গণতন্ত্রের হৃদয়স্থল জাতীয় সংসদ। একটি দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। দেশের মানুষের আশা-আকাঙক্ষা বাস্তবায়নের গবেষণাগার। বাস্তবভিত্তিক আইন প্রণয়নের সক্ষমতাই নির্ধারণ করে জাতীয় সংসদ কতটুকু কার্যকর তার ওপর। বস্তুনিষ্ট ও সময়োপযোগী বিতর্কই সংসদকে করে তোলে জীবন্ত। এখানে শাসক-বিরোধীদলের কথার লড়াই শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং জনগণের অধিকার রক্ষার লড়াই।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরোধীদলের সমালোচনা সেই সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল মাত্র একবার। তা হলো ১৯৯৬ সালের পার্লামেন্টে, যখন বিরোধীদলের ভূমিকায় ছিলো বিএনপি। আর বিরোধী দলের নেতা ছিলেন প্রয়াত দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। সেই সুদিন এখন আর নেই। তখন বিএনপি’র অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যগণ জনগণের চাওয়া পাওয়ার নিরিখে সংসদে উত্তাপ ছড়াতেন। সেই দেশপ্রেমিক উত্তাপ সংসদের বাইরে জনমত গঠন করতো।
বিজ্ঞাপন
এই সমালোচনা কখনো তীক্ষ্ণ ব্লেডের মতো সরকারের দুর্বলতা কেটে দিতো। বরাবরই তা জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতো। এসব ছিলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আর সংসদীয় রীতির অসাধারণ বাস্তবায়ন। সেদিন সংসদ ও সংসদের বাইরে ম্যাডাম খালেদা জিয়ার হাত ধরে, প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বে বাংলাদেশ হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক। সেই সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে গঠনমূলক সমালোচনা, শালীন শব্দচয়ন, বাক-স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা এবং জনকল্যাণের প্রতি অঙ্গীকারে।
সংসদের মধ্যে বিরোধীদলের সমালোচনা গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। সংসদীয় বিতর্ক শুধু বক্তৃতা নয়, নিঃসন্দেহে এটি রুচিসম্মত শিল্প। জাতীয় সংসদে বিরোধী নেতা উঠে দাঁড়ান, তার কণ্ঠস্বরে অর্থমন্ত্রীর বাজেটের ফাঁকফোকর তুলে ধরেন। এমনকি সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের অদক্ষতা চিহ্নিত করেন। শিক্ষা, শিল্প, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে বস্তুনিষ্ট তথ্যনির্ভর, সমালোচনা করেন। এই সমালোচনার সৌন্দর্য এই যে, এটি সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরকালে বিরোধীদলের প্রশ্নগুলো সংসদকে জীবন্ত করে তোলে।
জনগণের হৃদয়ের কথা যখন সংসদে আলোচনা হয় তখনই সংসদ হয়ে ওঠে জনতার। তবে অধিকাংশ সময়ই সংসদে বাস্তবভিত্তিক সমালোচনা না হয়ে, অতীতের নানাবিধ বিভাজন সৃষ্টিকারী বক্তব্যের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে জনগণের টাকায় পরিচালিত সংসদ জনগণের কোনো কল্যাণে আসে না। বরং তা জনগণের বিরুদ্ধে যায়।
সমালোচনার সৌন্দর্য শুধু তথ্যভিত্তিক নয়, এতে ভাষার কাব্যিকতাও মিশে থাকে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের সংসদে বিরোধী নেতারা প্রায়ই কবিতাময় ভাষায় সমালোচনা করেন। সরকারের প্রকল্পগুলো মরুভূমির মরীচিকা, দেখতে সুন্দর কিন্তু স্পর্শ করলে শুকনো। এই ধরনের উপমা সমালোচনাকে শিল্প করে তোলে। এটি সংসদকে একটি মঞ্চে পরিণত করে, যেখানে যুক্তি এবং আবেগের মিলন ঘটে। ফলে, সাংসদদের বিতর্ক জনমুখে চলে আসে, এবং জনগণ সচেতন হয়। এই সৌন্দর্যের আরেক দিক হলো এর সংশোধনমূলক ভূমিকা। সমালোচনা সরকারকে উন্নত করার জন্যই; এটি ধ্বংসাত্মক নয়, নির্মাণাত্মক ও গঠনমূলক।
সমালোচনা আবেগ নয়, বিবেক নির্ভর। সমালোচনা সর্বাস্থায় হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক। সংসদ সার্বভৌম বলে, ‘যা কিছু বলতে পারি’ এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন চিন্তার সুযোগ থাকা উচিত নয়। সংসদ সদস্যগণ যেন সংসদীয় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা না করেন সেবিষয়ে বাংলাদেশপন্থী রাজনীতিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সংসদের বাইরে বিরোধীদলের সমালোচনা আরও বিস্তৃত এবং গতিশীল। এখানে সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর স্বাধীনতায়। রাস্তা, মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এসব ক্ষেত্রে বিরোধীদল সরকারের নীতির বিরুদ্ধে কণ্ঠ তোলে। উদাহরণ হিসেবে, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিএনপি এবং জামায়াতের সমালোচনা ছিল তীব্র। তারা রাস্তায় নেমে সরকারের চাকরিনীতির ফাঁক তুলে ধরে। এই সমালোচনার সৌন্দর্য এতে যে, এটি সংসদের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে জনগণের কাছে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকান নীতির বিরুদ্ধে র্যালি করে, যা জনমত গঠন করে। বাংলাদেশেও ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির রাস্তার কর্মসূচি সরকারকে চাপে ফেলে। এই বাইরের সমালোচনায় সৃজনশীলতার ছোঁয়া অসাধারণ। বিরোধী নেতারা গান, কবিতা, বক্তব্য বিবৃতির মাধ্যমে সমালোচনা করেন। সামাজিক মাধ্যমে ফেসবুক লাইভ, টুইটার ট্রেন্ড, এসবের মাধ্যমে বিরোধীদলের কণ্ঠ বিশ্বব্যাপী ছড়ায়।
২০২৩ সালে টিকটকে জামায়াতের ভিডিওগুলো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ ভিউ পায়। এই সৌন্দর্য এতে যে, এটি তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে আকৃষ্ট করে। সমালোচনা আর ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় বিষয়ভিত্তিক হয়। তবে, এই সৌন্দর্যের মধ্যে চ্যালেঞ্জও আছে। সংসদে বিরোধীদলের সমালোচনা কখনো হিংসাত্মক হয়ে ওঠে, যেমন সংসদ নেতার বিরুদ্ধে অভদ্র ভাষা। এটি সৌন্দর্যকে কলুষিত করে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীদলের সমালোচনা একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি। সংসদে এটি আইন প্রণয়নকে সমৃদ্ধ করে; বাইরে এটি জনমতকে জাগ্রত রাখে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিরোধীদলের সমালোচনা ইইউ নীতি পরিবর্তন করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদীয় সমালোচনার সৌন্দর্যের মূলে রয়েছে স্বাধীনতা। সমালোচনা যত তীব্রই হোক না কেন, এটি অহিংস এবং সত্যভিত্তিক হলে গণতন্ত্র সঠিক পথ পায়।
বিরোধীদল ছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্র অর্ধেক। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটি পুরোপুরি সত্য। তবে বিরোধী দলকেও সত্যিকার সংবিধান জেনে বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা করতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্র হবে মুর্খের শাসন। সমালোচনার সৌন্দর্য আরও গভীরে যায় যখন এটি একটি জাতির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যায়। মার্গারেট থ্যাচারের আমলে লেবার পার্টির সমালোচনা ব্রিটেনের অর্থনীতি বদলে দেয়।
তবে আমাদের মতো দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জগুলো অস্বীকার করা যায় না। সংসদে হিউমারের অভাবে বিতর্ক একঘেয়ে হয়। বাইরে মিথ্যা প্রচারণা সৌন্দর্য নষ্ট করে। কিন্তু সমাধান হলো সংস্কার। জনচাহিদার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় সংস্কার সংসদকে অধিকতর কার্যকর হতে সহায়তা করবে।
গতকাল ৩০ এপ্রিল বর্তমান সরকারের প্রথম অধিবেশন শেষ হলো। অনেক না পাওয়ার ভেতরেও ভালো দিক হলো, সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে সহযোগিতার মনোভাব। সংসদ নেতা ছিলেন সাবলীল। ধৈর্যশীল। মিতভাষী। তার সামগ্রিক কার্যাবলী ছিলো দারুণ অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনিও সংসদে প্রথম। তবে তার প্রশ্ন-উত্তর বা বক্তব্যদানকালে কোনক্রমেই বোঝার উপায় ছিল না যে, তিনি নবীন সংসদ সদস্য। অথবা প্রধানমন্ত্রীর ভার বহনে অক্ষম। অপারগ। বরং তিনি ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত কিন্তু স্থিতধী।
পক্ষান্তরে বিরোধী দলের নেতা বা সংসদ উপনেতাও ছিলেন নতুন। তিনি ভদ্রতার সঙ্গে সমালোচনা করেছেন। তবে তার আলোচনা সমৃদ্ধ ছিলো না। তার বক্তব্য আবেগ নির্ভর হলেও তা জাতির জন্য দিক নির্দেশক ছিলো না। বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে তার বক্তব্য স্পষ্ট ছিলো না।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ ও আহত তাদের ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ছিলো না। এমনকি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ হিসেবেও সংসদে মুলতুবির বিল আনতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। সামাজিক উন্নয়নে কোন সুনির্দিষ্ট নীতির প্রকাশ ছিলো না। কুলি-মজুর, মুটে, শ্রমিক শ্রেণির ভাগ্যোন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কোন সিদ্ধান্ত ছিলো না। শিক্ষা-স্বাস্থ্য নিয়ে ছিলো গতানুগতিক বক্তব্য, যা বিগত ৫৪ বছর ধরে এই জাতি শুনছে। একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল নির্মাণের কোনো প্রস্তাব সরকারি বা বেসরকারি কোনো পক্ষ থেকেই তোলা হয়নি। এটি কি সত্যিই আমাদের জন্য অসম্ভব? তার একটি বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা সংসদে হতে পারতো।
এসব অতিজরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে সংসদ উত্তাল হলো, যা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারও করতো। কিন্তু জাতি তা ভালোভাবে নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন হয় ৪ জুলাই, ১৭৭৬। এখন যদি কেউ যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ সৃষ্টি করতে চায় তাহলে মার্কিনীরা তাকে পাগল সাব্যস্ত করবে।
মনে রাখতে হবে, শুধু স্বাধীনতাযুদ্ধ বিক্রি করে অনাদিকাল রাজনীতি চলে না। এই পুঁজি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিঃশেষ হয়ে যায়। তাই রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে জন-আকাঙক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নীতির সংযোজন করতে হবে। তা না হলে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে রাজনীতিই নিঃশেষ হয়ে যাবে। তবে দেশপন্থী রাজনৈতিক চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মের প্রাণের ভাষা উপলব্ধি কতে হবে সকলকেই। অবিলম্বে।
সংসদ ও সংসদের বাইরে বিরোধীদলের সমালোচনার সৌন্দর্য গণতন্ত্রের সারাংশ। এটি শাসককে সতর্ক রাখে, জনগণকে সচেতন করে এবং দেশকে এগিয়ে নেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সৌন্দর্যকে রক্ষা করতে হলে হতে হবে অঙ্গীকারবদ্ধ। সংসদীয় গণতন্ত্রে সমালোচনা অস্ত্র নয়, আলোকবর্তিকা। এই আলো জ্বালিয়ে রাখলে, গণতন্ত্র অমর হবে।
লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক ও কবি।




