বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, ঢাকা

ভিত শক্ত রাখলে অস্থির বিশ্বেও স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম হবে বাংলাদেশ

শামসুল আলম
প্রকাশিত: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

ভিত শক্ত রাখলে অস্থির বিশ্বেও স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম হবে বাংলাদেশ

সকালের শিশিরে ভেজা মাটির গন্ধের মতো কিছু সত্য কখনো উচ্চস্বরে কথা বলে না; তবু তার উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না। মাটিই আমাদের দাঁড়াতে শেখায়, আবার পড়ে গেলে ফিরে আসার সাহসও দেয়। একটি রাষ্ট্রেরও তেমনই একটি মাটি আছে—সেটি মানুষের আস্থা, প্রতিষ্ঠানের সততা এবং পরিশ্রমের নীরব শক্তি। আজকের প্রভাতবার্তায় তাই খবরের ভেতর দিয়ে আমরা সেই মাটির খবরই পড়ব-যেখানে রাজনীতি আছে, অর্থনীতি আছে, আছে মানুষের ভবিষ্যতের বীজও।

ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক নতুন এক পর্বে প্রবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে ‘সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিক সম্মান’-এর ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার কথা আবারও আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ব্রিকস-সম্পর্কিত কূটনৈতিক সম্ভাবনাও পর্যালোচনায় রয়েছে। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অপরিহার্য শর্ত। তবে সেই সম্পর্কের ভিত হতে হবে আত্মমর্যাদা ও সমতার ওপর-নির্ভরতার ওপর নয়। যে রাষ্ট্র নিজের মাটিতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়, কেবল সেই রাষ্ট্রই প্রতিবেশীর সঙ্গে সত্যিকারের বন্ধুত্ব করতে পারে।

ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে সরকারের নতুন প্রস্তুতি সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ। বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন, উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতের নির্দেশ প্রমাণ করে যে দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু প্রতিক্রিয়া নয়, প্রস্তুতিই সবচেয়ে বড় শক্তি। বাংলাদেশ বহু প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়ে উঠে দাঁড়াতে শিখেছে। কিন্তু নগরায়ণের এই যুগে একটি বড় ভূমিকম্প শুধু ভবন নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতাকেও পরীক্ষা করবে। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেবল সরকারের কাজ নয়; এটি নাগরিক শিক্ষা, নগর পরিকল্পনা এবং সামাজিক দায়িত্বেরও অংশ। নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে হলে আজই প্রস্তুতির বীজ বপন করতে হবে।

অর্থনীতির খবরে একটি ছোট্ট স্বস্তি এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে সার্বিক পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশ থেকে কমে ৯.১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, চাপ কিছুটা কমেছে; কিন্তু বাজারে দাঁড়ানো একজন মানুষের অনুভূতি এখনো তেমন বদলায়নি। চাল, ডাল, তেল কিংবা সবজির দাম যদি সংসারের হাড়িতে স্বস্তি ফিরিয়ে না আনে, তবে কাগজের সংখ্যার আনন্দ অসম্পূর্ণই থেকে যায়। তবু অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রবণতারও মূল্য আছে। কারণ বড় পরিবর্তন অনেক সময় এমন ছোট ছোট সংখ্যার ভেতর দিয়েই শুরু হয়। এখন প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকতা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের বাস্তব উদ্যোগ।

রোহিঙ্গা সংকটের একটি নতুন সম্ভাবনার আভাস দেখা যাচ্ছে। মিয়ানমারের কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে নীতিগত অগ্রগতির খবর আশার আলো জাগিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করে বিশ্বের অন্যতম বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। কিন্তু মানবিকতারও একটি বাস্তব সীমা আছে। নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান। এই অগ্রগতি বাস্তবে রূপ নিলে শুধু কক্সবাজার নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আজকের সম্পাদকীয় ভাবনা মাটিকে নিয়েই।

একটি গাছকে বড় করতে যেমন শুধু পানি দিলেই হয় না, তার শিকড়ের নিচের মাটিও উর্বর হতে হয়; রাষ্ট্রও তেমনি শুধু বড় বড় প্রকল্পে শক্তিশালী হয় না। শক্তি আসে প্রতিষ্ঠানকে সৎ রাখার মধ্য দিয়ে, প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার মধ্য দিয়ে, কৃষকের উৎপাদনকে মর্যাদা দেওয়ার মধ্য দিয়ে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে। ইতিহাস বলে, যেসব রাষ্ট্র নিজের মাটির কথা ভুলে গেছে, তারা একসময় প্রাসাদ বানিয়েও ভিত রক্ষা করতে পারেনি। আর যেসব রাষ্ট্র মাটিকে আগলে রেখেছে, তারা ঝড়ের মধ্যেও টিকে থেকেছে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উন্নয়নের গতি নয়; উন্নয়নের ভিত্তি কতটা শক্ত, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। মিয়ানমার সংকট, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর নতুন প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও সতর্কতার বার্তা বহন করছে। পৃথিবী ক্রমেই এমন এক সময়ে প্রবেশ করছে, যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হবে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য।

বাংলাদেশ যদি নিজের ভিত মজবুত রাখতে পারে, তবে বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও সে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম হবে। দিনের শেষে আবারও ফিরে আসি মাটির কাছে। মাটি কখনো তাড়াহুড়ো করে না; তবু তার বুকেই বীজ অঙ্কুরিত হয়, শস্য জন্মায়, সভ্যতা গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রের জীবনও তেমনই। ধৈর্য, সততা, পরিশ্রম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা-এই চারটি বীজ যত্নে রোপণ করতে পারলে একদিন তার ফল পুরো জাতিই ভোগ করবে।

পবিত্র কোরআন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-এই মাটি থেকেই মানুষের সৃষ্টি, মৃত্যুর পর এই মাটিতেই প্রত্যাবর্তন, এবং পুনরুত্থানও হবে এই মাটি থেকেই। তাই মাটিই আমাদের শুরু, আমাদের অবস্থান, আবার আমাদের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তনের ঠিকানাও। যে জাতি নিজের মাটির মর্যাদা রক্ষা করে, সেই জাতিই নিজের ভবিষ্যতের ভিত্তি শক্ত করে। আজকের দিনটি তাই আমাদের মনে করিয়ে দিক-নিজের মাটিকে ভালোবাসা মানেই নিজের মানুষ, নিজের রাষ্ট্র এবং নিজের ভবিষ্যৎকে ভালোবাসা।

লেখক: সাবেক সচিব ও সিনিয়র ব্যুরোক্রেট বিশ্লেষক

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর