রোববার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

মির্জা ফখরুলের বক্তব্য: হতাশার মধ্যেও আলোর প্রদীপ

শায়রুল কবির খান
প্রকাশিত: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম

শেয়ার করুন:

মির্জা ফখরুলের বক্তব্য: হতাশার মধ্যেও আলোর প্রদীপ
শায়রুল কবির খান। ছবি: সংগৃহীত

‘গত ৫ মাসে কিছুই বদলায়নি’ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই বক্তব্য ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন সমবায় মন্ত্রণালয় এবং সরকারি দল বিএনপির মহাসচিব অর্থাৎ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি। তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, চিন্তাশীল, সৎ, যৌক্তিক রাজনীতিক। এরকম একজন বিবেক বিবেচনাবোধ রাজানীতিক এই সময়ে এসে আবেগতাড়িতভাবে কিছু জনসমক্ষে বক্তব্য রাখবেন, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। একজন সজ্জন ব্যক্তি ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে তার যা বলার কথা, তিনি তা-ই বলেছেন। আর এ কারণেও তার কথাটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

যারা তাকে কাছে থেকে দেখেছেন বা চিনেছেন, তারা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারেন, তিনি এই বক্তব্য সচেতনভাবে এবং দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন। নিশ্চিতভাবেই দেশের, দলের, সরকারের এবং সরকার প্রধানের কল্যাণে ও তার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং সাফল্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষা রেখে বলেছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অনেক বক্তব্য তাৎক্ষণিক উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না, তবে তা পরে সবার উপলব্ধি হয়। আমি কাছে থেকে অনেক বক্তব্য বা লেখা পর্যালোচনা করেছি।

তিনি কতটা বিচক্ষণ তাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রত্যক্ষভাবে লক্ষ্য করেছি। আগস্টের ৩ তারিখ ২০২৪ জুলাই আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে কারাগারে বন্দী বিএনপি স্থায়ী কমিটি সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এই আন্দোলন সফল হবে তা সময়ের ব্যাপার মাত্র।’ তিনি ছাত্র শ্রমিক জনতার আন্দোলনের পক্ষ থেকে বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কর্মসূচিতে পাশে থাকতে ও মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

গত ৩০ জুলাই ২০২৬ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে যে কথাগুলো বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন। শুরুতেই তিনি বলেন, মাত্র চার থেকে পাঁচ মাসের মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতায় রাষ্ট্রযন্ত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখতে পাননি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের পর নিজের আক্ষেপ প্রকাশ করেন। আগে যারা ঘুষ খেত, তারা এখনো একইভাবে ঘুষ খাওয়ার ফন্দি-ফিকির করছে। একইভাবে যারা ভালো একটা কাজ আটকে দিত, তারা এখনো তা আটকে দিচ্ছে। লোকজন ভোল পালটাচ্ছে। ওরাই এখন অনেক বেশি ‘জুলাই যোদ্ধা’ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

কোটা থেকে গণঅভ্যুত্থান, তবু চাকরিতে বৈষম্য দূর করা কঠিন

এতবড় গণজাগরণ ও রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ঘটে যাওয়ার পরেও আমাদের আমলাতন্ত্রের মনোজগতে কোনো পরিবর্তন না হওয়াটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তাদের পেশাগত কাজকর্মের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। ফলে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্নীতি সবকিছুই আগের মতোই অব্যাহত রয়ে গেছে। ফলে মির্জা ফখরুলের মতো নেতা হতাশ হতেই পারেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, এই কথাগুলো আক্ষেপে বলছি। আক্ষেপে বলছি এ জন্য, আমার বয়স অনেক। আমি তো সত্যিকার অর্থেই এবার পরিবর্তনটা দেখতে চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত সেটা আমি দেখছি না আমাদের মধ্যে। প্রশাসনের পুরোনো সংস্কৃতি বহাল রয়েছে। শুধু সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের মন-মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন, অন্যথায় জুলাইয়ের আত্মত্যাগ কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনবে না।

Fakhrul
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেছেন, তবে শিক্ষামন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী সচিবালয়ে তদবির কারকদের ভিড়ের কথা সামনে এনেছেন। তারা বলেছেন, তদবিরকারীদের ভিড়ে সচিবালয়েই ঢুকতে পারছেন না। অথচ জুলাইয়ের পর বড় ধরনের পরিবর্তনই ছিল কাঙ্ক্ষিত। অনেক রক্ত দিয়ে জুলাই সফল হয়েছিল। অনেক আশা-ভরসা করে জনগণ বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছে। আর শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনে মির্জা ফখরুল নিজেও ভয়াবহ রকমের কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছেন। ফলে পরিবর্তনকে তিনি অনেক বেশি আন্তরিকভাবে কামনা করেন।

অবশ্য তিনি হতাশায় ভেঙে পড়েননি। তিনি জানেন, এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি। তবে হবে। কারণ নেতৃত্বে আছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম-এর রক্তের ও নীতির উত্তরাধিকার তারেক রহমান। তবে তিনি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস থেকে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রচেষ্টায় পরিবর্তন দেখছেন স্পষ্ট উল্লেখ করেন। তিনি একারণেই আশাবাদী হয়ে পরিবর্তন দেখছেন একজন মানুষের মধ্যে, তিনি তারেক রহমান। তিনি চেষ্টা করছেন। তিনি নতুন নতুন নজির স্থাপন করছেন। সেই নজিরকে যদি সবাই মিলে সামনে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে হয়তোবা পরিবর্তনটা হবে। সে জন্য সবাই মিলে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন দেওয়া দরকার।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই স্পষ্ট বক্তব্য সাধারণ রিকশাচালক থেকে দিনমজুর সচেতন, শিক্ষিত, কর্মজীবী নারী-পুরুষ স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মন্তব্য করেছেন যে, এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সহযোগিতা করা সমর্থন করা দেশের কল্যাণে আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। তাদের মতে, তারেক রহমান যে গতিতে চলতে চাচ্ছেন, তাতে সরকারের বাকি অংশ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চলতে পারছেন না। এতেই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। আবার এটাও সত্যি যে, দেশের প্রশাসনের বড় একটি অংশ, শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামগ্রিক সামাজিক পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। এই বাস্তবতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন একটু দেরি হওয়া খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। দীর্ঘ স্বৈরশাসনে লাগামবাড়া যে দুর্নীতি মচ্ছব চলছি, তা রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশা কেউ করে না। তবে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রিত হওয়াটাই কাম্য।

আরও পড়ুন

ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা

গতকাল একটি কফিশপে কয়েকজন আড্ডার কথোকপথন দেখছিলাম, তারা নিজেরা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বক্তব্য এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাজ ও তার আন্তরিক চেষ্টা এবং চারপাশের নানা অসঙ্গতি নিয়ে যুক্তিতর্ক করছেন। হঠাৎ করে একজন আমাকে আহ্বান জানালেন তাদের সাথে কফি খেতে। আমাকে চিনে এক বাক্য সবাই বললেন, মহাসচিব স্যারকে আমাদের সালাম জানাবেন, তার এই বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী হাত শক্তিশালী হবে। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে আন্তরিকতার সাথে পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করছেন অতি সাধারণভাবে, তিনি তার বাবার মতো কাজ করছেন। তার কাজেই এই ধরন জনগণ মন থেকে গ্রহণ করেছে। একইভাবে তিনি মহাসচিবের বক্তব্য সূত্র ধরে ব্যবস্থা নিতে পারবেন। দুষ্টুরা, অপরাধীরা, মুখোশধারীরা সাবধান হয়ে যাবেন কিংবা ধরা পড়বে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সেজন্য দেশের কল্যাণে সরকারকে উন্নয়নমূলক ও গুণগত পরিবর্তন করার তার ঘোষিত ‘৩১-দফা’ বাস্তবায়নে সাহায্য করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর