গুড় ও জিলাপিতে ইউরিয়া ও সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইটের মতো শিল্প-রাসায়নিক পাওয়া গেছে। কোথাও ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ-এর ঘাটতি, কোথাও লবণে আয়োডিনের অপর্যাপ্ততা।

বিষের কবলে জনস্বাস্থ্য—এখানে শৈথিল্যের সুযোগ নেই। খাদ্যে বিষ মেশানো নিছক ব্যবসায়িক অসাধুতা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে অপরাধ। আইনের অভাবও নেই; অভাব ধারাবাহিক প্রয়োগের। লোকদেখানো অভিযান দিয়ে এই সংকট যাবে না। জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ে নমুনা পরীক্ষা, উৎপাদক থেকে বিক্রেতা পর্যন্ত নজরদারি, অসাধু রাসায়নিক বিক্রেতাদের আইনের আওতায় আনা এবং বিএফএসএ ও বিএসটিআইয়ের জনবল ও ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—এটি আশার কথা; এখন নির্দেশটির ফল মানুষের থালায় দেখা যেতে হবে।

খাদ্য নিরাপত্তার শেকড় অবশ্য বাজারে নয়, কৃষকের জমিতে। কৃষক নিরাপদভাবে উৎপাদন করতে না পারলে ভোক্তার খাবারও নিরাপদ হবে না। বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব ও নিরাপদ প্রযুক্তির প্রসার তাই শুধু কৃষির বিষয় নয়, জনস্বাস্থ্যেরও বিষয়।

এরই মধ্যে মালয়েশিয়া আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ আবার শুরু করার কথা জানিয়েছে। বহু পরিবারের জন্য এটি আশার খবর। আমাদের মানুষ কাজ করতে জানে, দূর দেশে গিয়ে ঘাম ঝরিয়ে পরিবার গড়তে জানে। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার দরজাটি যেন দালালের হাতে না থাকে—এটিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন শ্রমিক বিদেশে গেলে তার সঙ্গে শুধু পাসপোর্ট যায় না; যায় একটি পরিবারের সঞ্চয়, ঋণ, আশা এবং প্রার্থনা।

পৃথিবীটাও আজ খুব শান্ত নেই। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা পাওয়ার কথা বলছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরানে আলোচনা চলছে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেছেন, তেহরান হরমুজের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিয়ন্ত্রণ চায়। অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুতেও চাপ পড়েছে; ওয়াশিংটনকে মজুত পুনর্গঠনে সময় লাগবে বলে প্রতিরক্ষা শিল্পের পক্ষ থেকেও সতর্কতা এসেছে।

যুদ্ধের এই ক্লান্তি হয়তো শান্তির দিকে একটি ছোট জানালা খুলে দিতে পারে। কিন্তু হরমুজের মতো একটি সরু জলপথ যখন পৃথিবীর জ্বালানি অর্থনীতির এত বড় অংশের ভাগ্য নির্ধারণ করে, তখন একটি ভুল সিদ্ধান্তের ঢেউ হাজার হাজার মাইল দূরে গিয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বাজারও সেই ঢেউ থেকে মুক্ত নয়—জ্বালানি বাড়লে পরিবহন বাড়ে, পরিবহন বাড়লে খাদ্যের দাম বাড়ে, আর শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ধোঁয়া এসে পৌঁছে মানুষের রান্নাঘরে।

অন্যদিকে রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পথ খুলে দিতে পারে—এমন একটি বিল গতকাল মার্কিন সিনেটে ৮৬-১১ ভোটে পাস হয়েছে। চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় ক্রেতারা এতে বিপাকে পড়তে পারে। বিলটি এখন প্রতিনিধি পরিষদের বিবেচনার অপেক্ষায়। অর্থাৎ যুদ্ধ এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নেই; তা বাণিজ্যপথে, জ্বালানি বাজারে, শুল্কনীতিতে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের হিসাবের খাতাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

দূরের পৃথিবী তাই আসলে খুব দূরের নয়। ইরানের একটি সিদ্ধান্ত, রাশিয়ার একটি তেলের চালান, আমেরিকার একটি শুল্ক—সবশেষে এসে বাংলাদেশের বাজারের ব্যাগে ঢুকে পড়ে। পররাষ্ট্রনীতি তাই কোনো দূরের রাজনীতি নয়; জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক।

শনিবারের সকাল শেষ পর্যন্ত আমাদের সেই পুরোনো কথাটিই মনে করিয়ে দেয়—শেকড়কে শক্ত না করে গাছকে বড় করা যায় না। রাষ্ট্রের শেকড় হলো শিক্ষা, ন্যায়বিচার, নিরাপদ খাদ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, সততা এবং মানুষের আস্থা। শিশুটি স্কুলে থাকবে, তরুণটি জুয়ার ফাঁদে পড়বে না, বিচারাধীন মানুষ বছরের পর বছর কারাগারে থাকবে না, কৃষকের উৎপাদন বিষমুক্ত হবে, শ্রমিক নিরাপদে বিদেশে যাবে—এই ছোট ছোট নিশ্চয়তাগুলো মিলেই বড় রাষ্ট্র তৈরি হয়।

গাছের শেকড় মাটির নিচে থাকে বলে তার কোনো প্রচার নেই। তবু প্রতিটি পাতা জানে, তার জীবন কোথা থেকে আসে। রাষ্ট্রেরও তেমন হওয়া উচিত—উঁচু ভবন দিয়ে নয়, মানুষের জীবন দিয়ে তার শক্তি বোঝা যাবে।

মাটি আমাদের ধরে রাখুক, আর আমরা যেন আমাদের মানুষগুলোকে ধরে রাখতে পারি।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর