বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত আজ এক জটিল ও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে অবস্থান করছে। এটি কেবল লোডশেডিংয়ের সমস্যা নয়; বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক চাপ, নীতিগত দুর্বলতা এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, কাগজে-কলমে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যতটা শক্তিশালী দেখানো হয়, বাস্তবে তার সঙ্গে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে।
সরকারি হিসাবে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ২৬–২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তব উৎপাদন অর্ধেকেরও কম, সাধারণ সময়ে ১২–১৫ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। অথচ চাহিদা পিক সময়ে ১৬–১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। ফলে ৩-৪ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়ে নিয়মিত লোডশেডিং অনিবার্য হয়ে উঠেছে। শহরে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও গ্রামে তা ৮–১০ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছে জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।
বিজ্ঞাপন
এই সংকট কেবল উৎপাদনের নয়; এর মূল কারণ জ্বালানি ঘাটতি। দেশীয় গ্যাস কমে যাওয়া, এলএনজি ও কয়লা আমদানিতে ডলার সংকট, এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানির ঘাটতির ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু থাকলেও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পাশাপাশি একাধিক কেন্দ্র বন্ধ বা আংশিক চালু থাকা, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, এবং আমদানিকৃত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
অন্যদিকে, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট মডেলের কারণে উৎপাদন না করেও কেন্দ্রগুলোকে অর্থ দিতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সিস্টেম লস ও বিদ্যুৎ চুরি, যা বছরে চার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির কারণ। কেবল অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে প্রতিদিন ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সংস্থান করতে হয়।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈষম্যমূলক বণ্টন। রাজধানী তুলনামূলকভাবে সুবিধা পেলেও গ্রামীণ অঞ্চল দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকে। ফলে শিল্প, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনে অসম প্রভাব পড়ে—উৎপাদন ব্যাহত হয়, সেচে সমস্যা হয়, এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠে।
মূলত এই সংকট একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার ফল—যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, দুর্বল পরিকল্পনা, এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা বড় ভূমিকা রেখেছে। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।
বিজ্ঞাপন
সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কিছু সুপারিশ:
১. দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি করা
২. নবায়নযোগ্য শক্তিতে (বিশেষত সৌর বিদ্যুৎ) বিনিয়োগ করা
৩. ক্যাপাসিটি পেমেন্ট চুক্তি সংস্কার করতে হবে
৪. বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা
৫. স্মার্ট গ্রিড ও লাইন লস কমানো
৬. বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদন
সারকথা, বর্তমান বাস্তবতা হলো
* বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই
* উৎপাদন সক্ষমতা আছে, কিন্তু অর্থ নেই
* বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু সমান বণ্টন নেই
অতএব, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়—বরং একটি সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই জ্বালানি নীতি গ্রহণ জরুরি।




