আসন্ন জাতীয় বাজেটকে সরকার একটি জনকল্যাণমুখী ও প্রবৃদ্ধিবান্ধব বাজেট হিসেবে উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। অতীতের তুলনায় এবার বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃষি উপকরণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধের কাঁচামাল এবং চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর কর ও শুল্ক কমানোর পদক্ষেপ জনগণের ওপর করের চাপ হ্রাসের একটি সুস্পষ্ট বার্তা বহন করছে।
বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন। এ লক্ষ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীকে কর্মবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে সহায়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলাও এ বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। চাল, গম, আলু, মসলাসহ প্রায় ৬০ ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমানোর উদ্যোগ বাজারে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করবে এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য হ্রাসে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে সার ও কীটনাশকের ওপর ভ্যাট ও কর প্রত্যাহার কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করতে ওষুধ শিল্পের ৬৮ ধরনের কাঁচামাল, ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদান, ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের রিং এবং চোখের লেন্সের ওপর কর ও শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠী অধিক সুবিধা পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণও এ বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ এবং উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সরকারি সহায়তা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে কর হ্রাস, দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর কর কমানো এবং ইলেকট্রিক যানবাহন ও ই-বাইক উৎপাদনে কর-রেয়াত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করমুক্ত রাখার উদ্যোগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে উৎসাহিত করবে। এসব পদক্ষেপ দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও বাজেট আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব ঋণনীতি এবং উৎপাদনমুখী খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আর্থিক ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। একদিকে কর ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন, ই-ট্যাক্স, ই-ইনভয়েসিং এবং জাতীয় পরিচয়পত্রকে কর শনাক্তকরণ নম্বর হিসেবে ব্যবহারের মতো সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানো হবে; অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির মাধ্যমে বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা চলবে। সামগ্রিকভাবে এ বাজেট কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, আয়বৈষম্য হ্রাস এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের একটি সমন্বিত রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এদিকে সীমান্তে পুশইন ও অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছে। আমরা আশা করি, পারস্পরিক সম্মান, আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে এ সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসবে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সীমান্ত নিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক। সবার আগে বাংলাদেশ।




