বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

অফলাইন-অনলাইন ক্লাস: বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে? না বেশি ব্যয়? 

মেশকাত সাদিক
প্রকাশিত: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০০ পিএম

শেয়ার করুন:

A

বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের সংকট সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সমাপ্ত হতে না হতেই ইরান-ইজরাইল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধে সত্যিকার অর্থে বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। অস্ত্র গোলাবারুদ বোমারু বিমান বা পারমাণবিক হামলা এগুলো দিয়ে বিশ্বযুদ্ধ না ঘটলেও জ্বালানি তেলের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থেই বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। 

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান সংকটের কারণে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশ‌ই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কোন কোন দেশ অনলাইনে অফিস আদালত স্কুল শুরু করেছে। কোন কোন দেশ সরকারি গাড়ির সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে। হেঁটে হেঁটে কর্মকর্তা-কর্মচারী, সচিব-মন্ত্রীরা সেই সব দেশে অফিসে পৌঁছাচ্ছেন। অথবা পাবলিক বাস ট্রেন মেট্রো ব্যবহার করছেন। 


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ। এরপরও এখানে জ্বালানি তেলের সংকটের কোন প্রভাব পড়েনি বললেই চলে। এটি সরকারের খানিকটা দুঃসাহসিক পদক্ষেপ বলতে হবে। কারণ সরকার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করেনি। সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনেও জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছেন। 

তবে বাংলাদেশের অসৎ ব্যবসায়ীদের কারণে জ্বালানি তেল সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রায় চার লক্ষ লিটার তেল উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলো অবৈধভাবে মজুদ করা হয়েছিল। এছাড়া অনেকেই পাম্পে লিখছেন "তেল নাই"। অথচ সেখানে প্রশাসনিক অভিযানে দেখা গিয়েছে তেল রয়েছে। এরা মজুদ করে পরবর্তীতে বেশি দামে বিক্রির ফন্দি এঁটেছে। 

জ্বালানি তেলের সংকট হলে জনগণ দিশাহারা হয়ে পড়ে। 

কারণ জ্বালানি তেলের সাথেই মানুষের সকল চাহিদার সংকট সৃষ্টি হয়। জ্বালানি তেলের সংকট হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়, যার ফলে শিল্প উৎপাদন কমে যায়। চাষাবাদে যে পাম্প ব্যবহার করে সেটা বন্ধ রাখতে হয়। বাসাবাড়িতে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। আবার জ্বালানি তেল বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যেতে খরচ বেড়ে যায়। 


বিজ্ঞাপন


সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি সৃষ্টি হয়। দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি হলে জনগণের ভিতরে ক্ষোভ বিক্ষোভ মারাত্মক আকার ধারণ করে। আমাদের দেশের শহরগুলোতে যত গাড়ি চলাচল করে তার অধিকাংশই স্কুল কলেজে ছাত্রছাত্রীদের বহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। সে গাড়ি ব্যক্তিগত হোক বা প্রাতিষ্ঠানিক হোক। এছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ চালু রাখার জন্যও প্রচুর ব্যয় নির্বাহ করতে হয় সরকারকে। 

অতএব করোনাকালীন হোক বা অন্য যেকোনো সংকটে প্রথমেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের কথা সরকার বিবেচনায় নিয়ে আসে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করলেই যে জ্বালানি তেলের সংকট নিরসন হয়ে যাবে, বিষয়ে এমনটি নয়। কারণ জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ চলে যায় সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের ব্যবহৃত যানবাহনের পেছনে। অনেক সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন যাদের নামে যে তেল বরাদ্দ করা হয় সেই তেলে দেখা যায় মাসে ১৬০০ বা দুই হাজার কিলোমিটার পথ চলতে পারে। প্রকৃতপক্ষে তারা ৩০০/ ৪০০ কিলোমিটার হয়তো চলাচল করে। 

কিন্তু মাস শেষে বাদবাকি তেল গাড়ির চালক বাজেয়াপ্ত করে। এই কারণে সরকারি কর্মকর্তা সরকারি কাজে প্রতিদিন গাড়ি কত কিলোমিটার চালাচ্ছেন তা সুনির্দিষ্টভাবে লগ ব‌ইয়ে লিপিবদ্ধ করে স্বাক্ষর দিলে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের পেছনে প্রতিদিন যে হাজার হাজার লিটার তেল খরচ হয় তা আশি শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয়

সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন অফলাইন ক্লাস চালু থাকবে। তবে শিক্ষক প্রতিদিনই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অনলাইন ক্লাস নেবেন। প্রাথমিকভাবে বলতে হবে এটি একটি শুভ উদ্যোগ। কিন্তু শিক্ষক যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েই ক্লাস নেন তাহলে তো বিষয়টা এমন হয় যে বিদ্যুৎ আরো দ্বিগুণ ব্যবহৃত হবে। কারণ ছাত্র-ছাত্রীরা বাসায় থাকবে সেখানেও এয়ারকন্ডিশন এবং বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে। আবার শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ক্লাস নেবেন সেখানেও ক্ষেত্রবিশেষে এয়ারকন্ডিশন অথবা ফ্যান অথবা কখনো কখনো উভয়টি চালু থাকবে। তাহলে একই খরচে  শিক্ষার্থীরা স্কুলেই পাঠদান গ্রহণ করতে পারত। 

অতএব যদি তিন দিন অনলাইন তিন দিন অফলাইন এই নির্দেশনা সরকার বাস্তবায়ন করেও তাহলে উচিত হবে শিক্ষকদের বাসায় বসে ক্লাস পরিচালনার সুযোগ দেওয়া। সেক্ষেত্রে অন্তত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে বিদ্যুৎ সেটা সঞ্চয় হবে। 

আশা করি এ ধরনের সিদ্ধান্ত আরো যাচাই-বাছাই করা হবে এবং বাস্তবতার নিরিখে প্রায়োগিক দিক বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যাওয়া হবে। এতে বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করা যাবে। অপব্যবহার রোধ করা যাবে। আর সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে নতুন নির্দেশনা সরকার জারি করতে পারে। সেটি হলো, পাজেরো জীপগুলো বন্ধ করে দিয়ে সবাই মাইক্রোবাসেই যাতায়াত করবে। 

এই সংকটকালে সকল প্রেজুডিস বিদায় দিয়ে সাধারণ জনতার কাতারে নিজেকে কল্পনা করলেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব। আর যদি আশরাফ আতরাফ বিবেচনা করা হয়; আমি আমলা সে কামলা এই চিন্তা করা হয় তাহলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব না। 

আসুন এই লেখা ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ না করে দেশের দিকে চিন্তা করে সবাই জ্বালানি তেল সাশ্রয়ের জন্য যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রাখি। শুধু মনে মনে নয়, সমস্বরে উচ্চকণ্ঠে বারবার বলি, সবার আগে বাংলাদেশ।

লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর