সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জীবন রক্ষার্থে দুই বছর আগে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার পর, তাঁর পলায়নের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে প্রথমবারের মতো ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে প্রকাশ্যে হাজির হবেন। (প্রথমে ভিডিওতে দেখা দেবেন বলা হলেও পরে ভারত সরকার জানিয়েছে, ভিডিও নয়, অডিওতে কথা বলবেন। শুধরে দিয়েছি।) সঙ্গে থাকবেন তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এবং অন্যান্য বক্তা। এ অনুষ্ঠানের আয়োজক ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া ইন নিউ দিল্লি’। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ভিডিওতে আবির্ভূত হওয়ার জন্য ধার্য করা দিনটি দুই বছর আগে বাংলাদেশ থেকে তাঁর বিদায় নেওয়ার দিন।
খুবই স্বাভাবিক যে, অনুষ্ঠানে তিনি রাজনৈতিক বক্তব্যই দেবেন। সাংবাদিক সংগঠনটির মাধ্যমে তিনি তাঁর কথা তাঁর দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ নেবেন। নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেবেন। বিরোধীদের তাঁর চিরাচরিত হুমকি-ধামকি দেবেন। শুরু থেকেই তিনি সীমিতভাবে তা করে আসছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচিও ঘোষণা করতে পারেন। কিন্তু খটকা অন্যত্র। ভারত সরকার একদিকে বলছে, “শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।” অন্যদিকে বলছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই, সেখানকার কোনো বক্তব্যও তারা সমর্থন করবে না।
ভারত সরকারের এমন নির্মোহ বক্তব্য শুনলে মনে হয়, শেখ হাসিনা দিল্লিতে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছেন। তিনি ভারত সরকারের অজান্তে ও চুপিসারে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে সম্মত হয়েছেন, এবং ভারত সরকার বা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এর কিছুই জানত না। ভারতের এই দ্বৈততায় মনে পড়ে আমেরিকান লেখক আইজ্যাক গোল্ডবার্গ (১৮৮৭–১৯৩৮)-এর কথা, যিনি বলে গেছেন, “তুমি যা বলো এবং তুমি যা করো, এই দুটির মধ্যে পার্থক্যই হলো কূটনীতি।”
লোকসভায় প্রতিবেদন:
গত বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ভারতের লোকসভায় উপস্থাপিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের ভূখণ্ডে থেকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ কাউকেই দেওয়া হবে না। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে।”
রণধীর জয়সওয়াল:
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল তাঁর নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, শেখ হাসিনা বুধবার দিল্লিতে যে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন, তার সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। সেই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই, সেখানকার কোনো বক্তব্যও তারা সমর্থন করবে না।
শামা ওবায়েদ:
“ভারতে বসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই,” মর্মে ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বলার পরও তিনি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন কি না, সে বিষয়ে ভারত সরকারকেই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা একজন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি এবং কার্যক্রম-নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রধান। তিনি কোথায় কী বলছেন, সেটির জবাব দেওয়া বাংলাদেশ সরকারের কাজ নয়।
সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে আসছে, ভারতে অবস্থানরত পলাতক আসামিরা যদি রাজনৈতিক বক্তব্য দেন বা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার কোনো ষড়যন্ত্রে জড়ান, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
আইসিটি'র চিফ প্রসিকিউটর:
“জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাভাবিক বক্তব্য প্রচারে আইনি বাধা নেই,” বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, “কোর্টের অর্ডারে বলা ছিল, উনি যেন বিদ্বেষমূলক কোনো কথা না বলেন। তাঁকে বক্তব্য দিতে বারণ করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য। যদি উনি স্বাভাবিক কথাবার্তা বলেন, ওটার ওপর তো কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।”




