বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের যে ধারা থাকার কথা তা অনুপস্থিত। টানা তিন বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে। সরকারি খাতে বিনিয়োগ কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা লক্ষনীয়।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য থেকে দেখা যায়, বর্তমানে জিডিপি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ রেশিও দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৩ শতাংশ। গত ১০ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চলতি মূল্যে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। এ সময় সার্বিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা।
বিজ্ঞাপন
এর মধ্যে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ছিলো ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও গতিশীল থাকা চাই, যা উৎপাদনশীল খাত ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। বিনিয়োগ প্রবাহ কমে যাওয়ায় অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পথ রুদ্ধ হয়ে আছে।
এদিকে সংকটে আছে দেশের আর্থিক খাত। কয়েকটি ব্যাংক চালু রাখতে সরকারকে তারল্যসহায়তা দিতে হচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে। ফলে এখন সরকার চাইলেও অর্থনীতিকে চাঙা করতে অর্থের খরচ বাড়াতে পারছে না।
প্রবাসী আয় বাড়ায় বৈদেশিক খাতের চাপ কিছুটা কমলেও রফতানি আরও দুর্বল হয়েছে। এর মধ্যে আবার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অর্থনীতির আরও ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, রফতানি দুর্বল হতে পারে, প্রবাসী আয় কমতে পারে, আর তাতে চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়বে। তাই বাংলাদেশ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন অপরিসীম। কারণ বিনিয়োগের সাথে জড়িত রয়েছে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি: নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমেই কেবল নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কীভাবে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়।
বিজ্ঞাপন
উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি: বিনিয়োগ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ায়, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন করে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট উৎপাদনে বড় বাধা। গ্যাস–সংযোগের কারণে কারখানা চালু করতে না পারলে উৎপাদন বিঘ্নিত হবে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন: সরকারি ও বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ ও বন্দর খাতের উন্নতি হয়, যা ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করে।বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সরাসরি উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর সরকারি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রধানত অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়। কোনো দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিতমাত্রায় উন্নীতকরণ এবং বেকার সমস্যা সমাধান ও দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
বৈদেশিক মুদ্রার মজুত: প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) দেশে ডলারের প্রবাহ বাড়ায়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে এবং টাকার মান স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বিকাশ: বিনিয়োগের মাধ্যমে সিএমএসএমই খাতের প্রসার ঘটে, যা দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চাবিকাঠি।
দেশে বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগ না হওয়ার জন্য নানা কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবার আগে উল্লেখ করতে হয় দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা। ব্যাংক খাতকে বলা হয় ‘অর্থনীতির লাইফ লাইন। দেশে মোট ৬১টি ব্যাংক ব্যবসায়রত রয়েছে; কিন্তু তাদের অধিকাংশই তারল্য সংকটসহ নানা সমস্যায় ভুগছে। এছাড়া বিগত স্বৈরাচারী সরকারের ব্যাংক খাত থেকে অর্থ পাচার, নামে বেনামে ঋণ বিতরণ, রাষ্ট্রীয় মদদে অর্থ লোপাট এসব কারণে তারল্য সংকট ফলে ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের চাহিদামতো ঋণ দিতে পারছে না। ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতার কারণে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মোতাবেক, ২০০৯ সালে ব্যাংকিং সেক্টরে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর কোয়ার্টারে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ব্যাংকগুলো কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমাতে পারছে না।
বিনিয়োগের পরিবেশ: বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নানারকম সমস্যা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে ১৯০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৬তম। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় নানা আইনি জটিলতার কারণে নিজ দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে পারে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশ। এ দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে। এখানে তুলনামূলক কম মজুরিতে পর্যাপ্তসংখ্যক শ্রমিক পাওয়া যায়। এ পরিবেশে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে পণ্য উৎপাদন করলে তা বিশ্বের নানা দেশের বাজারে মুক্তভাবে রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম পরিবেশে হলো দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীল অবস্থা। ব্যাংকের প্রয়োজনীয় তারল্য না থাকলে, খেলাপি ঋণের আদায় অগ্রগতি ভালো না হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ থাকে না। তাছাড়া রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, চাঁদাবাজি এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগ পরিবেশকে বিঘ্নিত করে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সবস্যা সমূহ দূর করে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন
রাজস্ব আদায়ের গতি আনতে হলে টেকসই বিনিয়োগ করতে হবে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। আগের পুরো অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ হবে স্থানীয় উৎস থেকে সম্পদ আহরণ এবং বিদেশি সূত্র থেকে ঋণ গ্রহণ। বাংলাদেশে গত দশ বছরের বাজেটে এডিপি বাস্তবায়নের হার লক্ষ্য করলে দেখা যায় তা গড়ে -৭৮%। গড়ে বাজেট গ্রোথ (২০১৬ থেকে ২০২৫ এ) ৮.৮%। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের হার যদি জিডিপির ২৮-২৯ শতাংশে উন্নীত করা না যায়, তাহলে অর্থনীতিতে গতিফেরানো সম্ভব না ।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ব্যাংকের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা এবং বিশ্বাস বাড়াতে হবে। বিনিয়োগের গতি ফেরাতে হলে শেয়ার বাজারেও বিনিয়োগ করতে হবে।উন্নত দেশগুলোতে উদ্যোক্তারা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখনো বিকশিত হয়ে ওঠেনি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বেকারত্ব দূরীকরণে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
আমাদের দেশের সস্তা মজুরি ব্যবহার করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনেক লাভবান হচ্ছেন। বিদেশি উদ্যোগক্তা ও বিনিয়োগকারীরা জীবনের নিরাপত্তা ও পরিবেশ না পেলে বিনিয়োগে আগ্রহী হয় না। বিনিয়োগ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সরাসরি অথবা যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ করে থাকেন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব নীতিমালা আছে, তাকে যৌক্তিক করতে হবে। শুল্ক ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ করতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে জানা যায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, গত দশ বছরে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির তুলনায় ২২.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২২.০৩ শতাংশ, যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরের পর সর্বনিম্ন। বিগত ৪ বছর ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির অনুপাতে ক্রমাগত কমছে। একসময় এটি ২৪-২৫ শতাংশের ঘরে থাকলেও এখন তা কমে ২২ শতাংশের নিচে নেমেছে।
কারণ: রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং ব্যাংকিং খাতে অব্যবস্থাপনার কারণে বিনিয়োগকারীরা আস্থাহীনতায় ভুগছেন। মেগা প্রকল্পগুলোর (যেমন- পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল) কারণে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও, সাম্প্রতিক সময়ে (২০২৪-২৫) এটিও হ্রাস পেয়ে জিডিপির ৬.৫১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের পর সর্বনিম্ন।
এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারি বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
২০১৮-১৯ সালের দিকে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩১ শতাংশের বেশি হলেও, তা কমে এখন ২৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনেও বড় ধস নেমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডার কাছে বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কমেছে।
সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ:
২০১৮ সালে সর্বোচ্চ ৩.৬১ বিলিয়ন ডলার নিট এফডিআই আসার পর থেকে সামগ্রিক প্রবণতা নিম্নমুখী। ২০২০ সালে তা কমে ২.৫৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
২০২৫ সালে তা কিছুটা বেড়ে ১.৭৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ালেও, বিনিয়োগের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে । বিবিএস-এর তথ্যমতে, গত এক দশকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি উচ্চ প্রবৃদ্ধি থেকে স্থবিরতা এবং পরবর্তীতে পতনশীল ধারায় এসেছে, যেখানে বেসরকারি খাত সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের। মূলত, উৎপাদন খাত, রফতানি শিল্প এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতির গতি ফেরাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার।




