মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

হরমুজ সংকট: সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা ও কূটনীতির পথ

মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

শেয়ার করুন:

হরমুজ সংকট: সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা ও কূটনীতির পথ
মো. মুখলেছুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি কেবল একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছার একমাত্র পথ এটিই। ফলে হরমুজে যেকোনো অস্থিরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনিশ্চিত করে তুলে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত  তথ্য অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে হরমুজ প্রণালি নিয়ে দ্রুত সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত সাধারণত আবেগ দিয়ে নয়, বরং সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি, কৌশলগত বাস্তবতা এবং জাতীয় স্বার্থের হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। কোনো রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা যত শক্তিশালীই হোক, যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থনৈতিক ব্যয়, আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া, আন্তর্জাতিক জনমত এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ফলাফল।

এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী (Realist) তত্ত্বের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। আধুনিক বাস্তববাদও এ কথাই বলে, শক্তির বিচক্ষণ ব্যবহারই প্রকৃত কৌশল। যুদ্ধের সম্ভাব্য খরচ ও অন্যান্য নেতিবাচক ফল যদি প্রত্যাশিত সাফল্যের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে কূটনৈতিক পথ বেছে নেওয়াও একটি যৌক্তিক কৌশল।

হরমুজ সংকটের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Deterrence বা প্রতিরোধনীতি। এর মূল দর্শন হলো—সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে এমন বার্তা দেওয়া, যাতে আক্রমণের মূল্য এত বেশি মনে হয় যে সে সংঘাতে জড়াতে নিরুৎসাহিত হয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ-কৌশল এবং অন্যান্য প্রতিরোধক্ষমতার মাধ্যমে এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে, যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষের জন্য যুদ্ধকে ব্যয়বহুল করে তুলে। এই কৌশল কতটা কার্যকর, তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও এটি বর্তমান ভূ-রাজনীতির একটি স্বীকৃত বাস্তবতা।

একই সঙ্গে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অর্থনীতি জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হলে তেল ও গ্যাস অবকাঠামো, সমুদ্রবন্দর এবং বাণিজ্যিক নৌপথ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে এসব দেশের জন্য যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানই অধিক গ্রহণযোগ্য।

তবে বর্তমান সংকট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সংযম জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা রাজনৈতিক বক্তব্যে যে সব তথ্য উঠে আসে, তার সবই সমানভাবে সত্য নয়। আন্তর্জাতিক সংকটের সময় তথ্যযুদ্ধও বাস্তব যুদ্ধের অংশ হয়ে ওঠে। তাই কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে যাচাইযোগ্য তথ্য, আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এবং নির্ভরযোগ্য গবেষণার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার দাবি।

এ কথা তো খুবই স্পষ্ট, হরমুজ সংকট আবারও প্রমাণ করেছে যে আধুনিক বিশ্বে সামরিক শক্তি একমাত্র নির্ধারক নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা এবং কূটনৈতিক সমীকরণ—সব মিলিয়েই এখন রাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়। ফলে যুদ্ধ শুরু করার সক্ষমতার চেয়েও কখন, কোথায় এবং কীভাবে সেই শক্তি ব্যবহার করা হবে—সেই সিদ্ধান্তই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বুঝতে হলে আমাদের সামরিক শক্তির প্রচলিত ধারণার বাইরে এসে আধুনিক যুদ্ধের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত চরিত্র বিশ্লেষণ করতে হবে।

আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র বদলে গেছে। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং রাজনৈতিক সাফল্য সব সময় সমার্থক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সর্বাধিক শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান এবং ইরাকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, উন্নত প্রযুক্তি ও বিপুল সামরিক সক্ষমতা থাকলেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ নিশ্চিত নাও হতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়ে, জনমত বদলে যায়, মিত্রদের সমর্থন দুর্বল হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির সমীকরণও বদলাতে পারে।

এই বাস্তবতায় ইরানকে বোঝার জন্য Asymmetric Warfare বা অসমমিত যুদ্ধের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলো সাধারণত প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রচলিত সামরিক প্রতিযোগিতায় না গিয়ে এমন কৌশল গ্রহণ করে, যা যুদ্ধের ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, দ্রুতগতির নৌযান, সাইবার সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর চাপ সৃষ্টির মতো উপাদান এই কৌশলের অংশ। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে ইরানের প্রতিরক্ষা নীতিকে এই কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত বলে মনে হয়।

এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, হরমুজ প্রণালি শুধু একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয়; এটি একটি কৌশলগত ফাঁদ। এখানে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে যেকোনো সামরিক পরিকল্পনায় যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখতে হয়।

তবে এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না যে একটি নির্দিষ্ট সংকটই কোনো পরাশক্তির অবসানের সূচনা। ইতিহাস বলছে, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য সাধারণত ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, আর্থিক প্রভাব, জোটরাজনীতি এবং কূটনৈতিক সক্ষমতার সমন্বয়েই আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠে বা পরিবর্তিত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সফট পাওয়ার ধারণার গুরুত্বও বেড়েছে। আধুনিক বিশ্বে একটি রাষ্ট্রের প্রভাব শুধু তার সামরিক শক্তি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং শিক্ষা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব, কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বৈশ্বিক জনমতের ওপর ইতিবাচক প্রভাবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক শক্তি সংঘাত শুরু করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। সেই কাজটি শেষ পর্যন্ত কূটনীতিকেই করতে হয়।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন আর একমেরুকেন্দ্রিক নয়। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার কৌশলগত সক্রিয়তা, ভারতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা, পাকিস্তানের কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আত্মপ্রকাশ, বিশ্ব রাজনীতিকে আরও জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে। বিশ্ব ধীরে ধীরে এমন একটি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে একাধিক শক্তিকেন্দ্র আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন

রোহিঙ্গা সংকট: মালয়েশিয়ার ঘোষণায় আশার আলো ও বাংলাদেশের করণীয়

এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশ

হরমুজ সংকট এই পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। এখানে যুদ্ধ, অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইন—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে একটি সামরিক সিদ্ধান্তের প্রভাব কেবল যুদ্ধরত পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বিশ্ববাজার, মুদ্রাস্ফীতি, সরবরাহ চেইন এবং বহু দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও প্রতিফলিত হয়।

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই—একবিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কেবল অস্ত্রভাণ্ডারের আকারে নয়, বরং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা, কৌশলগত ধৈর্য, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর কূটনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেই নিহিত।

হরমুজকে ঘিরে চলমান অস্থিরতা বাংলাদেশেও প্রভাব ফেলেছে। ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকলেও দেশের জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এবং মূল্যস্ফীতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ব্যয়, শিল্পের উৎপাদন খরচ এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পড়ে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা। জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার—এসব এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত প্রয়োজনও।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতায় কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে বাস্তবসম্মত কৌশল।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যে প্রবণতা দেখা যায়, বাস্তবতা ততটা সরল নয়। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে কেবল যুদ্ধ জয়ের সক্ষমতাই যথেষ্ট নয়; সংঘাত এড়িয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনের ক্ষমতাই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত কৌশলগত শক্তির পরিচয়।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর