মধ্যবিত্তই একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করে। একটি রাষ্ট্রের মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে অর্থনীতি, যা মূলত মধ্যবিত্তরাই গড়ে তোলে। তারা যত বেশি পরিশ্রম ও আয় করতে পারে, যত বেশি পণ্য কেনার সামর্থ্য অর্জন করে তত বেশি চাঙ্গা হয় একটি দেশের অর্থনীতি। মধ্যবিত্তের ধারণাটি এমনিতেই জটিল এবং বিষয়টিকে নানাজন নানাভাবে সংজ্ঞায়িত ও ব্যাখ্যা করেছেন।
সাধারণভাবে মানুষের পেশা, আয়, শিক্ষা, প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামর্থ্য এবং সামাজিক অবস্থানের দ্বারা মধ্যবিত্তের সংজ্ঞায়িত করা হয়। অর্থনীতির পরিভাষায়, অর্থবান ও সম্পত্তিশালী ধনতান্ত্রিক শ্রেণি এবং সাধারণ শ্রমিক শ্রেণির মাঝে যারা থাকে তাদেরকে মধ্যশ্রেণি ও মধ্যবিত্ত বলা হয়।
বিজ্ঞাপন
আবার গবেষকরা মধ্যবিত্তের শ্রেণিবিন্যাস শুধুমাত্র আর্থিকভাবে না করে সামাজিকভাবেও ভাগ করে থাকে। সেই তালিকার প্রথমেই রয়েছে শিক্ষিত ব্যাক্তিরা যাদের নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিভিন্ন কাজের প্রশিক্ষণ এবং স্থায়ী চাকরি রয়েছে। যারা মূলত লেখাপড়া ভালোবাসে, কলম এবং মাথার সাহায্যে জীবন চালায়।
আবার ঐতিহ্যগত পেশাজীবী ও ব্যক্তিদের মধ্যবিত্ত ধরা হয়। ছোট ব্যবসায়ী, কৃষক এবং শিল্প সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িতদের এই শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এই শ্রেণির মধ্যবিত্তেরা পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে বংশপরম্পরায় একই ধরণের রোজগার ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
এই তালিকার একেবারে শেষ শ্রেণিতে উদীয়মান মধ্যবিত্তদের রাখা হয়েছে। এই শ্রেণির বাসিন্দারা শহরে থাকতে এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে ভালোবাসে। পাশাপাশি, ভোগ্যপণ্য কেনার দিকে এদের মারাত্মক ঝোঁক রয়েছে।
অথচ বর্তমানে এই মধ্যবিত্ত কারা এই নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর অনেক দেশে এক ধরণের বিতর্ক দেখা দিয়েছে। কোন মাপকাঠিতে মধ্যবিত্ত মাপা হবে, তাদের মাসিক আয় কত হবে, এটাই এখন জটিল প্রশ্ন। বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা যায়, যখন কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের একজন শিল্পপতি ও অন্যতম ধনী ব্যক্তি নিজকে মধ্যবিত্ত দাবি করেন।
বিজ্ঞাপন
বিশ্ব ব্যাংক এবং অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিনে ২.১৫ ডলারের নিচে আয় করা ব্যক্তিদের গরিব শ্রেণিতে ফেলা হয়। যারা দৈনিক আড়াই ডলারের বেশি রোজগার করে তারা নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির।
অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা ‘পিউ রিসার্চ’ এর মতে, দিনে ১০ থেকে ৫০ ডলার আয় করলে তাদের মধ্যবিত্ত বলতে হবে। দৈনিক ৫০ ডলারের বেশি আয়ের ব্যক্তিদের উচ্চ মধ্যবিত্ত বলতে হবে।
মধ্যবিত্ত নিয়ে নানাজন নানা সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা দিলেও সমাজের পেশাজীবীদের একটা বড় অংশের অবস্থা যে ভালো না, সে বিষয়ে কারোর দ্বিমত থাকার নয়। কতটা সুখী জানতে চাইলে বিষয়টি কোনো মতে এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের আর উপায় থাকে না। দেখা যায়, মে দিবস উপলক্ষে শ্রমিকের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা সভা, সেমিনার, র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন ব্যক্তির লেখালেখিতে, গণমাধ্যমের অনুষ্ঠানে ও সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচিতে মূলত সাধারণ শ্রমজীবী ও কায়িক পরিশ্রমী মানুষের কথাগুলোই প্রাধান্য পায়।
শিক্ষিত-অশিক্ষিত পেশাজীবী বা মধ্যবিত্তরা সবসময় অগোচরে থেকে যায়। সংসার চালাতে কষ্ট হয় কিন্তু সামাজিক অবস্থার কারণে কাউকে বুঝতে দেয় না। নিজেদের আয় রোজগারের সঙ্গে মিল রেখে সমাজ-সংসার রক্ষা করতে গিয়ে তাদের জীবনে প্রতিদিন অনেক কষ্টের গল্প তৈরি হয়। তাদের সংসারে ‘নুন আনতে পানতে ফুরানোর’ মতো অবস্থা।
অনেক সময় শিক্ষিত পেশাজীবীরা মে দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজন করে অথবা তাদের উপস্থিত থাকতে হয় শ্রোতা হিসেবে। কিন্তু নিজেদের কথা নিজেরা তারা বলতে পারে না, আবার অন্যরাও বলে না।
লক্ষণীয় যে, রাষ্ট্র সমাজের ধনিক শ্রেণির দিকে এক ধরণের বিশেষ নজর দিয়ে থাকে। প্রতি বছর বাজেট ঘোষণা উপলক্ষে এই শ্রেণির লোকেরা বেশি তৎপর থাকে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জাতীয় আয় বৃদ্ধি ও ব্যবসা- বাণিজ্য সম্প্রসারণের অজুহাতে রাষ্ট্র থেকে নানা ধরণের প্রণোদনা, কর অবকাশ, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিসহ নানা ধরণের সুবিধার জন্য তৎপরতা দেখা যায়। অথচ দেশের আমজনতা এই সময় নিষ্ক্রিয় থাকে।
অন্যদিকে সরকারি বা বিভিন্ন বেসরকারি পর্যায় থেকে সাধারণ শ্রমজীবী, কায়িক পরিশ্রমী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। আমাদের দেশে তাদের জন্য ওএমএস, ফ্যামিলি কার্ড, টিসিবি কার্ডসহ রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি ও ভাতা। তার যে সবসময় ভালো থাকে সেটা বলা যায় না, তবে কিছু সুযোগ-সুবিধা পেয়ে কোনো মতে জীবন পার করতে পারে। কিন্তু দেশের অনেক লোক সামাজিক মান সম্মানের কারণে পণ্য কেনার জন্য ওএমএসের লাইনে দাঁড়ানোসহ বিভিন্ন স্থানে যেতে পারে না।
বাংলাদেশে প্রতি বছর মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলছে। অর্থাৎ গত বছর কোনো পণ্য বা সেবা কিনতে যে টাকা খরচ করতে হয়েছে, এখন সেই একই পণ্য বা সেবা নিতে আগের তুলনায় বহুগুণ বেশি খরচ করতে হচ্ছে। যে হারে সব কিছুর দাম বাড়ে সে হারে মানুষের আয় বা বেতন বাড়ে না। বাজারে আগুন লাগলে তার আঁচ সব পণ্যের গায়েই লাগে। সব আয়ের মানুষের একই বাজার থেকে পণ্য কিনতে হয়। আর সেই ধাক্কা সবার কাছে সমান নয়।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকলেও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিতে চাকরিরত অনেকের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পেশা বা চাকরি, সুযোগ-সুবিধা ও অধিকারের ক্ষেত্রে অনেকের অবস্থা একেবারে তলানিতে। কিছু প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ছাড়া অধিকাংশই বেতন কাঠামো ও নিয়মনীতি অনুসরণ করে না। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে শক্তিশালী মনিটারিং না থাকায় কর্মীরা ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর পর পর নিম্নতম মজুরি পুনর্বিবেচনা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই শ্রেণির লোকেরা সব সময় মারাত্মক মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। অনেকে ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অ্যান্টিডিপ্রেশন ওষুধ সেবন করে কিংবা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবনকে আরও জটিল করে ফেলে।
ট্রিকেল ডাউন থিউরি
১৮৯০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে ‘ঘোড়া ও চড়ুই তত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। যার অর্থ “যদি আপনি ঘোড়াকে পর্যাপ্ত ‘ওটস’ খাওয়ান, তবে তার কিছুটা চড়ুইদের জন্য রাস্তায় পড়ে থাকবে।” আর এটা থেকে আসে ‘ট্রিকল ডাউন থিউরি’ এবং যাকে বলা হয় ‘চুঁইয়ে পড়ার তত্ত্ব’। অর্থাৎ সম্পদশালীদের সম্পদ যত বেশি হবে তত বেশি চুঁইয়ে পড়বে এবং চুঁইয়ে পড়া থেকে সম্পদহীনরা ও সমাজের অন্য লোকেরা উপকৃত হবে।
ট্রিকেল ডাউন থিউরি মতে, যদি সমাজের উঁচু স্তরের বিত্তবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অর্থ যোগান, সহজ ঋণ সুবিধা, বিভিন্ন ধরনের কর অবকাশ সুবিধা, প্রণোদনা, বিপণন ক্ষেত্রে সহায়তা করাসহ বিভিন্ন রকম নীতি সাপোর্ট দেওয়া হয়, তাহলে তাদের ব্যবসায়িক ও উৎপাদন কার্যক্রম চালু ও সম্প্রসারণ হবে। এতে সমাজের নিম্ন স্তরে বসবাসরত মানুষের কর্মসংস্থান হবে ও তারা নানাভাবে উপকৃত হবে।
এই তত্ত্বটি সাপ্লাই সাইড ইকোনমিক্সের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ পণ্যের জোগান নিজেই তার চাহিদা সৃষ্টি করে। কিন্তু এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কারণ ভোক্তা কোনো পণ্য ক্রয় করবে কি করবে না, তার অনেকটাই নির্ভর করে তার ক্রয়ক্ষমতার ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রে এই তত্ত্ব বিশ ও ত্রিশের দশকে অনুসরণ করা হলেও বাস্তবে দেখা যায়, এই থিউরি সঠিকভাবে কাজ করেনি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আলোচনা করলে দেখা যাবে, জ্ঞাতসারেই হোক আর অজ্ঞাতসারেই হোক এই ট্রিকেল ডাউন তত্ত্বটি অনুসরণ হয়ে চলেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের অজুহাতে সমাজের উঁচু স্তরের একটি বিশেষ শ্রেণির জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নানা ধরণের সহায়তার (প্রণোদনা, কর অবকাশ, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি) ব্যবস্থা থাকে। এমনকি যারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে তা নির্ধারিত কাজে ব্যবহার না করে অন্য খাতে প্রবাহিত করে অথবা বিদেশে পাচার করে অথচ তাদেরও কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না। ঋণ খেলাপের অভিযোগে কারখানা বন্ধ হলে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে—এই অজুহাতে কোনো ঋণখেলাপির কারখানা বন্ধ করা হয় না।
দেখা যায়, অনেকে ইচ্ছা করে ঋণের কিস্তি আটকে রাখে তখন তাদের জন্য হাজির হয় নানা ধরণের আর্থিক সহায়তা। গবেষকদের মতে, এসব কারণে একদিকে দেশে আয় বৈষম্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, পাশাপাশি অনেকে রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তাদের উপার্জিত অর্থ-সম্পদ বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের ৬২ জন ধনী ব্যক্তির হাতে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তা বিশ্বের দরিদ্রতর অর্ধেক জনগোষ্ঠীর থাকা সম্পদের সমান। ক্রেডিট সুসির তথ্য অনুযায়ী, ১ শতাংশ লোকের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে বিশ্বের বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষের সমান সম্পদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও যেন সম্পদের বড় অংশ কিছু গোষ্ঠী বা লোকের কাছে পুঞ্জীভূত হচ্ছে। পাকিস্তান আমলে ছিল ২২ পরিবার আর এখন সেই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, হতে পারে কয়েক শত বা কয়েক হাজার পরিবার। বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো পরিসংখ্যান নেই। কেননা আমাদের দেশে গরিবদের নিয়ে গবেষণা হয় অথচ ধনীদের নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয় না।
সম্প্রতি আল-জাজিরা বাংলাদেশের ধনীদের নিয়ে ‘নিখোঁজ বিলিয়নিয়ার’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। অত্যাধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট, শপিং মল, খাবার থেকে শুরু করে দামি গাড়ি ও স্মার্টফোন অনেক কিছু বাংলাদেশের ধনীদের ক্রমবর্ধমান সম্পদের কথা বলে, যারা দেশের মোট জনগোষ্ঠীর মুষ্টিমেয়।
প্রতিবেদনে রাজধানী ঢাকার অভিজাত গুলশানের ১৪ তলা একটি ভবনের কথা বলা হয়েছে, যেটা নির্মাণ শুরু হওয়ার আগেই (২০২১ সাল) প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্ট ২০ কোটি টাকা ভিত্তিমূলে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।
নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্স জানিয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সম্পদ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী শীর্ষস্থানীয় ছিল। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ৫০ লাখ ডলার বা তার চেয়ে বেশি সম্পদের মালিক এমন মানুষের সংখ্যা বছরে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়ছে। এই হার ভিয়েতানামকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষে এক লাখ ১৩ হাজার ৫৮৬টিরও বেশি বেসরকারি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রতিটিতে কমপক্ষে এক কোটি টাকা জমা ছিল। অথচ দেশের স্বাধীনতার পর এই ধরনের মাত্র ১৬টি অ্যাকাউন্ট ছিল এবং ২০০০ সালে ছিল তিন হাজার ৪৪২টি অ্যাকাউন্ট।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের কোটিপতিরা অফশোর অ্যাকাউন্ট এবং রিয়েল এস্টেটে তাদের সম্পদ লুকিয়ে রেখেছে। প্রমাণ হিসাবে প্যান্ডোরা পেপারসে তালিকাভুক্ত ১১ জন বাংলাদেশির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এটা অস্বীকার যাবে না, সাম্প্রতিক সময়ে এ দেশের কিছু মানুষের যেন ‘গরিবের ঘোড়া রোগ’ দেখা দিয়েছে। তারা অঢেল ধনসম্পদ ও টাকা-পয়সার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। খুব দ্রুত সময়ে বিলনিয়ার বা পৃথিবীর অন্যতম একজন শীর্ষ ধনী হওয়ার স্বপ্নে তারা বিভোর! তাদের চাহিদার কোনো শেষ নেই। আবার অনেকে মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ডসহ পশ্চিমা দেশে বা অন্য কোনো দেশে বসবাস করা বা আসা-যাওয়া অনেক সম্মানের ও আভিজাত্যের ব্যাপার। এ থেকে আবার প্রচলন হয়েছে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করার সংস্কৃতি।
ব্লুমবার্গ, পানামা পেপারস ও প্যান্ডোরা পেপারস, গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস), বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ন্যায় বিভিন্ন সংস্থা ও দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম বিভিন্ন সময়ে এ দেশের কিছু মানুষের অবৈধ ধনসম্পদ ও অর্থপাচারের রিপোর্ট বা খবর প্রকাশ করেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়েছিল। কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দেড় দশক ধরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। প্রতিবছর পাচার করা অর্থের পরিমাণ ছিল গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার।
সুষম বণ্টনই গুরুত্বপূর্ণ
আমাদের অনেকের ধারণা জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার ও মাথাপিছু গড় আয়কে বাড়িয়ে ফেলতে পারলেই উন্নয়নশীল দেশের সব রোগ নিরাময় হয়ে যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২,৮০০ ডলার। কিন্তু বাস্তবে সব পরিবার ও সব মানুষ এই আয় করতে পারে কিনা আর তাদের আয় দিয়ে সংসার চালাতে পারে কিনা সেটা বিবেচনার বিষয়। তাছাড়া অনেকের আয়ের পুরোটাই জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ইত্যাদির জন্য ব্যয় করার মতো অর্থ তাদের হাতে থাকে না।
২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ১৭ লাখ। এসব মানুষের পরিবারের অন্তত একজন অপুষ্টিতে ভুগছে।
এক্ষেত্রে ইউএনডিপির ১৯৯০ সালের প্রথম মানব উন্নয়ন রিপোর্ট উল্লেখ করা যেতে পারে। ‘চুইয়ে পড়া তত্ত্বে’ বিশ্বাস করে না এমন অর্থনীতিবিদরা মূলত এই রিপোর্টটি প্রকাশ করে ছিলেন, যার প্রধান ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং পাকিস্তানের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী মহবুব উল-হক।
পরামর্শদাতা হিসাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন অমর্ত্য সেন, পল স্ট্রিটেন, মেঘনাদ দেশাই প্রমুখ। তাদের মতে, জাতীয় আয় ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিই প্রধান নয়, জীবনযাত্রার মানের সার্বিক উন্নতি ঘটানো— যেমন, সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন, শিক্ষার সুযোগ, ও যথাযোগ্য জীবনযাত্রা ইত্যাদি নিশ্চিত করাই প্রধান।
ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ১৯৯০ সালে মাথাপিছু জাতীয় আয় মাত্র ৪৬৭ ডলার হওয়া সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কা পৃথিবীর ১৩টি দেশের মধ্যে মানব উন্নয়নের সূচকের ক্ষেত্রে ৪৮তম স্থানে ছিল। অন্যদিকে, মাথাপিছু জাতীয় আয় (২৬৬৮৩ ডলার) শ্রীলঙ্কার বহু গুণ হওয়া সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত মানব উন্নয়নের সূচকের ক্ষেত্রে ছিল ৫৪তম স্থানে, দক্ষিণ আফ্রিকা (মাথাপিছু আয় ৩১৬১ ডলার) মানব উন্নয়নে ৬৩তম স্থানে।
যাই হোক আগামীর উন্নত দেশে গড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি। নির্বাচন এলেই সবার আর্থিক উন্নতির কথা বলে প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভেসে যায় দেশ, তবে বাস্তবে তার দেখা মেলে না। এমন অবস্থায় দেশে গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচাররের মাধ্যমে শ্রমের মূল্য নির্ধারণ ও সুষম বণ্টনই কমাতে পারে দারিদ্র্য, বঞ্চনা আর বৈষম্য। সবার জন্য স্থিতিশীল এবং ভাল আয় নিশ্চিত হোক মে দিবসের দাবি।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী




