বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে পুঁজিবাজারে লেনদেন বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতি এবং নতুন শিল্প বিনিয়োগের খবর আশাবাদের জন্ম দিচ্ছে; অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে সঞ্চিত ঝুঁকি, বিপুল পরিমাণ সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এবং সুশাসনের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে সাম্প্রতিক ইতিবাচক সূচকগুলোকে স্বাগত জানালেও বাস্তব চিত্রের গভীরে নজর দেওয়া জরুরি।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ১,২১১ কোটি টাকার লেনদেন এবং সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিঃসন্দেহে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে। দীর্ঘ সময়ের স্থবিরতা ও আস্থাহীনতার পর এমন প্রবণতা বাজারের জন্য ইতিবাচক। বিশেষ করে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের মতো মৌলভিত্তিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখায় যে বাজারে এখনো সুস্থ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, সূচকের সাময়িক উত্থানকে কখনোই বাজারের প্রকৃত শক্তির প্রতীক হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করে তথ্যের স্বচ্ছতা, কর্পোরেট সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতার ওপর।
বিজ্ঞাপন
অর্থনীতির আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি। রিজার্ভ ৩৫.৭৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া দেশের বহির্বাণিজ্য ও আর্থিক সক্ষমতার জন্য একটি স্বস্তিদায়ক বার্তা। বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ত মজুত শুধু আমদানি ব্যয় নির্বাহ বা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাই বাড়ায় না, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছেও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার বার্তা পৌঁছে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিজার্ভ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটে এই অগ্রগতি অবশ্যই ইতিবাচক।
শিল্পায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও কিছু আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ সামনে এসেছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৪,১৮৯ কোটি টাকার চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন দেশের শিল্পভিত্তি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতিতে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের এই সময়ে বাংলাদেশ যদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তাহলে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, কেবল প্রকল্প অনুমোদনই যথেষ্ট নয়; সফল বাস্তবায়নই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
পুঁজিবাজারে ডিএসইর ৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকা প্রকাশও তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, একই সঙ্গে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতারও প্রতিফলন। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন, কর্পোরেট আচরণ এবং শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কারণ আস্থার ভিত্তি দুর্বল হলে কোনো পুঁজিবাজারই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না।
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কিছু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনতে পারে। ইরানের ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। জ্বালানি ব্যয় কমলে উৎপাদন খরচ হ্রাস, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে এই সুযোগের পূর্ণ সুবিধা নিতে হলে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম ব্যাংকিং খাত। সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ১০.৮৭ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছানোর খবর কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; এটি আর্থিক খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং জবাবদিহিতার সংকটের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু প্রতিবেদনে উল্লিখিত সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও বাস্তবতা হলো—খেলাপি, পুনঃতফসিলকৃত এবং পুনর্গঠিত ঋণের উচ্চমাত্রা অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি।
ব্যাংকিং খাত সুস্থ না থাকলে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যাংকের অর্থ আটকে গেলে নতুন উদ্যোক্তা অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন, উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ব্যাংক খাতের সংস্কার এখন আর কেবল একটি নীতিগত আলোচনার বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্তে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। সূচকের উত্থান, রিজার্ভ বৃদ্ধি কিংবা নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প অর্থনীতির জন্য আশার খবর বটে; কিন্তু এগুলো তখনই টেকসই সুফল বয়ে আনবে, যখন আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বাজারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে স্বল্পমেয়াদি ইতিবাচক সূচকের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে। কারণ অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি সূচকের সাময়িক উত্থানে নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং জনগণের আস্থার ওপরই নির্ভর করে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী




