বাংলার মেঠো পথ ধরে হাঁটা মানেই প্রকৃতির কোনো গোপন রসভাণ্ডের খোঁজ পাওয়া। বিশেষ করে যখন সোনারগাঁর এই পরিচিত আলপথ ধরে পা বাড়াই, তখন দুপাশে আদিগন্ত সবুজের সমারোহে যার রাজকীয় উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, সে হলো আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল।
ডালপালা ছাপিয়ে গাছের কাণ্ডজুড়ে যখন থোকায় থোকায় কাঁঠাল ঝুলে থাকে, তখন মনে হয় গাছটি যেন ফলের ভারে নয়, বরং ভালোবাসার ভারে নুয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
উদ্ভিদবিজ্ঞানের পরিভাষায় যার পরিচয়—বৈজ্ঞানিক নাম: Artocarpus heterophyllus, পরিবার: Moraceae (মোরাসিয়া),

কাঁঠাল গাছ যেন বাংলার প্রকৃতির এক চিরস্থায়ী আর প্রাচীন অভিভাবক। কবি জীবনানন্দ দাশ তো আর সাধে বলেননি—"বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর... কাঁঠাল-বটের নিচে বসে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটি..."
কাঁঠালের মতো এমন 'গুণী' ফল কি আর দুটো আছে? এর বহুমুখী উপযোগিতা একে অনন্য করে তুলেছে। কাঁচা থাকতে সে 'এঁচোড়', রান্নার পর যার স্বাদ হার মানায় কচি খাশির মাংসকেও। আর পাকলে? আহা! সেই মৌ মৌ গন্ধে চারপাশ ম ম করে। সোনালী রঙের প্রতিটি কোশ যেন যষ্টিমধু আর চিনির রসে টইটম্বুর।
বিজ্ঞাপন
এক কোশ মুখে দিলেই মনে হয় হৃদয়ে যেন এক পশলা প্রশান্তি নেমে এলো। বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণে এই সর্বজনীন ফলের চেয়ে আপন আর কে আছে? এর রুক্ষ তালের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই অমৃত স্বাদই তো প্রকৃতির আসল চমক।

মেঠো পথের ধারের এই দৃশ্যগুলো কেবল চোখ জুড়ায় না, হৃদয়ের অস্থিরতাও মুছে দেয়। পথের পাশে ঝিঙে ফুলের হাসি কিংবা জালি কুমড়োর চপলতা যেন এই কাঁঠালের বিশাল সাম্রাজ্যের ছোট্ট ছোট্ট পারিষদ। আর কাঁঠাল সেখানে এক দয়ালু রাজার মতো অকৃপণভাবে বিলিয়ে দিচ্ছে তার রূপ আর রস।
সোনারগাঁয়ে এই চিরচেনা পথে হাঁটতে হাঁটতে যখন কাঁঠালের এই বৈভব দেখি, তখন মনে হয় প্রকৃতির এই রূপের চেয়ে বড় কোনো পাওয়া জীবনে আর হতে পারে না। এই মায়া, এই ঘ্রাণ আর মেঠো পথের ধুলোবালিতে মিশে থাকা কাঁঠালতলার শীতল ছায়াই আমাদের প্রাণের গভীর স্পন্দন।
লেখক: মোহাম্মদ মহসীন, প্রকৃতি বিষয়ক লেখক ও কলামিস্ট




