বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি—এটি আর কেবল একটি আর্থিক সংকট নয়, বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি গুরুতর প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ব্যাংকিং খাত উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, দুর্বল কর্পোরেট গভর্নেন্স এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণ হয়েছে যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং প্রভাব ও সম্পর্কের ভিত্তিতে। এর ফলে ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় হয়েছে, আমানতকারীদের আস্থা কমেছে এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় ঝুঁকি বেড়েছে।
আইএমএফ এটিকে “financial sector vulnerability” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাস্তবতা হলো—একটি দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা কখনোই শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে না।
বিজ্ঞাপন
সোশাল মিডিয়ায় আমরা যে কথাটি সবচেয়ে বেশি শুনছি—‘ব্যাংক লুট হয়ে গেছে’—তা কেবল আবেগ নয়; এটি বাস্তবতার প্রতিফলন। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্দেশ্যমূলক ঋণ বিতরণের মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী ব্যাংকগুলোকে ব্যক্তিগত সম্পদের উৎসে পরিণত করেছে। হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে, কিন্তু দৃশ্যমান জবাবদিহিতা নেই। বরং জনগণের টাকায় বারবার সেই ক্ষতি পূরণ করা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন—সংস্কার কি সত্যিই হচ্ছে, নাকি পুরনো সমস্যাকে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে?
সাম্প্রতিক আইন ও উদ্যোগ নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যদি যারা ব্যাংক ধ্বংস করেছে, তারাই আবার কম মূল্যে মালিকানা ফিরে পায়—তাহলে এটি কোনো সংস্কার নয়, বরং একটি বিপজ্জনক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। এতে ভবিষ্যতে আরও বড় লুটপাটের পথ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক চাপ—বিশেষ করে আইএমএফ—একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে:
বিজ্ঞাপন
সুশাসন ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন
শিক্ষাখাত: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্বীকার করতে হবে—আইএমএফ কোনো জাদুর সমাধান নয়। তারা দিকনির্দেশনা দিতে পারে, শর্ত আরোপ করতে পারে; কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সততা এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই হবে।
এই মুহূর্তে আমাদের সামনে তিনটি স্পষ্ট অগ্রাধিকার—
প্রথমত, ব্যাংক লুটেরাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি আর্থিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আমরা যদি বাস্তবতাকে অস্বীকার করি, সংকট আরও গভীর হবে। আর যদি সাহসী ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তাহলে এই খাত আবারও অর্থনীতির শক্ত ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশ আজ একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে—
আমরা কি লুটেরাদের রক্ষা করব,
নাকি রাষ্ট্রকে রক্ষা করব?
—সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।
লেখক: সিনিয়র ব্যুরোক্রেট বিশ্লেষক ও লেখক




