সোমবার, ৪ মে, ২০২৬, ঢাকা

কোরবানিতে ক্যাশলেস পশুর হাট: সময়ের দাবি, বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ

মহিউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশিত: ০৪ মে ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

শেয়ার করুন:

কোরবানিতে ক্যাশলেস পশুর হাট: সময়ের দাবি, বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ

প্রতি বছর ঈদুল আজহাকে ঘিরে দেশের কোরবানির পশুর হাটগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু এই বিশাল অর্থপ্রবাহের প্রায় পুরোটাই নগদ টাকার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে অস্বচ্ছ। ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, কেন এখনো পশুর হাটগুলো ক্যাশলেস হয়নি?

প্রথমত, নিরাপত্তা। কোরবানির হাট মানেই বিপুল নগদ অর্থের উপস্থিতি, যা ছিনতাই, চুরি ও জাল নোটের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রায়ই দেখা যায়, বিক্রেতা বা ক্রেতা নগদ অর্থ নিয়ে চলাচলের সময় হামলার শিকার হচ্ছেন। ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু হলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস যেমন- বিকাশ, নগদ বা রকেট ইতোমধ্যে দেশে জনপ্রিয়। এগুলো ব্যবহার করে সহজেই নিরাপদ লেনদেন করা সম্ভব।


বিজ্ঞাপন


দ্বিতীয়ত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো রেকর্ড থাকে না। ফলে কর ফাঁকি, অতিরিক্ত মূল্য আদায় কিংবা প্রতারণার সুযোগ থেকে যায়। ক্যাশলেস লেনদেনের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে, যা বাজার ব্যবস্থাপনাকে আরও সুশৃঙ্খল করতে সহায়তা করবে।

তৃতীয়ত, সময় ও দক্ষতা। পশুর হাটে দরদাম শেষে নগদ টাকা গোনা, যাচাই করা—এসব প্রক্রিয়ায় সময় নষ্ট হয়। ডিজিটাল লেনদেন মুহূর্তেই সম্পন্ন করা যায়, যা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্য সুবিধাজনক।

তবে বাস্তবতা হলো, ক্যাশলেস হাট বাস্তবায়ন এত সহজ নয়। সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ডিজিটাল সচেতনতার অভাব। দেশের অনেক খামারি এখনো মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছন্দ নন। আবার হাট এলাকায় নেটওয়ার্ক সমস্যাও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। ঈদের সময় অতিরিক্ত চাপের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে লেনদেন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থা। অনেকেই ভয় পান, ভুল নম্বরে টাকা চলে গেলে কী হবে, বা লেনদেন আটকে গেলে সমাধান কী? পাশাপাশি ক্যাশ আউট চার্জও একটি বড় বাধা। বিক্রেতারা প্রাপ্ত অর্থ দ্রুত নগদে রূপান্তর করতে চান। কিন্তু অতিরিক্ত খরচ তাদের নিরুৎসাহিত করে।


বিজ্ঞাপন


এই পরিস্থিতিতে ক্যাশলেস হাট বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, মোবাইল অপারেটর, ব্যাংক ও হাট ইজারাদারদের যৌথভাবে কাজ করতে হবে। হাট এলাকায় অস্থায়ী নেটওয়ার্ক বুস্টার স্থাপন, প্রতিটি বিক্রেতার জন্য কিউআর কোড চালু, ট্রানজেকশন ফি কমানো বা ঈদ মৌসুমে প্রত্যাহার—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়। প্রথমে বড় শহরের হাটগুলোতে পাইলট প্রকল্প চালু করে সফলতা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে সারাদেশে বিস্তৃত করা যেতে পারে।

এর চাইতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে গ্রাহকের লেনদেনের সীমাবদ্ধতা থাকা। যেমন- একজন গ্রাহক ব্যক্তিগত নাম্বারে সর্বোচ্চ দিনে ২৫ হাজার টাকা লেনদেন করতে পারেন। কিন্তু একটি পশুর দাম দুই থেকে তিন লাখ টাকা কিংবা আরও বেশি হতে পারে। আবার ১ লাখ টাকার নিচে হতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পশুর হাটের লেনদেনের সীমাবদ্ধতা তুলে নিতে হবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে কোরবানির পশুর হাটকে ক্যাশলেস করা শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার। সঠিক পরিকল্পনা, আস্থা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে এই পরিবর্তন সম্ভব—এখন প্রয়োজন কেবল কার্যকর উদ্যোগ।

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহার পশুর হাটের শুরুর পূর্বেই সরকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে ক্যাশলেস পশুর হাট তৈরিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। 

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন এসোসিয়েশন

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর