গত রোজার ঈদের সময় দৌলতদিয়া ঘাটে মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছিলাম। সেখানে নিরাপদে চলাচল, জ্বালানি নেওয়ার সময় ও ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীদের বাধ্যতামূলকভাবে বাস থেকে নামানো, হেলপার দিয়ে বাস না চালানো, দীর্ঘ যাত্রায় চালকের বিশ্রাম নিশ্চিত করা এবং ঘাট ও ফেরি ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে গতকাল আবারো দৌলতদিয়ায় একটি বাস ফেরি থেকে নদীতে পড়ে যায়। সৌভাগ্যবশত যাত্রীদের আগে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ফলে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটেনি। এতে স্বস্তি পাওয়া যায়, কিন্তু আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই।
বিজ্ঞাপন
কারণ বাস্তবতা হলো, আরিচা ঘাটে এখনো নিয়মিতভাবে বাস থেকে যাত্রী নামানো হয় না—যার প্রত্যক্ষদর্শী আমি নিজে। প্রকৃতপক্ষে ঘাটের বর্তমান অবস্থা এমন যে পায়ে হেঁটে ফেরিতে ওঠা-নামা করাই কঠিন। ফলে যাত্রীরাও বাস থেকে নামতে আগ্রহী হন না। ঘাটের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যাত্রী চলাচলের অনুপযোগী পরিবেশ এবং ফেরিতে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যারিয়ারের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা
বিভিন্ন দেশে ফেরিতে যানবাহন ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়, যার কিছু আরিচা-দৌলতদিয়া নৌপথেও বিবেচনা করা যেতে পারে।
১. নরওয়ে ও সুইডেন: যাত্রী ও যানবাহনের জন্য পৃথক পথ
বিজ্ঞাপন
নরওয়ে ও সুইডেনের অধিকাংশ রো-রো (ROLL-ON/ROLL-OFF) ফেরিতে যাত্রীদের জন্য আলাদা বোর্ডিং ব্যবস্থা রয়েছে। যানবাহন ফেরিতে ওঠার পর যাত্রীদের নির্দিষ্ট যাত্রী ডেকে অবস্থান করতে বলা হয়। গাড়ির ডেকে অবস্থান সাধারণত নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ।
২. PASSENGER BOARDING BRIDGE বা যাত্রী সেতু
ইউরোপের অনেক ফেরি টার্মিনালে যাত্রীদের জন্য আলাদা আবৃত সেতু (BOARDING BRIDGE) রয়েছে, যা সরাসরি টার্মিনাল থেকে জাহাজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ফলে যাত্রীদের যানবাহনের সঙ্গে একই র্যাম্প ব্যবহার করতে হয় না।
(নিম্নে আমার প্রস্তাবিত বেইলি-ব্রিজ ধারণাটি মূলত এই মডেলের একটি সহজ, দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল সংস্করণ হতে পারে।)
৩. কানাডা ও উত্তর ইউরোপ: LINKSPAN প্রযুক্তি
কানাডা, নরওয়ে ও সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশে LINKSPAN নামে সমন্বয়যোগ্য র্যাম্প ব্যবহৃত হয়। জোয়ার-ভাটার কারণে পানির উচ্চতা পরিবর্তিত হলেও যানবাহন নিরাপদে ওঠানামা করতে পারে। আরিচা ঘাটের জন্যও এ ধরনের প্রযুক্তি উপযোগী হতে পারে।
৪. ভারী যানবাহনের জন্য বিশেষ নির্দেশনা
নরওয়েতে বাস ও ট্রাক কোথায় অবস্থান করবে তা ডেক ক্রুরা নির্ধারণ করেন। ভারসাম্য, নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা হয়।
৫. নিরাপত্তা ব্যারিয়ার ও WHEEL STOPPER
যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে ফেরির ডেকে যানবাহন স্থির রাখার জন্য WHEEL CHOCK, WHEEL STOPPER, LASHING POINT এবং শক্তিশালী স্টিল ব্যারিয়ার ব্যবহার করা হয়।
আরিচা-দৌলতদিয়ার জন্য বাস্তবসম্মত প্রস্তাব
বিশ্বের অভিজ্ঞতার আলোকে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে—
# আরিচা-দৌলতদিয়া ঘাটে যানবাহন ও যাত্রী চলাচল নিরাপদ করার লক্ষ্যে অন্তত ১০টি মডুলার বেইলি ব্রিজ নির্মাণ।
# যাত্রীদের জন্য পৃথক বোর্ডিং ও ডিসএমবার্কেশন পথ চালু করা।
# ফেরির দুই পাশে শক্তিশালী স্টিল ব্যারিয়ার এবং WHEEL STOPPER স্থাপন।
# বাস ও ট্রাকের জন্য নির্দিষ্ট পার্কিং মার্কিং এবং ক্রু নির্দেশনা বাধ্যতামূলক করা।
দুর্ঘটনা ঘটার পর তদন্ত নয়—দুর্ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।
# ফেরি ঘাট ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা, তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
# যানবাহন ওঠানামার সময় আধুনিক নিরাপত্তা প্রটোকল চালু করা।
# আরিচা-দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য ৬ মাসের জন্য নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া বিবেচনা করা যেতে পারে।
দৌলতদিয়া ও আরিচা ঘাটের প্রধান সমস্যা শুধু চালকের অসাবধানতা নয়; অবকাঠামোগত দুর্বলতা, শৃঙ্খলার অভাব এবং নিরাপত্তা সংস্কৃতির ঘাটতিও এর বড় কারণ। বিশ্বের উন্নত ফেরি ব্যবস্থাগুলো দেখলে বোঝা যায়, নিরাপদ ফেরি পরিচালনার মূল চাবিকাঠি হলো যাত্রী ও যানবাহনের চলাচল পৃথক করা, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং কঠোর অপারেশনাল শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
সবচেয়ে মূল্যবান হলো মানুষের জীবন। সেই জীবন রক্ষার জন্য কোনো প্রচেষ্টা অপূর্ণ রাখা যাবে না।
আর কোনো দুর্ঘটনা নয়।
আর কোনো স্বজনহারা কান্না নয়।
নিরাপদ যাত্রা হোক সবার অধিকার।




