গতকাল শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার প্রিন্ট ভার্সনের প্রথম পৃষ্ঠার লিড নিউজ ছিল- ‘আওয়ামী আমলে বিসিএস এ নজিরবিহীন জালিয়াতি।’ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে লিখিত সংবাদে উল্লেখ করা হয় ২৯, ৩০, ৩১তম বিসিএসে জালিয়াতির মাধ্যমে ক্যাডার হন অনেকেই। ৩০তম বিসিএসে ফেল করা ১৮ জনকেও দেওয়া হয় চাকরি। মূলত ৩০ বিসিএসে মহাদুর্নীতি এবং ৩১-এ এসে তা অব্যাহত ছিল। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ২৯, ৩০, ৩১তম বিসিএসের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবতা হলো বিসিএস পরীক্ষা বরাবরই বিতর্কিত এবং দুর্নীতিযুক্ত। প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে আবেদালি ক্যাডারপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে মামা-খালু এবং আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় পরিচয়ের মাধ্যমে বরাবরই অপেক্ষাকৃত দুর্বল মেধাবীরা গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডারে যোগদান করে আসছে। যেসমস্ত মেধাবী প্রার্থী বিসিএস পাননি অথবা নন ক্যাডারে পেয়েছেন বস্তুত পক্ষে তারা কারো সাথে যোগাযোগ না করার কারণেই এমনটি ঘটেছে। সেই যোগাযোগের সূত্র আর্থিক অথবা আত্মিক। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আর্থিক ও দলীয় বিবেচনা। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে যারাই নিয়োগ পেয়েছেন তারা ভিন্নমতের হলেও আওয়ামী লীগ সেজেই তাদের চাকরি পেতে হয়েছে। সাধারণত মেধায় ৫ থেকে ৬ পার্সেন্ট চাকরি পেয়ে থাকে।
বিসিএস এক শুভংকরের ফাঁকি
বহু বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল বিসিএস প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হওয়া। প্রায় প্রতিটি বিসিএসে প্রিলিমিনারিতে কমবেশি ২ লাখ ৫০ হাজার বা তদুর্ধ্ব আবেদনকারী প্রতিযোগিতা করেন। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পরেই ১৫ থেকে ২০ হাজার প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করা হয়। এরপর হয় লিখিত পরীক্ষা। সেই লিখিত পরীক্ষায় ৫০ শতাংশ নম্বর যারা পান তারা উত্তীর্ণ হন। দেখা যায় প্রিলিতে যারা উত্তীর্ণ হয় তাদের সর্বোচ্চ পাঁচ-দশ শতাংশ লিখিত পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হন। এরপর ভাইভা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। সেখান থেকে পদ অনুযায়ী দেড় থেকে দুই হাজার জন ক্যাডার পদে চাকরির জন্য যোগ্য হিসেবে ঘোষিত হন।
সাধারণ চোখে দেখলে মনে হবে পৃথিবীতে এর থেকে স্বচ্ছ, সুন্দর, সুশৃঙ্খল এবং পবিত্র পরীক্ষা আর নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপ্রতিরোধ্য এই যুগে অনেক গোপন তথ্য বেরিয়ে আসে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেখা যায়, বিসিএসের প্রতিটি ধাপেই দুর্নীতির মচ্ছব চলে। কেমন ধরনের দুর্নীতি হয়? চলুন একটু বিশ্লেষণ করে আসি।
প্রতিটি ধাপে হয় দুর্নীতি
প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কেউ উত্তীর্ণ না হলে তাকে চাকরিতে নিয়োগ করা আর সম্ভব হয় না। তাই শুরুতেই আবেদালিদের মাধ্যমে প্রশ্ন তাদের হাতে পৌঁছে যায়। বিনিময়ে চলে টাকার খেলা। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়নি এমন বিসিএস পাওয়া দুষ্কর। ১/১১ এর বাংলাদেশ ধ্বংসের চক্রান্তকারী সরকার ক্ষমতা নিয়েই জনগণের কাছে আলগা পিরিতি পাওয়ার জন্য সে সময়কার ২৭ বিসিএস নিষিদ্ধ করে। পরবর্তী সময়ে আবার নতুন করে ভাইভা নেয়। অনেক মেধাবী এই ক্ষেত্রে বাদ পড়ে। বিশেষ করে যাদের মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল তারা অধিকাংশই ভাইভা থেকে বাদ পড়ে যায়। অর্থাৎ এখান থেকে বোঝা যায় যে, তারা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের পক্ষের সরকার ছিল না। তৎকালীন যিনি পিএসসি চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি মুখে মুখে ছিলেন মহান ও পৃথিবী বিখ্যাত সৎ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে শোনা গেল কানাডাতে তার সেকেন্ড হোম আছে।
বিজ্ঞাপন
এরপর এলো ভিনদেশীদের সেবাদাস সরকার। তারা ছাত্রলীগের ক্যাডারদেরকেই বিসিএস ক্যাডার বানানো শুরু করলো। অর্থাৎ ছাত্রলীগের ক্যাডার হচ্ছে বিসিএস ক্যাডার। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দিয়ে অসংখ্য মেধাহীন পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ ক্যাডারে জায়গা করে নিয়েছে। ছাত্রজীবনে যাদেরকে অনেক মেধাবী মনে হয়েছে যখন তাদের অধিকাংশই বিসিএসে ভালো ক্যাডার পাননি অথবা নন ক্যাডারে চলে গিয়েছেন তখন থেকেই বিসিএস গ্রহণযোগ্যতা হারানো শুরু করে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে ছেলেটি ব্যাক বেঞ্চার ছিল অথবা নিজের ব্যাচের সাথে পড়ালেখা করে পাস করতে না পেরে পরের ব্যাচের সাথে পড়ালেখা করে পাস করেছে তারাও যখন সরকারের আনুকূল্যে দুর্নীতি করে পররাষ্ট্র ক্যাডারের প্রথম দ্বিতীয় মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়েছে তখনই সচেতন ছাত্র সমাজ বুঝে নিয়েছে, বিসিএস এ মেধার মূল্যায়ন হয় না।
এরপর আসে লিখিত পরীক্ষা। বিসিএস একটি প্যাকেজ পরীক্ষা। এখানে সদরঘাটের দালালের মতো প্রতিটি ধাপের ঘাটে ঘাটে আবেদ আলীরা প্রতীক্ষায় থাকে। আবেদ আলীদের মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন আউট হয়ে যায়। সেই প্রশ্নপত্র পেয়ে চমৎকারভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রিটেনে পরীক্ষা ভালো করে অনেকেই। আবার অনেকে এতটুকুও পড়তে চায় না। তারা আবার হলের নির্দিষ্ট রুমে সিটি নেয় এবং সেখান থেকেই দেখে দেখে পরীক্ষা দেওয়ার নজির আছে। এভাবে ভালো নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়া তাদের জন্য সহজ হলেও অদম্য মেধাবীদের কারণে লিখিত পরীক্ষায় তারা পিছিয়ে দেয় অনেক সময়। তারা দেখে দেখে লিখে প্রশ্ন আউট করে যে নম্বর পায় মেধাবীরাও তার কাছাকাছি নম্বর পেয়ে যায়। তখন আর সরকারের হাতে কিছুই থাকে না। তবে এইচটি ইমামরা কখনো হতাশ হয়নি। যেমন করে আলী ইমাম মজুমদারেরা হন না। যেমন করে তাদেরই বর্তমানসুরীরাও হন না। যে কারণে সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করে তারা ভাইভাতে ২০০ নম্বর ধার্য করে। এতে যেটা সুবিধা হয়, তা হলো, যেসব মেধাবীরা লিখিত পরীক্ষায় অনেক ভালো করে তাদের যোগাযোগ না থাকায় তাদের ইন্টারভিউ দেওয়া হয় ৮০-৯০ সর্বোচ্চ ১০০। আর আগে থেকেই পিএসসির মেম্বারদের হাতে যে লিস্ট চলে যায় সেই লিস্টে প্রার্থীদের দেওয়া হয় ঠিক ১৮০/১৯০। মূলত চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে মেধাবীদের পিঠে চূড়ান্ত পদাঘাতটা করা হয়। পিএসসিতে যারা নন ক্যাডার কর্মকর্তা রয়েছেন বা অপেক্ষাকৃত জুনিয়ার কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদের বুক ফেটে গেলেও মুখ ফোটার কোনো সাহস নাই। কারণ পাবলিক সার্ভিস কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। আর পাবলিক সার্ভিস সেক্রেটারিয়েট ফুল সরকারি। যারা সেক্রেটারিয়েটে চাকরি করে তারা কথা বললেই কমিশনে যে বড় বড় রথী মহারথী রয়েছেন, তারা চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এই ভয় তাদেরকে তাড়া করে ফেরে।

অনেকে বলতে পারেন আমরা সাংবাদিক। বিসিএসে চান্স পাইনি। যোগ্যতা নেই। এই কারণে যারা বিসিএস ক্যাডার তাদের উপরে বড়ই ক্ষোভ। এবং সেই ক্ষোভ থেকেই এই ধরনের লেখা। এই সকল মন্তব্য শুনতে আপত্তি নেই। কারণ দুর্নীতি করে যারা বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন, তারা এই ধরনের কথা বলতেই পারেন। তবে সাধারণ সচেতন মানুষ এখন ভালোই বোঝেন। কারণ দলীয় বিবেচনায় যেসমস্ত ক্যাডার এই চাকরিগুলোতে আসেন, তারা মানুষের সাথে ব্রিটিশ বেনিয়াদের চেয়ে নিকৃষ্ট আচরণ করেন। তারা পুলিশ হয়ে নিজের জনগণের উপরে নির্মমভাবে গুলি চালায়। নির্বিচারে হত্যা করে। কারণ এদের তো দায় বোধ নাই। মেধা দিয়ে চাকরি পেতে হলে তো পড়ালেখা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই পড়ালেখা মানুষকে মানুষ করে তোলে। এরা যেহেতু পড়ালেখা করে না, সুতরাং এদের ভেতর মানবীয় গুণাবলি খুব একটা দেখা যায় না। এরকম দুর্নীতির কারণেই জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বাংলাদেশে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। আর আমাদের পররাষ্ট্র তো একেবারেই ঠুঁটো জগন্নাথ। বর্তমান জামানায় যে ডিপ্লোমেসি প্রয়োজন, সেক্ষেত্রে তাদের অ আ ক খ পড়ার মতো অবস্থা। পৃথিবীর অনেক ছোট দেশ রয়েছে। গরিব দেশ রয়েছে। কিন্তু তাদের রয়েছে জাদরেল ডিপ্লোম্যাট। কিন্তু আমরা পাবো কোথায়? প্রশ্ন আউট করে, টাকা দিয়ে, দলীয় বিবেচনায় পররাষ্ট্র ক্যাডার পেলে তো আর ডিপ্লোমাট গড়ে তোলা যায় না।
এখন তাহলে উপায় কী?
বর্তমান সরকারের সামনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। তার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। বিগত দিনগুলোতে যারা বঞ্চিত হয়েছেন তাদের আবার ভাইভা নিয়ে মেধা অনুযায়ী চাকরিতে নিয়োগ করতে হবে। ২৯, ৩০, ৩১ বিসিএস এর কথা সবচেয়ে বেশি বলা হচ্ছে। এই বিসিএসগুলোতে নতুন করে আবার যারা ভাইভা দিতে চায় তাদেরকে ডেকে পিএসসি'র উচিত ভাইভা নেওয়া। কারণ অনেক মেধাবী, তারা মেধা অনুযায়ী চাকরি পাননি। বর্তমান জনগণের সরকার এই ন্যায়বিচারটুকু করলে দুটো সুবিধা-
এক. আওয়ামী লীগ দলীয়করণের মাধ্যমে তাদের যেসমস্ত নিজস্ব ক্যাডার নিয়োগ দিয়ে গিয়েছে, তার প্যারালালি অন্তত কিছু মেধাবী কর্মকর্তা, দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা কাজ করার সুযোগ পেলে এদেশে আধিপত্যবাদ ভবিষ্যতে মাথাচড়া দিয়ে ওঠা অনেক কঠিন হবে। তা না হলে, ব্যাঙাচি যেমন ব্যাঙ হয়, তেমনি এখনকার এই ছোট ছোট কর্মকর্তাগুলো একসময় আইজি হবেন। সচিব হবেন। রাষ্ট্রদূত হবেন। তারা তখন বিএনপি বা বাংলাদেশপন্থী রাজনীতিবিদদের নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবেন। এবং বাংলাদেশপন্থী রাজনীতিকে বিতাড়িত করার সকল চক্রান্ত বাস্তবায়ন করার আপ্রাণ চেষ্টা করবেন।
দুই. নতুন করে যারা ভাইভা দিতে চায়, তাদের ভাইভা নিয়ে পছন্দক্রম অনুযায়ী তাদের ক্যাডার বন্টন করতে পারলে বিএনপি'র প্রতি অন্তত জনগণের আস্থা ফিরে আসবে। মানুষ মনে করবে, বিএনপি মেধাবীদের সাথে কোনো বৈষম্য করে না। দিনশেষে এতে বাংলাদেশপন্থী মানুষই উপকৃত হবেন।
অতএব বর্তমান সরকারের দরকার যেসমস্ত বিসিএস এ প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, আর্থিক লেনদেন হয়েছে, আওয়ামী ক্যাডারদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেই বিসিএসগুলো এখন যারা আবার ভাইভা দিতে চায় তাদের ভাইবার ব্যবস্থা করা। এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তবেই বাংলাদেশ সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন দেখতে পাবে।
লেখক: কবি ও কলামিস্ট




