মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ঢাকা

আত্মমর্যাদার কূটনীতি: প্রতিবেশী বাস্তবতা ও বাংলাদেশের করণীয়

মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম

শেয়ার করুন:

Mukhlesur-Rahman
মো. মুখলেছুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাকে ভারতে প্রবেশের সময় অবাঞ্ছিত আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাটি নিছক একজন ব্যক্তির সঙ্গে নয়; এটি রাষ্ট্রের মর্যাদা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

তবে এ ধরনের ঘটনাকে কেবল দলীয় বা ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিষয়টির গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ঘটনার শিকার ব্যক্তি উপদেষ্টা, মন্ত্রী কিংবা সাধারণ নাগরিক—যেই হোন না কেন, বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশির সঙ্গে অযৌক্তিক ও অসম্মানজনক আচরণ অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। কারণ শেষ পর্যন্ত এটি একজন ব্যক্তির নয়, একটি রাষ্ট্রের নাগরিকের মর্যাদার প্রশ্ন।


বিজ্ঞাপন


ভূ-রাজনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো—প্রতিবেশীকে পরিবর্তন করা যায় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা প্রথম পাঠেই শিখে যে, ভূগোল অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত একটি অনিবার্য বাস্তবতা। চারদিক থেকে ঘিরে থাকা বৃহৎ এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কখনোই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একইভাবে ভারতের পক্ষেও বাংলাদেশকে অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়।

প্রশ্ন হলো, প্রতিবেশী যদি আপনার চেয়ে অধিক শক্তিশালী হয়, তাহলে সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা যায়?

ব্যক্তিগত জীবনের একটি সাধারণ উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। কোনো প্রভাবশালী প্রতিবেশী যদি বারবার আপনাকে হয়রানি করে, তাহলে প্রথমে আপনি অন্য প্রতিবেশীদের সহযোগিতা চাইবেন। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হবেন। কিন্তু যখন এসব ব্যবস্থা কার্যকর না হয়, তখন একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো নিজেকে শক্তিশালী করে তোলা—অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা কাজ করে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি মূলত শক্তির রাজনীতি। এখানে ন্যায়বিচারের ভাষা যতটা উচ্চারিত হয়, বাস্তবে শক্তির প্রভাব তার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন কিংবা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিশ্বব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র এখনও অনেকাংশে ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। বড় রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে—এটাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কেবল প্রতিবাদ জানানো যথেষ্ট নয়; নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো আরও বেশি জরুরি।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন

কূটনীতির ব্যস্ত মৌসুমে বাংলাদেশ: সুযোগ, চ্যালেঞ্জ ও নতুন বাস্তবতা

দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও বাংলাদেশ তার পূর্ণ সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে দুর্নীতি, অর্থপাচার, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার সংকটও গভীর হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

একটি দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা কেবল তার সেনাবাহিনীর শক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সুশাসন এবং দক্ষ কূটনীতি—সবকিছুর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে জাতীয় শক্তি। যে দেশ জ্ঞান উৎপাদন করে, প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার কণ্ঠস্বরও অধিক গুরুত্ব পায়। এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি জ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে? আমাদের মেধাবীরা কি রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে যথাযথভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছেন? রাষ্ট্রের সম্পদ কি পুরোপুরিভাবে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে, নাকি বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে না পারলে কেবল কূটনৈতিক প্রতিবাদে পরিস্থিতির পরিবর্তন আসবে না।

jAYED
ডা. জাহেদ ইস্যু ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, জাতীয় মর্যাদা অর্জনের জন্য আত্মনির্ভরশীল হওয়া ও যথোপযুক্ত সক্ষমতা অর্জনের বিকল্প নেই। যে রাষ্ট্র নিজের প্রযুক্তি উন্নয়ন করে, শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলে এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে, তার নাগরিকরাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অধিক সম্মান পায়।

বাংলাদেশের জন্যও একই পথ অনুসরণ করা প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে বৈরিতা নয়, বরং ন্যায্যতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। এ লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ, শক্তি ও সক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে। দুর্বলতা কখনো মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে না।

আরও পড়ুন

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে ‘নতুন কাঁটা’ ডা. জাহেদ ইস্যু

আজকের ঘটনাটি তাই শুধু একটি কূটনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পেরেছি, যার নাগরিককে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে মর্যাদার সঙ্গে বিবেচনা করা হয়?

যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে দোষারোপের রাজনীতি নয়; প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। প্রয়োজন শিক্ষা, গবেষণা, সুশাসন, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা এবং জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

রাষ্ট্রের মর্যাদা কূটনৈতিক নোটে নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক শক্তিতে প্রতিফলিত হয়। যে জাতি নিজেকে শক্তিশালী করতে পারে, বিশ্বও তাকে সম্মান করতে বাধ্য হয়। আর যে জাতি নিজের ভেতরের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে না, তার অভিযোগের ভাষা যতই জোরালো হোক না কেনো, আন্তর্জাতিক বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে তা প্রায়ই প্রতিধ্বনিত হয় না।

বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় কাজ হলো—আত্মমর্যাদার কূটনীতির ভিত্তি নির্মাণ করা। প্রতিবেশীকে বদলানো যাবে না; কিন্তু নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো অবশ্যই সম্ভব। আর সেই পথেই নিহিত রয়েছে ভবিষ্যতের সম্মান, নিরাপত্তা এবং জাতীয় মর্যাদা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর