ধর্ষণ ও নারী নিগ্রহ প্রতিরোধে উচ্চশিক্ষা ও নারী স্বাধীনতা নাকি শরিয়া আইন ও পর্দাপ্রথা—কোনটি তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর, এ প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্ষণ-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আসে।
উদাহরণস্বরূপ, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (UNODC)-এর তথ্য অনুযায়ী সুইডেনে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে বছরে প্রায় ৮৬টি ধর্ষণের ঘটনার রিপোর্ট হয়।
বিজ্ঞাপন
একইভাবে যুক্তরাজ্যে প্রায় ৩৯টি, নরওয়েতে প্রায় ২৮টি এবং বেলজিয়ামে প্রায় ২৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবে প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যায় বছরে প্রায় ১টি, কাতারে ১.৫টি, কুয়েতে ২.৫টি এবং ইরানে প্রায় ৫টি ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, সুইডেনের রিপোর্টকৃত ধর্ষণের হার সৌদি আরবের তুলনায় প্রায় ৭০ গুণ বেশি। একইভাবে যুক্তরাজ্যের হারও সৌদি আরবের তুলনায় কয়েক ডজন গুণ বেশি। অর্থাৎ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইউরোপের কয়েকটি উন্নত দেশে ধর্ষণের রিপোর্টকৃত হার মধ্যপ্রাচ্যের উল্লিখিত দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বাংলাদেশে সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী নথিভুক্ত ধর্ষণের হার সাধারণত প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যায় প্রায় ৩ থেকে ৫ জনের মধ্যে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ সরকারি রেকর্ডের হিসাবে এই হার ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম।
আরও পড়ুন: আরাফাতের নিম গাছ ও জিয়াউর রহমান
এই পরিসংখ্যান অন্তত এটুকু নির্দেশ করে যে কেবল উচ্চশিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতাই নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। অপরাধ প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক বন্ধন, শালীনতা, নৈতিক শিক্ষা এবং সমাজের সামগ্রিক সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষা। আইন মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু বিবেককে জাগ্রত করতে পারে না। একজন মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে তার প্রতিটি কাজের জন্য তাকে মহান স্রষ্টার কাছে জবাবদিহি করতে হবে, তখন তার মধ্যে আত্মসংযম, দায়িত্ববোধ এবং অন্যের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে ওঠে। ফলে অপরাধ দমনে শুধু আইনের ভয় নয়, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চেতনারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।
তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের সংজ্ঞা ভিন্ন। এছাড়া রিপোর্টিং পদ্ধতি, অভিযোগ করার সামাজিক পরিবেশ এবং অপরাধ নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় পার্থক্য রয়েছে।
তাই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের সময় এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষা, আইন, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং কার্যকর বিচারব্যবস্থার সমন্বিত প্রয়োগই সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।
(এমবিবিএস -ডিএমসি, এমফিল -সাইকিয়াট্রি)
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।
টিএই/এআরএম




