সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

স্মৃতির মিছিলে প্রিয় হাবীব ইমন ভাই

আলমগীর কবির
প্রকাশিত: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম

শেয়ার করুন:

Emon
হাবীব ইমনসহ ঢাকা মেইলের কর্মীরা এক ফ্রেমে। ছবি: ঢাকা মেইল

হাবীব ইমন। আমার সাবেক সহকর্মী। ঢাকা মেইলে আমরা একই দিনে যোগ দিয়েছিলাম, আর সেই দিনটিই ছিল আমাদের প্রথম পরিচয়ের ক্ষণ। শুরুতে আলাদা ডেস্কে থাকলেও নিয়তি আমাদের একই সুতোয় গেঁথে দিয়েছিল মফস্বল বিভাগে। এই বিভাগ নিয়ে আমাদের ভাবনার অন্ত ছিল না; কত শত পরিকল্পনা আমরা একসাথে সাজিয়েছিলাম। নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব তিনি পালন করতেন এক অন্যরকম উদ্দীপনায়। কাজের সেই একাগ্রতা আর প্রাণশক্তি দেখে আমাদের ঘনিষ্ঠতা অফিসের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত সখ্যের জায়গাটুকু দখল করে নিয়েছিল। পারিবারিক গল্পের ঝাঁপি খুলে বসতেন আমার কাছে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়; অনুজদের নিয়ে তাঁর গর্বের শেষ ছিল না। আর ওরাও যে বড় ভাইকে কতটা শ্রদ্ধা করত, তা তাঁর প্রতিটি কথাতেই পরম মমতায় ফুটে উঠত।

ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন অসম্ভব আবেগপ্রবণ, আর নিজ আদর্শে কিছুটা একরোখাও। হাবীব ভাই মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, কঠোর পরিশ্রম করলে জীবনের প্রাপ্তিগুলো গণিতের নিয়মে ছকে ছকে মিলে যায়। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা যখন সেই অংকের হিসাব মেলাতে দিত না, তখনই তিনি সবচাইতে বেশি বিচলিত ও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন। তাঁর একটি প্রখর গুণ ছিল মানুষের মনের ভাষা দ্রুত পড়তে পারা; যা বুঝতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ সময় লাগত, তাঁর অন্তর্নিহিত ইন্দ্রিয় শক্তি দিয়ে তিনি তা নিমিষেই উপলব্ধি করতে পারতেন।


বিজ্ঞাপন


সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বের পাশাপাশি কবি ও লেখক হিসেবে তাঁর একটি স্বতন্ত্র সত্তা ছিল। স্বনামে প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু গ্রন্থ। একসময় লেখালেখিতে আরও নিবিড়ভাবে সময় দেওয়ার তাগিদে তিনি ঢাকা মেইল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং তা সর্বপ্রথম আমাকেই জানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে লেখালেখির সমান্তরালে তিনি ‘সংবাদ প্রকাশ’ নামের একটি অনলাইন পোর্টালে যুক্ত হন। কর্মস্থল বদলালেও আমাদের সম্পর্কের সেতুটি ছিল অটুট। নতুন কোনো লেখা শেষ করলেই মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিয়ে অধীর আগ্রহে মতামতের অপেক্ষা করতেন। তাঁর খিলগাঁওয়ের বাসার পাশ দিয়েই ছিল আমার নিত্য যাতায়াত। কতবার যে চা খাওয়ার নিমন্ত্রণ দিয়েছেন! কিন্তু আমার ফিরতে ফিরতে গভীর রাত হয়ে যেত বলে সেই ইচ্ছে আর পূরণ হয়ে ওঠেনি।

আরও পড়ুন

ঢাকা মেইলের সাবেক সহ-সম্পাদক হাবীব ইমন আর নেই

আজ বড্ড মনে পড়ছে তাঁর সেই অমায়িক খোঁজ নেওয়াগুলো। ফোন করলেই পুরনো সহকর্মী আর মফস্বল প্রতিনিধিদের কথা জানতে চাইতেন। সর্বশেষ গত ১ এপ্রিল বুধবার তাঁর সাথে আমার কথা হয়। মেসেঞ্জারে একটি ইংরেজি লেখা পাঠিয়ে বরাবরের মতো মতামত জানতে চেয়েছিলেন। আমি পরিহাস করে বলেছিলাম, ‘ভাই, আমি তো ইংরেজি বুঝি না।’ আসলে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী দুই ভাই আর সেখানে প্রয়াত বাবার কবরের পাশে দাঁড়ানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই তাঁর ইংরেজি প্রীতির জন্ম হয়েছিল।

হাবীব ভাইয়ের চেতনার এক বিশাল অংশ জুড়ে ছিল বাম রাজনীতি। এমনকি নোয়াখালী থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন তিনি। একবার জুমার নামাজের পর পাঞ্জাবি-টুপি পরা অবস্থায় তাঁর সাথে দেখা হতে আমি বলেছিলাম, ‘আপনাকে এই পোশাকে খুব সুন্দর লাগছে।’ তিনি ম্লান হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ভাই, আমি টুপি পরলেও সমস্যা। এক ভাই তো বলেই বসলেন—বাম রাজনীতি করেন আবার নামাজও পড়েন! আচ্ছা, বাম রাজনীতি করলে নামাজ পড়া যাবে না, এটা কোথায় লেখা আছে?’


বিজ্ঞাপন


গতকাল একজনের ফেসবুক পোস্ট থেকে যখন তাঁর মৃত্যুর খবরটি জানলাম, মুহূর্তেই যেন সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এতো কাছের একজন মানুষের এমন আকস্মিক প্রস্থানে কার কাছে গিয়ে শোক উগরে দেব, তা দিশা পাচ্ছিলাম না। বারবার শুধু মনে হচ্ছিল, মানুষের জীবন প্রদীপ এতো দ্রুত নিভে যায় কেন? মনের গভীর থেকে পরম করুণাময়ের কাছে দোয়া করি, তিনি যেন হাবীব ভাইকে ক্ষমা করেন এবং তাকে চিরশান্তি দান করেন।

লেখক: যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, ঢাকা মেইল

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর