মাওয়া দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পেছনের গল্প আজও সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অজানাই রয়ে গেছে। আজ প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন সেতুটি অতিক্রম করছে, কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন—কীভাবে রাজনৈতিক চাপ, জনমত ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত সেতুর অবস্থান নির্ধারিত হয়েছিল।
ঘটনাটি ২০০৪ সালের মার্চ মাসের শুরুর দিকের। তখন আমি প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব-১ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। একদিন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আমাকে জরুরি ভিত্তিতে ফোন করেন। তিনি জানান, পদ্মা সেতু প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের সারসংক্ষেপ ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় মাওয়াকে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসেবে সুপারিশ করা হলেও, যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা সেতুর স্থান হিসেবে আরিচাকে নির্বাচন করেছেন।
বিজ্ঞাপন
জাইকার সুপারিশের পেছনের যুক্তি ছিল সরল ও বাস্তবসম্মত। মাওয়া রুটে দূরত্ব কম ছিল, নির্মাণ ব্যয়ও কম পড়ত, এবং এটি বৃহত্তর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে অধিকতর সংযোগ স্থাপন করত। কিন্তু অভিযোগ ছিল, ব্যক্তিগত বিবেচনাই সিদ্ধান্তটিকে প্রভাবিত করেছে। কারণ, মন্ত্রীর স্ত্রী সিগমা হুদার পারিবারিক শিকড় ছিল আরিচা অঞ্চলে। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং গভীরভাবে নাড়া দেয়।
পরবর্তীতে আমি খোঁজখবর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফাইলটি খুঁজে পাই। নথিগুলো ভালোভাবে পর্যালোচনা করার পর ফাইলটি নিজের ড্রয়ারে সংরক্ষণ করি এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি। তাদের মধ্যে ছিলেন বরিশালের মজিবুর রহমান সারোয়ার, মুন্সীগঞ্জের সাবেক মন্ত্রী আবদুল হাই, ফরিদপুর বিএনপির সভাপতি শাহজাদা মিয়া, শিবচরের নেতা খলিলুর রহমান ঠান্ডু চৌধুরী, শরীয়তপুর বিএনপির সভাপতি টিএম গিয়াসউদ্দিন, শফিকুর রহমান কিরণসহ আরো অনেকে।
আমি তাদের বুঝিয়ে বলি, যদি এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে একটি বৃহৎ গণআন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই। ‘পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ’এর ব্যানারে কয়েক লাখ মানুষ নিয়ে কয়েকদিন ধরে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক অবরোধ করতে হবে, যাতে জনমতের শক্তি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
আন্দোলন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায়। সাবেক মন্ত্রী টিএম গিয়াসউদ্দিনকে সভাপতি এবং আমার সাবেক সহকর্মী মজিবুর মাদবরকে সদস্যসচিব করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ে। দিনরাত মিছিল, সমাবেশ ও বিক্ষোভ চলতে থাকে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পুরো অঞ্চলে, যার চূড়ান্ত রূপ নেয় শিবচরের চরজানাজাতে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসমাবেশে।
বিজ্ঞাপন
বরিশাল, বরগুনা, ফরিদপুর ও খুলনাসহ ২১ জেলার লাখ লাখ মানুষ সেখানে অংশ নেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ ও সামাজিক শ্রেণির মানুষ এই আন্দোলনে একত্রিত হন। এমনকি বিরোধী দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের নেতারাও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সংসদ সদস্য আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীও সেখানে বক্তব্য দেন। তার উপস্থিতির কারণে আওয়ামী লীগের নেতা আবদুর রাজ্জাক পূর্ব প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হননি, যদিও তিনি প্রতিনিধিদের পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বরিশালেও আরেকটি বড় সমাবেশ হয়। দাবিটি ছিল এক ও অভিন্ন—পদ্মা সেতু মাওয়া দিয়েই নির্মাণ করতে হবে।
কয়েকদিনের জন্য দক্ষিণবঙ্গ কার্যত ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সড়ক অবরুদ্ধ ছিল এবং বিক্ষোভ অব্যাহত চলছিল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল এবং নিয়মিতভাবে সরকারকে অবহিত করছিল। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠলে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যোগাযোগমন্ত্রী নাজমুল হুদাকে তলব করেন এবং জানতে চান—কীভাবে বিষয়টি এত দূর গড়াল।
অবশেষে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী জনদাবি মেনে নেন। অনুমোদনের সারসংক্ষেপ আর মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়নি। বরং ২০০৪ সালের ১০ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া নিজ হাতে “আরিচা’ শব্দটি কেটে ‘মাওয়া পয়েন্ট’ লিখে দেন এবং সেখানেই পদ্মা সেতু নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেন।
পরবর্তীতে প্রকল্পের সব নথিপত্র সেই অনুযায়ী সংশোধন করা হয়। জাইকা এরপর ড্রইং, ডিজাইন এবং বিস্তারিত পরিকল্পনার কাজ সম্পন্ন করে। এ সময় প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা (LAP), পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনা (RAP) এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (EMP) সম্পন্ন হয়। সে সময় পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় রেললাইনসহ দ্বিতল সেতুর মৌলিক নকশাও প্রস্তুত করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে সংসদে ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত আইন পাস হয় এবং সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সংসদেও প্রকল্পটির অগ্রগতি নিয়ে বক্তব্য দেন এবং পরে নিজে মাওয়া ও শিবচরে গিয়ে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
তবে এই সিদ্ধান্ত বিরোধিতাহীন ছিল না। ঘোষণার পর রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জের মানুষ আরিচা দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী রাজবাড়ীতে গিয়ে এক জনসভায় আশ্বাস দেন যে, ভবিষ্যতে আরিচা দিয়ে দ্বিতীয় একটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে।
পেছনে ফিরে তাকালে সেতুর অবস্থান নির্ধারণকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও উন্নয়ন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমি সে সময় যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলাম, তা হয়তো পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, একটি অবহেলিত অঞ্চলের ওপর অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। জনগণের দাবির ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে কিছু কৌশল অবলম্বন করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। আমি কাজটি করেছি সেই অঞ্চলের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে, যেখানে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কাজটি সঠিক ছিল কি না, তার বিচার হয়তো ইতিহাস একদিন করবে।
তবে একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পরিকল্পিত প্রকল্পটি পরবর্তী সরকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় সম্পন্ন করেছে, যার সঙ্গে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগও যুক্ত হয়েছে। সেতু নিয়ে বহু বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রচারণা হয়েছে, কিন্তু কীভাবে এটি মাওয়ায় এলো—সেই ইতিহাসটিও স্মরণে রাখা প্রয়োজন।
পদ্মা সেতু কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প ছিল না; এটি ছিল জনদাবি, গণসংগঠন এবং আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। ২০০৪ সালের সেই আন্দোলন না হলে মাওয়া-শরীয়তপুরে পদ্মাসেতু নির্মাণ কল্পনা করাও কঠিন হতো। তাই শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ, বরিশাল, খুলনা এবং সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এই ঐতিহাসিক অর্জনের অংশীদার।
আজ পদ্মা সেতু শুধু ইস্পাত ও কংক্রিটের একটি স্থাপনা নয়; এটি সেই প্রতীক, যা প্রমাণ করে—সংগঠিত জনশক্তি একটি অঞ্চলের উন্নয়নের গতিপথ বদলে দিতে পারে।




