বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের অবদান কেবল তাঁদের নিজস্ব সৃষ্টিকর্মে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁরা একটি সাহিত্য-প্রজন্মের নির্মাতা, পথপ্রদর্শক এবং অভিভাবক। কবি আল মুজাহিদী ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। কবি, উপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক—সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যচর্চার এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। তাঁর প্রয়াণে দেশের সাহিত্যাঙ্গন হারাল এক নিরহংকার, সৃজনশীল এবং প্রজ্ঞাবান মানুষকে।
শৈশব, শিক্ষা ও সাহিত্যযাত্রা: ১৯৪০ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন আল মুজাহিদী। সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি শৈশব থেকেই লেখালেখির প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। তাঁর বাবা নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন তরুণ আল মুজাহিদীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
১৯৬০ সালে টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পৃথকভাবে দুটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ষাটের দশকের আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি অংশগ্রহণ করেন।
কবিতা ছিল তাঁর সৃজনশীলতার প্রধান ক্ষেত্র। তবে তিনি নিজেকে কখনো একটি ধারায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। কবিতার পাশাপাশি উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য এবং সাহিত্যবিষয়ক নানা রচনায় তিনি সমান স্বচ্ছন্দ ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক, যার মধ্যে কুড়িটিরও বেশি কাব্যগ্রন্থ। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি নিজস্ব ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক বোধের মাধ্যমে পাঠকমহলে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া তিনি ‘জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার’, ‘কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার’, ‘মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার’, ‘শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার’ এবং ‘জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার’-সহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন। সর্বশেষ ২০২২ সালে তাঁকে প্রদান করা হয় ‘কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার’। তবে পুরস্কার ও সম্মাননার চেয়েও বড় ছিল পাঠকের ভালোবাসা এবং সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা।
সম্পাদনা জীবন: আল মুজাহিদীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় তাঁর সম্পাদনা-জীবন। দেশের ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ইত্তেফাকে তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সম্পাদনায় সাহিত্যপাতা হয়ে ওঠে নবীন ও প্রবীণ লেখকদের মিলনমঞ্চ। অসংখ্য তরুণ লেখক তাঁর হাত ধরে জাতীয় পর্যায়ে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন।
২০১২ সালে তিনি দৈনিক যায়যায় দিন-এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সেখানেও তিনি একই নিষ্ঠা ও দক্ষতায় সাহিত্যচর্চা ও সম্পাদনার কাজ চালিয়ে যান। জীবনের শেষ পর্যায়ে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো ষান্মাসিক সাহিত্যপত্র ‘নতুন এক মাত্রা’। নতুন চিন্তা, নতুন লেখক এবং নতুন সাহিত্যধারার প্রতি তাঁর আগ্রহ এই পত্রিকার মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ব্যক্তিগত স্মৃতি: আমার সঙ্গে কবি আল মুজাহিদীর পরিচয় হয় ১৯৯৯ কিংবা ২০০০ সালের দিকে, দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়ে।কবি জাকির আবু জাফরের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে। তখন তিনি ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই তাঁর আন্তরিকতা, সৌজন্য ও মানবিক ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করে। পরবর্তী সময়ে সেই পরিচয় ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের রূপ নেয়।
কিশোর কণ্ঠের সাহিত্যসভা, সাহিত্য পুরস্কার এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে যুক্ত ছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি কিশোর কণ্ঠ পরিবারের একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। বিশেষ করে ঈদ সংখ্যা ও বিশেষ সাহিত্য সংখ্যায় তাঁর লেখা পাঠকদের কাছে ছিল বিশেষ আকর্ষণের বিষয়। তাঁর উপস্থিতি যেকোনো সাহিত্য আয়োজনকে সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান করে তুলত।
তাঁর বিনয় ও দায়িত্ববোধের একটি ঘটনা আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল। একবার একটি উপন্যাস প্রকাশের জন্য তিনি আমাদের কাছে দিয়েছিলেন। পরে তাঁর মনে হলো, লেখার একটি অংশ বাদ পড়ে গেছে। পরদিন তিনি নিজে অফিসে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বললেন, “ভাইয়া, একটু লেখা বাকি ছিল, কিছু মনে করবা না।” একজন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের এমন বিনয় সত্যিই বিরল। এই ছোট্ট ঘটনাই তাঁর ব্যক্তিত্বের গভীরতা ও মানবিকতার পরিচয় বহন করে।
মূল্যবোধ ও অবদান: আল মুজাহিদী ছিলেন দৃঢ় মূল্যবোধসম্পন্ন একজন মানুষ। সাহিত্যিকদের বিভিন্ন আড্ডা ও অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। একবার এক কবির বাসায় এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যেখানে একজন মানুষ নামাজে যাওয়ায় তাঁকে বিদ্রূপ করা হয়। ফেরার পথে তিনি গভীর কষ্ট প্রকাশ করে বলেছিলেন, “দেখো, একজন মুসলমান মানুষ নামাজে গেল, সেটাকেও বিদ্রূপ করা হচ্ছে!” এই ঘটনায় তাঁর ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানুষের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নৈতিক সংবেদনশীলতার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তিনি যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করতেন। নতুন লেখকদের উৎসাহ দেওয়া, ভালো লেখা খুঁজে বের করা এবং সাহিত্য নিয়ে প্রাণবন্ত বিতর্কে অংশ নেওয়া ছিল তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের জীবন, সমাজ ও মূল্যবোধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
একজন সম্পাদক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নতুন প্রতিভা আবিষ্কারের ক্ষমতা। তিনি লেখকের পরিচয় নয়, লেখার মানকে গুরুত্ব দিতেন। ফলে নবীন লেখকেরা তাঁর কাছে সহজেই পৌঁছাতে পারতেন এবং পেতেন আন্তরিক উৎসাহ ও পরামর্শ। এ কারণেই তিনি সাহিত্যাঙ্গনে একজন সত্যিকারের অভিভাবক হিসেবে সমাদৃত ছিলেন।
দীর্ঘ অসুস্থতাও তাঁকে সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি লিখেছেন, পড়েছেন, সম্পাদনা করেছেন এবং সাহিত্য নিয়ে ভেবেছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সাহিত্য কেবল পেশা নয়, এটি এক ধরনের সাধনা।
সবশেষে বলবো, আজ কবি আল মুজাহিদী আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন অগণিত কবিতা, উপন্যাস, গল্প, শিশুসাহিত্য, সম্পাদনার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার এবং অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে অম্লান স্মৃতি। বাংলা সাহিত্য তাঁকে স্মরণ করবে একজন সৃজনশীল কবি হিসেবে; সাংবাদিকতা তাঁকে স্মরণ করবে একজন দূরদর্শী সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে; আর আমরা, যারা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি, তাঁকে স্মরণ করব একজন বিনয়ী, মানবিক ও হৃদয়বান মানুষ হিসেবে।
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু কর্ম অমর। কবি আল মুজাহিদীর সাহিত্যকর্ম ও সম্পাদনা-অবদান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলো ছড়াবে। মহান আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তাঁর সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করেন। তাঁর কবরকে প্রশস্ত ও আলোকিত করুন। তাঁর সাহিত্যসাধনাকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর কবিতা আছে; তাঁর সম্পাদিত সাহিত্যপাতার স্মৃতি আছে; তাঁর স্নেহ, ভালোবাসা ও প্রেরণা আছে। বাংলা সাহিত্য যতদিন বেঁচে থাকবে, কবি আল মুজাহিদীর নামও ততদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
আল্লাহ তাঁকে মাগফিরাত দান করুন। আমিন।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, ইউরোবার্তা




