প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা গড়ে ওঠে তখনই, যখন কোনো কর্মকর্তা তার পদমর্যাদার সীমারেখা অতিক্রম করে মানুষের পাশে দাঁড়ান। ক্ষমতা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা জনকল্যাণে ব্যবহৃত হয়; আর প্রশাসন তখনই মানবিক হয়ে ওঠে, যখন একজন কর্মকর্তা সাধারণ মানুষের কথা শোনেন, তাদের সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেন। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিনকে দেখে আমার বারবার এমনটাই মনে হয়েছে।
সিলেট কানাইঘাটের কৃতী সন্তান রুহুল আমিন বর্তমানে নবীগঞ্জবাসীর সেবায় নিয়োজিত। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাঁর সঙ্গে কয়েকবার দেখা করার সুযোগ হয়েছে। প্রতিবারই অনুভব করেছি, তিনি কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মকর্তা নন; তিনি একজন মনোযোগী শ্রোতা এবং মানবিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যেও তিনি মানুষের কথা ধৈর্য নিয়ে শোনেন, যথাযথ সম্মান দেন এবং সমস্যা সমাধানের সম্ভাব্য পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন।
বিজ্ঞাপন
প্রশাসনিক জীবনে দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানবিকতা এবং ন্যায়পরায়ণতা একজন কর্মকর্তাকে আলাদা মর্যাদা দেয়। রুহুল আমিনের মধ্যে আমি এই দুই গুণের সমন্বয় দেখেছি। সাধারণ সময়ে তিনি অত্যন্ত নম্র, ভদ্র ও সংযত ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু অন্যায়, অবিচার কিংবা সামাজিক অবক্ষয়ের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান দৃঢ় ও আপসহীন।
এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। একবার এক সন্তান নিজের মায়ের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছিল। ঘটনাটি আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অংশ। বিষয়টি তাঁর নজরে আসার পর যে দৃঢ়তা ও কঠোরতা তিনি প্রদর্শন করেছিলেন, তা আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। শান্ত-স্বভাবের মানুষ হিসেবে যাঁকে সবসময় দেখেছি, তাঁকে সেদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন অবস্থানে দেখেছিলাম। তখন উপলব্ধি করেছি, প্রশাসনের প্রকৃত শক্তি ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়; বরং ন্যায়ের পক্ষে নির্ভীক অবস্থান গ্রহণে। তাঁর সেই অবস্থান শুধু একটি ঘটনার সমাধানই করেনি, সমাজের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল—মায়ের প্রতি অবমাননা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক হলো, তিনি সমস্যাকে শুধু অফিসের ফাইল বা আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন না। কোথাও জনগণের দুর্ভোগের খবর পেলে বা কোনো জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তিনি প্রয়োজনে নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। বাস্তব পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই মানসিকতা তাঁকে অনেকের কাছেই একজন জনবান্ধব কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত করেছে।
তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর নবীগঞ্জ বাজারের দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। নিয়মিত তদারকি এবং প্রশাসনিক উদ্যোগের ফলে বাজার এলাকায় শৃঙ্খলা ফিরেছে। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে তাঁর কঠোর অবস্থান স্থানীয় তরুণ সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। শিক্ষাবান্ধব নানা উদ্যোগ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর আন্তরিক আগ্রহও স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং প্রশাসনিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি তিনি হবিগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সম্মাননা লাভ করেছেন। একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অর্জন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে এ ধরনের স্বীকৃতি সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের জন্যও গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে। কারণ, একজন কর্মকর্তার সাফল্যের সঙ্গে স্থানীয় উন্নয়ন ও জনসেবার সম্পর্ক নিবিড়ভাবে জড়িত।
সম্প্রতি ৭ নম্বর করগাঁও ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের শেরপুর এলাকার দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ সড়কের বিষয়টি তাঁর নজরে আনার সুযোগ হয়েছিল। তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁর ইতিবাচক সাড়া এলাকাবাসীর মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। স্থানীয় মানুষ এখন বিশ্বাস করেন, দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তির অবসান ঘটবে।
আমাদের সমাজে জনসেবাকে অনেক সময় কেবল দাফতরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু কিছু কর্মকর্তা তাঁদের কর্ম, আচরণ ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, প্রশাসন জনগণের কাছাকাছি থাকলেও কার্যকর এবং প্রয়োজনে কঠোর হতে পারে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জনাব রুহুল আমিন তেমনই একজন কর্মকর্তা, যিনি মানবিকতা, ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে জনসেবাকে অর্থবহ করে তোলার চেষ্টা করছেন।
তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও কর্মসাফল্য কামনা করি। জনগণের কল্যাণে তাঁর এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক এবং তাঁর নেতৃত্বে নবীগঞ্জ আরও উন্নত, সুন্দর ও জনবান্ধব হয়ে উঠুক—এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: সম্পাদক ও সমাজকর্মী




