বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

সুশাসনের সন্ধানে

অধ্যাপক ড. শেখ আকরাম আলী
প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম

শেয়ার করুন:

সুশাসনের সন্ধানে

‘শাসন’ বা গভর্নেন্সের ধারণাটি নতুন নয়। এটি মানব সভ্যতার মতোই প্রাচীন। তবে আধুনিক "সুশাসন" (Good Governance)-এর ধারণাটি ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক উদ্ভূত হয়। মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যাপক ব্যর্থতা, দুর্নীতি এবং দুর্বল অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা মোকাবিলার একটি কাঠামো হিসেবে এটি বিকশিত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে প্রচারিত এই ধারণাটির লক্ষ্য ছিল সাহায্যের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, গণতন্ত্রকে উৎসাহিত করা এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যা টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার এবং দক্ষ জনসেবা নিশ্চিত করে।

সুশাসন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে পরিমাপ করা হয় যে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে জনহিতকর কাজ পরিচালনা করছে, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা করছে এবং অপব্যবহার ও দুর্নীতিমুক্ত থেকে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে মানবাধিকারের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং অংশগ্রহণ হলো সুশাসনের মূল নীতি। প্রকৃতপক্ষে, সুশাসন সেই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এবং ফলাফলের সাথে সম্পর্কিত যা উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয়। এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের একটি প্রক্রিয়া।


বিজ্ঞাপন


যদিও "সুশাসন"-এর কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একক সংজ্ঞা নেই, তবে এটি নির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে: মানবাধিকার, আইনের শাসন, অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতা, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠান, একটি দক্ষ ও কার্যকর সরকারি খাত, জ্ঞান-তথ্য ও শিক্ষার সুযোগ, জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, সাম্য এবং এমন দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ যা দায়িত্বশীলতা, সংহতি ও সহনশীলতাকে লালন করে। সুশাসনের প্রকৃত পরীক্ষা হলো এটি নাগরিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অধিকারসহ মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা পূরণ করতে পারছে।

আমরা সুশাসনের মূল পয়েন্টগুলো একে একে দেখে নিতে পারি। প্রথমত, স্বচ্ছতা, যা সুশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর অর্থ হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার প্রয়োগ এমনভাবে হতে হবে যা প্রচলিত নিয়ম ও বিধিবিধান অনুসরণ করে। এর আরও অর্থ হলো, যারা এই ধরনের সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োগের দ্বারা প্রভাবিত হবে, তাদের কাছে তথ্য অবাধে লভ্য এবং সহজগম্য হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতা, যা সুশাসনের আরেকটি প্রধান শর্ত। কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠানই নয়, বেসরকারি খাত এবং সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোকেও জনগণ এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্টেকহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

তৃতীয়ত, সুশাসনের জন্য প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু আইনি কাঠামো, যা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হবে। আর আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং একটি নিরপেক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ বাহিনী। পরিশেষে, নারী ও পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণ হলো সুশাসনের অন্যতম মূল ভিত্তি। এই অংশগ্রহণ সরাসরি কিংবা প্রতিনিধিদের মাধ্যমেও হতে পারে।


বিজ্ঞাপন


এবার সুশাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট দেখা যাক। বাংলাদেশ একটি শোষণমুক্ত সমাজ, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার শাসনের ভিত্তি হবে—এমন উচ্চাশা নিয়ে স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭২ সালের শুরু থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্টে পতন পর্যন্ত দেশ শাসনকারী প্রথম সরকার এর কোনোটিই অর্জন করতে পারেনি। বরং এটি অত্যন্ত অদক্ষ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, যা সমাজের সমগ্র জনগণকে হতাশ করেছিল।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় সরকার ছিল স্বল্পস্থায়ী এবং তা শেষ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের উত্থানের পথ প্রশস্ত করে। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দুটি পর্যায় দেখা যায়। প্রথম তিন বছর বাংলাদেশ সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা লাভ করে। যদিও মানুষের মৌলিক অধিকার স্থগিত ছিল, তবুও উন্নয়নের অগ্রগতি অব্যাহত ছিল এবং শেখ মুজিব আমলের স্বৈরাচারী নিপীড়ন থেকে পুরো জাতি এক স্বস্তি অনুভব করেছিল।

জিয়াউর রহমান সরকারের দ্বিতীয় পর্যায় (ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ - মে ১৯৮১) প্রশাসনের 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে বিবেচিত এবং এটি বাংলাদেশের জন্য একটি মডেলে পরিণত হয়। জনগণ স্বৈরাচারী সরকারের অভিশাপ থেকে মুক্তি পায় এবং প্রথমবারের মতো প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের সুফল ভোগ করে। যদিও 'সুশাসন' শব্দটির তখন প্রচলন ছিল না, কিন্তু প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের মানুষ সরকারের গৃহীত নীতিগুলোতে অত্যন্ত খুশি ছিল। এই সময়ে বেসামরিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও উন্নয়ন সাধিত হয়। সরকারের তিনটি অঙ্গই (আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ) নতুন প্রাণ ফিরে পায়, যা তারা আগে কখনো অনুভব করেনি। জিয়াউর রহমান সরকারের সাফল্যের এই গল্প সুশাসনের একটি উজ্জ্বল অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এরশাদ সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য অনেক কিছু করলেও সমাজে দুর্নীতি ব্যাপক আকার ধারণ করে। জনগণের অংশগ্রহণকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি এবং প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের নামে চরম প্রহসন প্রদর্শন করা হয়েছিল। অবশেষে, দেশের জনগণ ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে।

সুশাসনের আশায় জনগণ বেগম খালেদা জিয়াকে ক্ষমতায় আনে এবং তার সরকার সুশাসনের লক্ষ্যে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলের অসহযোগিতা সরকারকে রাজনৈতিকভাবে ব্যস্ত রাখে এবং প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলে। শেষ দিন পর্যন্ত সরকারকে চরম রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

প্রায় একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, কিন্তু শেখ হাসিনার সরকারকে বাংলাদেশের মানুষের জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক পাওয়া যায়নি। এটি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে ব্যর্থ হয় এবং ফলস্বরূপ ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়।

খালেদা জিয়ার (২০০১-২০০৬) সরকার কিছু সহজাত দুর্বলতা নিয়ে যাত্রা শুরু করে এবং দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শক্তির বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি হয়, যা তার অবস্থানকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ভারত ও আমেরিকার যৌথ কূটনীতি তাকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ছিটকে দেয়। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা জনগণের জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেন। বাংলাদেশের মানুষকে প্রায় ষোল বছর ধরে এক নগ্ন ফ্যাসিবাদী সরকারের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব তার সরকারের অবসান ঘটিয়েছে এবং সুশাসনের নতুন সুযোগ উন্মোচন করেছে।

বাংলাদেশের জনগণ নিঃসন্দেহে একটি পরিবর্তনকালীন সময় পার করছেন, তবে তাঁরা এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সুশাসন দেখার শেষ ভরসা হিসেবে বিবেচনা করছেন—এমন এক সুশাসন যা অতীতে কখনো অনুভূত হয়নি। সাম্প্রতিক গণভোটের মাধ্যমে তাঁরা প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে নিজেদের রায় দিয়েছেন, যা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল আশা জাগিয়েছে। তাঁদের আস্থা ও বিশ্বাস এখন বিএনপি-র ওপর ন্যস্ত এবং তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, তারেক রহমানের সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং জাতির ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার ঝুঁকি নিতে পারে না।

বাংলাদেশের মানুষ 'জুলাই সনদ' (July Charter) এবং গণভোটে দেওয়া রায়ের বাস্তবায়নের বাইরে অন্য কোনো কিছুই মেনে নেবে না। বাংলাদেশের মানুষের জন্য অন্য কোনো বিকল্প পথ বেছে নেওয়া সমীচীন হবে না। পুরো জাতি বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সরকারের যেকোনো অশুভ চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তারা দ্বিধা করবে না; আর সেটি করা হলে তা সরকার ও দেশের জন্য এক বিরাট হুমকি তৈরি করবে।

জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত জাতীয় ঐক্যকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না এবং এই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়নে সরকারি দল ও বিরোধী দলকে অবশ্যই একযোগে কাজ করতে হবে। এটি বর্তমান সরকারকে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারে।

দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে সুশাসনের প্রচেষ্টাগুলো জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং অংশগ্রহণের মতো নীতিগুলোর ওপর ভিত্তি করে দুর্নীতি দমনের পদক্ষেপগুলো নির্ধারণ করে। সুশাসনের জন্য একটি সত্যিকারের স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। দেশে আইনের শাসনের প্রকৃত অস্তিত্ব দৃশ্যমান হতে হবে।

শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ব্যর্থতার মূলে ছিল জনগণের প্রতি তাঁদের ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ, কিন্তু অতীতে বিএনপির ব্যর্থতা ছিল তাদের কিছু অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের কারণে। ভবিষ্যতে তাদের কাছ থেকে আর কোনো ভুল পদক্ষেপ নয়, বরং বিচক্ষণ ও পরিপক্ক সিদ্ধান্তই কাম্য।

লেখক: সম্পাদক, মিলিটারি হিস্ট্রি জার্নাল

১৬ এপ্রিল ২০২৬

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর