বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এক গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আলোচিত নাম। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আবির্ভাব—এই সবকিছুই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বহু লেখকের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। প্রয়াত দুই লেখক আবদুশ শাকুর ও মাহবুব তালুকদারের রচনায় জিয়াউর রহমানকে দেখা যায় একদিকে যুদ্ধকালীন সংকটময় বাস্তবতার মধ্যকার নেতা হিসেবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। প্রয়াত লেখক, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক আবদুশ শাকুর তাঁর ‘কাঁটাতে গোলাপও থাকে’ গ্রন্থে এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কথাসাহিত্যিক মাহবুব তালুকদার তাঁর ‘বঙ্গভবনে পাঁচ বছর’ গ্রন্থে শহীদ প্রেসিডেন্টকে যেভাবে তুলে ধরেছেন তা হুবহু তুলে ধরা হলো—
আবদুশ শাকুরের রচনায় জিয়াউর রহমান
বিজ্ঞাপন
প্রয়াত লেখক ও সাহিত্যিক আবদুশ শাকুরের ‘কাঁটাতে গোলাপও থাকে’ প্রবন্ধে মুক্তিযুদ্ধের এক অস্থির, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ও অনিশ্চিত বাস্তবতার ভেতর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকা চিত্রায়িত করেছেন। লেখক পাহাড়ি দুর্গম উপত্যকায় অবস্থানকালে কোনো দিকনির্দেশনা না পেয়ে হতাশা ও শূন্যতার মধ্য দিয়ে সময় পার করছিলেন। এমনই এক পরিস্থিতির বর্ণনা তুলে ধরেছেন তাঁর ‘কাঁটাতে গোলাপও থাকে’ গ্রন্থে। তিনি লেখেন—
ছাব্বিশের গোটা দিন গেল, পরের রাত গেল, পরের দিনটিও শেষ হয়ে গেল—রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম-ঢাকার কোনো দিকনির্দেশনা তো দূরস্থান, কোনো রকম খবরই পেলাম না দুর্গম পর্বতের নির্জন উপত্যকার অভাগা বাসিন্দা আমি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে এই মাত্রার সমন্বয়হীনতার যে-কোনো ব্যাখ্যাই যে-কেউ দিন না কেন, তা আমার কাছে গ্রাহ্য হবে না আদৌ। পরে জেনেছি যে ঢাকায় হানাদারবাহিনীর পয়লা হানার পরপরই কেতাবী মুক্তিযোদ্ধাগণ সকলে ঘরে-ঘরের বদলে পরের-ঘরে দুর্গ গড়েছেন।
সে যাক। পশ্চিমের সূর্য পাহাড়ের নিচে পড়ে গেলেই বান্দরবান উপত্যকায় সন্ধ্যা নামে মলিনবিধুর। মানুষের মনেও নেমে আসে প্রথমে শূন্যতা, পরে নানারকম ঊনতা—অতঃপর মানবসভ্যতারই ব্যর্থতাবোধ পর্যন্ত। চতুর্দিকের গাছগাছালির আকুলিবিকুলির মধ্যে থাকে ক্লান্তির মুদ্রা, পাখপাখালির কলকাকলির মধ্যেও থাকে কর্মচঞ্চল দিনাবসানে বিষাদের বারতা। তেমনি বারতাই নিয়ে এলেন আওয়ামী লীগের জনৈক শ্রদ্ধেয় নেতা বন্দরনগর থেকে। এসডিওর বাংলার বারান্দায় চায়ের টেবিলে একা বসে আছি, রেডিও খুলে—কোনো দিক থেকে কোনো রকম দিকনির্দেশের আশায়। দূর থেকে দেখছিলাম জনৈক শহুরে আসছেন—পাহাড় থেকে নেমে-আসা রাস্তাটি ধরে। তার গন্তব্য যে আমার বাংলো তা জানলাম। তিনি আমার গেটে ঢোকার পর এবং তিনি যে চট্টগ্রামের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ডাক্তার জাফর, বিষণ্ন সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকারে সেটা জানা গেল তিনি বারান্দায় উঠে আসার পর।

বিজ্ঞাপন
আমি ‘কী খবর জাফর ভাই’ বলে ওঠার আগেই তিনি ‘খবর কী শাকুর ভাই’ বলে ফেললেন। বললাম, ‘খবর তো আপনি আনবেন দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর থেকে। জনবিচ্ছিন্ন জঙ্গল থেকে আমি কী খবর দেব আপনাকে?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘আমার ডিসি নিরেট আমলা, এসডিও-নর্থ সেকেলে গেরস্ত, এসডিও-সাউথ অবাঙালি। তাই আমি আমাদের আন্দোলনের সক্রিয় সঙ্গী হিসেবে আপনার কাছে চলে এলাম দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে। ভাবলাম, মহকুমার শাসক হিসাবে আপনার কাছ থেকে ভেতরের খবর তো বটেই, পথনির্দেশও কিছু পাওয়া যাবে। উপরি পাওনা হবে আমার আপাতত পালিয়ে থাকা—যেটা প্রাণে বাঁচার জন্য প্রাথমিক কর্তব্য।’
এ ধারার অসার বাগবিস্তার আর না-করে, কেন জানি হঠাৎ দুজনেই চুপ করে গেলাম একসঙ্গে। হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে টিকোজি থেকে পানি ঢেলে চা বানানোর নামে এটা সেটা নাড়াচাড়াই করতে থাকলাম আনমনে। এমনি সময় টেবিলের ‘এগারো ব্যান্ড স্যানিও রেডিও’তে আচমকা শ্রুত হল সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা: “আমি মেজর জিয়া বলছি।” লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে দুজনে প্রাণভরে কোলাকুলি করলাম, যেন পুনরুজ্জীবিত দুই মৃত সৈনিক। অনুপ্রাণিত করমর্দন করে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন ডাক্তার জাফর।
অতঃপর ঘটনার কেবল ঘনঘটা, প্রবাহও দারুণ খরস্রোতা। কালুরঘাটে গিয়ে দেখলাম, কর্ণফুলীর বাম পাশে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের মজবুত মোর্চা। সেখানে যুদ্ধরত মেজর শওকত, ক্যাপ্টেন হারুন, ক্যাপ্টেন ওলি, লেফটেন্যান্ট শামসের মবিন ও অন্যান্য। মুক্তাঞ্চল ঘোষিত দক্ষিণ চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজার মহকুমাত্রয় সমন্বয়ে নবগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক নিয়োজিত হলাম আমি (দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার মহকুমাদ্বয়ের এসডিও দুজন ছিলেন উর্দুভাষী)। প্রথমেই রেডিও-পাকিস্তানের কালুরঘাটে স্থাপিত ট্রান্সমিটারটা নিয়ে এলাম আমার বান্দরবানের বাংলায় (যেটা পরে যথাসময়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ভারতসীমান্তবর্তী রামগড় মহকুমাসদরে)। যুদ্ধের যাবতীয় সিভিল সাপ্লাইয়ের ভার ছিল আমার ওপর। প্রশাসন চালাতাম সাতকানিয়া ক্যাম্প অফিস থেকে সাইক্লোস্টাইল মেশিনে বাংলা ভাষায় আদেশ জারি করে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জেলা শাসকগিরি আমার শেষ হয়ে যায় ১১ এপ্রিল, যেদিন পাকিস্তান নেভির বাবর গানশিপের প্রচণ্ড আক্রমণে আমাদের কালুরঘাট মোর্চার পতন ঘটে। শুনেছি, গোলার আঘাতে শামসের মবিন গুরুতর আহত হয়ে হানাদারবাহিনীর হাতে বন্দী হন। হারুনের পেট ছিঁড়ে ছড়িয়ে পড়ে। জরুরিভিত্তিক চিকিৎসার জন্য, পঁচিশের রাতের কাপ্তাইয়ের সম্মুখসমরনায়ক এই অসমসাহসী মুক্তিযোদ্ধাকে সাতকানিয়ায় নিয়ে গিয়ে ডাক্তার খোঁজাখুঁজিসহ প্রাথমিক সঙ্কটমোচনের যাবতীয় ব্যবস্থাপনায় যে রাতটি আমার কাবার হয়েছে—সে রাতটিতেই আমার শহর বান্দরবানে মাঝিদের ঘুম ভাঙিয়ে নৌকাগুলি জোড়া লাগিয়ে কয়েকটা জুড়িন্দা বানিয়ে গাড়িসহ পার হয়ে রামগড় চলে গিয়েছে কালুরঘাটের ছত্রভঙ্গ গোটা মোর্চাসহ অসামরিক মুক্তিযোদ্ধাগণও।
ওটাই যদি “অর্ডার অফ দ্য ডে”, সেটা আমাকে জানানো হলো না কেন—মনের পিঠে লেগে থাকা এ প্রশ্নটি সুযোগ বুঝে করেছিলাম প্রেসিডেন্ট জিয়াকে পাঁচ বছর পরে জেলাশাসক থাকাকালে, পটুয়াখালীর সার্কিট হাউসে (গভীর রাতে ভিআইপি রুমে একান্তে বসে ডিসির কাছে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাসমূহের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সরাসরি জানতে চাইতেন তিনি)। প্রেসিডেন্ট উত্তরটি দিয়েছিলেন হালকা কথায়, হাসিমুখে—যুদ্ধরত মোর্চার পতন ঘটলে পতিত পক্ষ অর্ডারের অপেক্ষা না করে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যায়, এক কথায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। (কাঁটাতে গোলাপও থাকে। পৃষ্ঠা: ১৭৫–১৭৭)
মাহবুব তালুকদারের রচনায় জিয়াউর রহমান
প্রয়াত লেখক ও কথাসাহিত্যিক এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের লেখায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে—বঙ্গভবনের রাষ্ট্রীয় পরিবেশে। এখানে তিনি প্রথমে লেখকের স্ত্রী রুবীর সঙ্গে এক ভদ্রমহিলার আলাপে প্রসঙ্গক্রমে পরিচিত হন। লেখায়—
বঙ্গভবনে এক অনুষ্ঠানে আমার স্ত্রী রুবীকে এক মহিলার সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলাপ করতে দেখি। এ ধরনের অনুষ্ঠানে একজনের সঙ্গে আলাপ না করে অনেকজনের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আলাপ করা সমীচীন। কিন্তু কথাটা তখন রুবীকে বলার অবকাশ পাইনি। এক সময় সুযোগ পেয়ে রুবীকে বললাম, একজনের সঙ্গে এতক্ষণ এমন কী কথা?
কথার কি শেষ আছে? রুবী বলল, ভদ্রমহিলা খুব ভালো।
কে এই মহিলা?
উনার নাম খালেদা। তাঁর স্বামী আর্মিতে আছেন। তুমি তাঁকে চিনতে পার।
কি নাম তাঁর স্বামীর?
জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়া নামে রেডিওতে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
বললাম, চিনি। একবার তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় হয়েছে। তবে তিনি একটু রিজার্ভ প্রকৃতির। বেশি কথা বলেন না।

এর আগে কর্নেল জিয়াউর রহমানকে কখনও বঙ্গভবনে বা কখনও বঙ্গভবনের বাইরে দেখেছি। তাঁর সঙ্গে তেমন কথা হয়নি। পরে একদিন তাঁর সঙ্গে বঙ্গভবনে আলাপ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। দুপুরে সামরিক সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফিরোজ সালাহউদ্দীনের অফিসে বসে আলোচনা করছি। এমন সময় জিয়াউর রহমান এলেন। ঘরে ঢুকে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সামরিক সচিবকে স্যালুট করলেন। বললেন, আসতে পারি স্যার?
আস। জিয়া। বস। সামরিক সচিব বললেন।
আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। কর্নেল জিয়া জানালেন।
হ। জানি। তবে একজন মন্ত্রী হঠাৎ করে রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। একটু বসতে হবে।
কর্নেল সালাহউদ্দীন কর্নেল জিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি বললাম, তাঁর সঙ্গে আমার আগেই পরিচয় হয়েছে।
চা খেতে খেতে কিছুক্ষণ কথা হলো। রাষ্ট্রপ্রধানের অফিসের সংকেত বাতি নিভছে না। অর্থাৎ মন্ত্রী মহোদয় বেশি সময় নিচ্ছেন। আমি কথা প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের প্রশংসা করলাম। তাঁর মুখে বুঝলাম কথাগুলো তিনি পছন্দ করেছেন। কিন্তু কোনো রকম উষ্ণতা প্রকাশ করলেন না।
কিছুক্ষণ আলাপচারিতার পরে আমি আবার বললাম, আপনাকে একটা কথা বলতে চাই, যদি কিছু মনে না করেন।
বলুন।
আসলে কথাটা মনের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করেছে, এজন্য না বলে থাকতে পারছি না। বললাম, দেশে গণতান্ত্রিক সরকার না থাকলে অথবা আপনি আর্মি অফিসার না হলে, আমি বলতাম যে আপনি বাংলাদেশের প্রধান ব্যক্তি হবেন। কর্নেল জিয়া মুখ ফিরিয়ে তাকালেন এবং চশমার ফাঁকে দৃষ্টি মেলে রইলেন। কোনো কথা বললেন না।
ফিরোজ সালাহউদ্দীন বললেন, এই কথা কীভাবে বলছ?
উনাকে দেখে আমার এমনটা মনে হয়েছে। মনের মধ্যে কথাটা ধরে রাখতে পারলাম না।
ইতোমধ্যে এডিসি ক্যাপ্টেন এনাম ঘরে ঢুকে কর্নেল জিয়াকে জানাল, রাষ্ট্রপ্রধান তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি উঠে যেতেই কর্নেল ফিরোজ সালাহউদ্দীন প্রায় ক্ষেপে উঠলেন আমার ওপর। বললেন, এরকম অ্যাম্বারাসিং কথাবার্তা বলা ঠিক হয়নি।
বললাম, কথাটা শুনে উনি তো কোনো রকম রিঅ্যাক্ট করলেন না।
সামরিক সচিব বললেন, জিয়ার কথা বলছি না। বঙ্গবন্ধুর কানে গেলে কী অবস্থা হবে, ভাবো। বঙ্গভবনের দেয়ালেরও কান আছে। কে কখন রিপোর্ট করে দেবে, তার ঠিক নেই। বঙ্গভবনের অফিসার হয়ে লুজ টক করা তোমার উচিত না।
কথাটার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল না। আমার ইনটুইশন থেকে বলছি—
আর কখনো এরকম বলবে না। সামরিক সচিব ঠান্ডা হলেন।
কয়েক বছরের মধ্যে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।
ব্রিগেডিয়ার ফিরোজ সালাহউদ্দীন তাঁর সামরিক সচিব। (বঙ্গভবনে পাঁচ বছর। পৃ: ৩১–৩২)
এআর



