রোববার, ২৪ মে, ২০২৬, ঢাকা

একটি পোকা হয়ে জেগে ওঠা

কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ কীভাবে আজকের কর্পোরেট জীবনকে ফুটিয়ে তোলে

মঞ্জুরুল হক ভূঁইয়া
প্রকাশিত: ২৪ মে ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম

শেয়ার করুন:

কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ কীভাবে আজকের কর্পোরেট জীবনকে ফুটিয়ে তোলে

ভাবুন তো, আগামীকাল সকালে ঘুম থেকে জেগে আপনি দেখলেন যে আপনি একটি বিশাল, কুৎসিত পোকায় রূপান্তরিত হয়েছেন! স্বাভাবিকভাবেই আপনি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠবেন, তাই না? কিন্তু ফ্রাঞ্জ কাফকার ১৯১৫ সালের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য মেটামরফোসিস’-এর প্রধান চরিত্র গ্রেগর সামসা তার এই নতুন খোলস বা পোকা হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে বিন্দুমাত্র আতঙ্কিত হয় না। তার মাথায় প্রথম যে হতাশাজনক চিন্তাটি আসে তা হলো— ‘হায় ঈশ্বর! আমি এখন ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছাব কীভাবে?’

আজকের দিনে এই পরিস্থিতিটি আমাদের কাছে ভীষণ চেনা এবং বাস্তব মনে হয়। আমরা কতবার তীব্র জ্বর নিয়েও শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস মিস না করার জন্য ক্যাম্পাসে ছুটে যাই, কিংবা নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট বা প্রজেক্টের ডেডলাইন মেলানোর জন্য রাত জাগি? কাফকা এক শতাব্দী আগে এই গল্পটি লিখেছিলেন, কিন্তু তিনি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন কীভাবে সমাজ মানুষের ভালো থাকার চেয়ে তার উৎপাদনশীলতা বা ‘প্রোডাক্টিভিটিকে’ বেশি মূল্য দেয়। যারা আজকের দিনে অবিরত নিজেকে প্রমাণ করার ইঁদুরদৌড়ে সামিল হয়েছেন—সেটা মিডটার্মের পাশাপাশি বিনা বেতনে ইন্টার্নশিপ করা কোনো শিক্ষার্থী হোক কিংবা ক্যারিয়ার গড়তে মরিয়া কোনো সদ্য স্নাতক—তাদের সবার কাছেই কাফকার এই পরাবাস্তব বইটি কল্পকাহিনীর চেয়ে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বেশি ধরা দেয়।


বিজ্ঞাপন


গল্পের গ্রেগর সামসা মূলত একজন সেলসম্যান, যে তার বাবা-মায়ের বিশাল ঋণ শোধ করার জন্য দিনরাত এক করে একটি বিরক্তিকর চাকরি করে যাচ্ছে। যখন সে একটি পোকাতে রূপান্তরিত হয়, তখনও তার মস্তিষ্ক কর্পোরেট উদ্বেগে বন্দি হয়ে থাকে। ট্রেনের শিডিউল মিস হওয়া কিংবা বসের বকা খাওয়ার ভয়ে সে কুঁকড়ে যায়। এটি একটি মর্মান্তিক অথচ হাস্যকর অতিশয়োক্তি, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আজকের দিনে একটা মাত্র সিক লিভ (Sick Leave) নেওয়াকে আমরা ক্যারিয়ারের জন্য কতটা আত্মঘাতী মনে করি।

তবে ‘মেটামরফোসিস’ উপন্যাসের আসল দুঃস্বপ্ন কিন্তু গ্রেগরের পোকা হয়ে যাওয়াটা নয়; বরং তার প্রতি তার পরিবারের আচরণ। এই রূপান্তরের আগে গ্রেগর ছিল তাদের চোখের মণি, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, যে তাদের জন্য নিজের পুরো যৌবন বিসর্জন দিচ্ছিল। কিন্তু যে মুহূর্তে সে তার অর্থনৈতিক উপযোগিতা হারাল, মুহূর্তের মধ্যেই সে পরম স্নেহের সন্তান থেকে একটি বোঝায় পরিণত হলো। তার পরিবার তার প্রতি বিরক্ত হলো, তাকে একটি ঘরে বন্দি করে রাখল এবং তার অস্তিত্বকে একটি বড় ঝামেলা হিসেবে গণ্য করতে শুরু করল। এই পরিস্থিতি আমাদের একটি অন্ধকার প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: আজকের সমাজব্যবস্থায় কি আমাদের মূল্য কেবল আমাদের উপার্জিত টাকার অংক কিংবা পরীক্ষার জিপিএ-র ওপরই নির্ভর করে?

আপনি খুব সহজেই গ্রেগরের এই পোকা হয়ে যাওয়াকে তীব্র মানসিক অবসাদ (Burnout), দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা গভীর বিষণ্নতার রূপক হিসেবে দেখতে পারেন। যখন আপনি নিজেকে পিষে ফেলে দিনরাত কাজ করেন, তখন আপনিও একসময় গ্রেগরের মতোই নিজেকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন, নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণহীন এবং অন্যের ওপর বোঝা হয়ে থাকার এক নিভৃত ও ভারী অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করবেন।

তবে গ্রেগরের সঙ্গে আমাদের একটি মস্ত বড় পার্থক্য আছে। গ্রেগর তার ঘরে বন্দি হয়ে পড়েছিল, কিন্তু আমরা নই। সেই চরম দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার আগেই আমাদের এই চক্র ভাঙার উপায় রয়েছে। শুনতে হয়তো সস্তা শোনাতে পারে, কিন্তু বন্ধুদের একটি ভালো বৃত্ত তৈরি করা, কাজের একটা নির্দিষ্ট সীমা বা বাউন্ডারি নির্ধারণ করা এবং কখন ল্যাপটপটি বন্ধ করে উঠে যেতে হবে তা জানা আমাদের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলিং সেন্টারে যাওয়া কিংবা কোনো মেন্টরের কাছে মন হালকা করা কোনো দুর্বলতা নয়; এটি বেঁচে থাকার সাধারণ কৌশল।


বিজ্ঞাপন


আমরা এমন এক ক্লান্তিকর যুগে বাস করছি যেখানে আমাদের শখগুলোকে জোর করে উপার্জনের মাধ্যমে পরিণত করতে বলা হয় এবং আমাদের লিঙ্কডইন (LinkedIn) প্রোফাইলগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয় যেন ওটাই আমাদের আসল ব্যক্তিত্ব। ‘মেটামরফোসিস’ আমাদের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে—আমরা কি নিজেদের অজান্তেই কোনো যন্ত্রের স্রেফ একটি কগ বা নাট-বল্টু হয়ে যাচ্ছি না তো? এর একমাত্র প্রতিষেধক হলো আপনার জীবনবৃত্তান্ত বা রেজুমের বাইরে নিজের একটি অর্থ খুঁজে নেওয়া। প্রয়োজনে এমন কোনো খেলা খেলুন যাতে আপনি একদমই পারদর্শী নন। এমন কোনো ছবি আঁকুন যা কেউ কিনবে না। স্রেফ ভালো লাগে বলে কোথাও ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করুন। পড়াশোনা আর কাজের বাইরে এই ছোট ছোট ভালো লাগাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা দিনশেষে মানুষ, কোনো রোবট বা আউটপুট তৈরির মেশিন নই।

কাফকা একজন জিনিয়াস ছিলেন কারণ তিনি জানতেন মূল ট্র্যাজেডি গ্রেগরের পোকা হয়ে যাওয়াটা ছিল না। আসল ট্র্যাজেডি ছিল—সে একটা পোকা হয়ে যাওয়ার পরেও নিজের অফিস আর চাকরি নিয়ে চিন্তিত ছিল! আপনি যদি আপনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন বা ক্যারিয়ারের শুরুতে দাঁড়িয়ে থাকেন, তবে এই শতবর্ষী গল্পটিকে নিজের জন্য একটি স্মারক হিসেবে মনে রাখুন: এমন একটি জীবন এবং নিজস্ব আত্মমর্যাদা গড়ে তুলুন, যার সঙ্গে আপনার কাজের প্রোডাক্টিভিটির কোনো সম্পর্ক থাকবে না ।

লেখক: ইউএস-বাংলা অ্যাসেটস লিমিটেডের একজন এক্সিকিউটিভ এবং সার্টিফাইড সাপ্লাই চেইন অ্যানালিস্ট। বর্তমানে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করছেন। যোগাযোগ: [email protected])

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর