বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ঢাকা

ত্যাজ্যপুত্র করার আইনি বা ধর্মীয় বিধান আছে কি? 

খন্দকার মাজেদুল ইসলাম সম্রাট
প্রকাশিত: ১০ জুন ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম

শেয়ার করুন:

ত্যাজ্যপুত্র করার আইনী বা ধর্মীয় বিধান আছে কি? 

বর্তমান সমাজে বহুল প্রচলিত একটি ধারণা হলো—পিতামাতা চাইলে সন্তানকে ‘ত্যাজ্যপুত্র’ বা ‘ত্যাজ্যকন্যা’ ঘোষণা করে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে পারেন। 

তবে বাস্তবে ‘ত্যাজ্যপুত্র’ বা ‘ত্যাজ্যকন্যা’ ধারণাটি একটি সামাজিক মিথ বা আবেগঘন ঘোষণা ছাড়া আর কিছুই নয়, এর নূন্যতম কোনো আইনি বা ধর্মীয় ভিত্তি নেই।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে কোনো ব্যক্তিকে শুধুমাত্র পারিবারিক ঘোষণা বা পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি বা ৩০০ টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে হলফনামার মাধ্যমে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত বা ত্যাজ্য করার কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ, ইসলাম ধর্মের বিধান এবং আইন অনুযায়ী বৈধ উত্তরাধিকারীকে ‘ত্যাজ্য’ ঘোষণা করলে সে তার অধিকার হারাবে না। 

ত্যাজ্যপুত্র ধারণা ও বাস্তবতা:

সন্তানের আচরণ বা ব্যবহারে যদি কোনো পিতামাতা কষ্ট পান, সন্তান অবাধ্য হলে অথবা বাবা-মার সঙ্গে বিরোধে জড়ালে তখন মা–বাবা রাগের বশবর্তী হয়ে পুত্র কিংবা কন্যাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার বা ত্যাজ্য করার ঘোষণা দেন।  

সাধারণত এ ধরনের ঘোষণা মৌখিকভাবে বা পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি বা নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে ৩০০ টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে হলফনামার মাধ্যমে দিয়ে থাকেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ত্যাজ্য ঘোষণা করা হয় যে, যদি সন্তান সঠিক পথে ফিরে আসে, তবে ঘোষণাটি বাতিল হবে। তবে বাস্তবে সন্তানকে ত্যাজ্য করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। 


বিজ্ঞাপন


প্রচলিত আইনের বিধান:

উত্তরাধিকার, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং সম্পত্তির বণ্টন ইত্যাদি সাধারণত মুসলমান ও হিন্দুদের নিজ নিজ ধর্মীয় আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়ে থাকে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১, পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ এবং উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫- এই আইনগুলোর কোথাও ত্যাজ্য সন্তান করার কোনো বিধান নেই। 

মুসলিম সন্তান পরিবারের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার অর্জন করেন এবং এ অধিকার থেকে তাকে কোনোভাবেই বঞ্চিত করা যায় না। সন্তানেরা অবধারিতভাবেই উত্তরাধিকারী হিসেবে পিতামাতার রেখে যাওয়া সম্পত্তির অংশীদার হবেন। যতই ত্যাজ্য ঘোষণা দেওয়া হোক না কেন, আইনগত, ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয়- কোনোভাবেই সন্তানকে ত্যাজ্য করা সম্ভব নয়। ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় আইনের কোথাও সন্তানকে ত্যাজ্য করার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।

তবে মুসলিম আইনে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত বা ভুলবশত কাউকে হত্যা করে, কিংবা ধর্ম পরিবর্তন করে, তবে সে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
হিন্দু আইনে কিছু শর্তসাপেক্ষে সন্তানকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার বিধান রয়েছে।  

সন্তানকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার আইনি প্রক্রিয়া: 

পিতামাতা চাইলে অবাধ্য সন্তানকে তাদের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে পারেন। পিতামাতা দান বা হেবা, উইল বা বিক্রয়ের মাধ্যমে তাদের সম্পত্তি যে কারও কাছে হস্তান্তর করতে পারেন। তবে সেটি অবশ্যই ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের আওতায় নিবন্ধিত হতে হবে।

উইলের দ্বারা মোট সম্পত্তির এক—তৃতীয়াংশের বেশি সম্পত্তি  হস্তান্তর করা যায় না এবং পিতামাতার মৃত্যুর পর উইল কার্যকর হয়। কিন্তু সেটিও আইন ও শরিয়াহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে হতে হবে এবং প্রতারণামূলক বা অন্য উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার উদ্দেশে হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। তাই ‘ত্যাজ্য’ ঘোষণা দিয়ে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টাও শেষ পর্যন্ত আইনি জটিলতায় পড়তে পারে।

আইনের প্রয়োগ ও বিভ্রান্তি: 

বাংলাদেশে ‘ত্যাজ্যপুত্র’ বা ‘ত্যাজ্যকন্যা’ ধারণার মিথ ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, পিতামাতার মৃত্যুর পর অন্য উত্তরাধিকারীরা অনেকটা অধিকারবলে কথিত ত্যাজ্য সন্তানের সম্পত্তির অংশ দিতে সরাসরি অনীহা বা অস্বীকার করেন। 

এমনকি গ্রাম্য মাতব্বরগণ ধর্মীয় ও আইনগত বিষয় না জেনে গ্রামীণ সালিশে ত্যাজ্য করা সন্তানের ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করেন, যা মুসলিম আইনের পরিপন্থী। 

মূলত ‘ত্যাজ্যপুত্র’ বা ‘ত্যাজ্যকন্যা’ একটি ভ্রান্ত ধারণা, যা বাংলাদেশের কোনো আইনেই নেই। মুসলিম পারিবারিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই এমন বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে, যার ফলে সামাজিক জটিলতা ও বিরোধ তৈরি হয়। যদি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি দেওয়ানি আদালতে মামলা করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

সুতরাং, ‘ত্যাজ্যপুত্র’ বা ‘ত্যাজ্যকন্যা’ কোনো আইনি বা ধর্মীয় বাস্তবতা নয়, এটি কেবল একটি সামাজিক মিথ। সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ ধরনের ভুল ধারণা দূর করা জরুরি, যাতে মানুষ আবেগের পরিবর্তে আইন ও ধর্মের সঠিক জ্ঞান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

লেখক:খন্দকার মাজেদুল ইসলাম সম্রাট, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং সংবাদকর্মী।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর