বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

এই মৃত্যু উপত্যকা কি আমার দেশ?

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৬:৩৮ এএম

শেয়ার করুন:

F

‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না/ এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না/এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না/ এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না।’ লিখেছিলেন কবি নবারুণ ভট্টাচার্য। আজ সত্যি মনে হয়, এই মৃত্যু উপত্যকা কী করে আমার দেশ হয়? পদ্মার গহিনের ঘন জলের দিকে তাকিয়ে যে শিশুটি ডেকে যাচ্ছে, ‘মা, মাগো’ মা!’ তাকে কী সান্ত্বনা দেবেন বলুন? 

কর্মের সুবাদে এক সময় আমায় মাসে অন্তত দু-একবার যেতে হতো ফরিদপুর। পথ ছিল পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া। ফেরির মুখে গাড়ি এলে নেমে পড়তাম আগেই। কারণ দুপাশেই খানাখন্দ, ঢালু এবড়োখেবড়ো পথ। শুকনোর দিনে যেমন রুক্ষ। বর্ষায় তেমন পিচ্ছিল। ছোট গাড়ি, বাস কিংবা মালামালবাহী ট্রাক ওই পথে নামাটা সহজ ছিল না মোটেও। সে যতই দক্ষ হোক চালক। অবস্থার যে এখন খুব উন্নতি হয়েছে, তা হয়তো বলা যাবে না। বরং পদ্মা সেতুর দুয়ার খোলার পর পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ার কদর কমেছে। সেখানে অবকাঠামোর খোলনলচে বদলে যাওয়ার সুযোগ কম।  


বিজ্ঞাপন


একবার তো ফেরির মুখে পার্কিং করে রাখা আমাদের অফিসের পাজেরো জিপ গড়িয়ে নেমে গেল পদ্মায়। ভাগ্যিস আমরা তখন গাড়ি ছেড়ে ফেরির অতিথি কামরায়। তা না হলে এই লেখাটি লেখার সুযোগ হতো না। সলিল সমাধি হতে পারতো প্রমত্তা পদ্মায়। 

আজ যে বাসটি দিনের আলোয়, সবার চোখের সামনে, অর্ধশতের বেশি জলজ্যান্ত মানুষ নিয়ে তলিয়ে গেল পদ্মায়, তা মেনে নেওয়ার মতো নয়। শত বছরের পুরনো ব্যবস্থাপনা আর অবকাঠামোর বলি হতে হলো নবজাতক থেকে শুরু করে প্রবীণদের। এই মৃত্যুর শেষ আসলে কোথায়? অকাঠামোর ত্রুটি দিনের পর দিন বিপন্ন করছে মানুষের জীবন। তবু টনক নড়ে না আমাদের। হতভাগা জাতি। সাত মাসের শিশুকে বুকে নিয়ে যে মা তলিয়ে গেলেন জলের অতলে, কোন অক্ষরে শোক লিখবেন তাকে নিয়ে?

এবারের ঈদযাত্রা বলতে গেলে কেটেছে বিষাদেই। ১৮ মার্চ পর পর দুটি দুর্ঘটনা হতভম্ব করে দিয়েছে দেশের মানুষকে। একটি বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার জংশনের অদূরে বাগবাড়ি এলাকায় নীলসাগর এক্সপ্রেসের নয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে প্রায় সত্তরের বেশি মানুষ আহত হন। রেল কর্তৃপক্ষের বরাতে সংবাদে বলা হয়েছে, আগে থেকেই ওই লাইনে মেরামতের কাজ চলছিল। লাল নিশানাও ছিল টানানো। অথচ লোকোমাস্টার সংকেত মানেননি। 

একই দিন বিকেলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে রাজধানীর সদরঘাটে। দুটি লঞ্চের সংঘর্ষে পিষে যান একাধিক যাত্রী। সবার চোখের সামনেই ঘটে সেই দৃশ্য। যাত্রীদেরই কারও মুঠোফোনে ধারণ করা সেই ভিডিও সমাজযোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি অনেকেই। 


বিজ্ঞাপন


ঘটনাটি ঘটে ১৪ নম্বর পন্টুনে। ঢাকা-ইলিশা (ভোলা) রুটের ‘আসা যাওয়া-৫’ নামে একটি লঞ্চ ট্রলার থেকে যাত্রী তুলছিল। সে সময় ঢাকা-দেউলা-ঘোষেরহাট রুটের ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ নামে একটি লঞ্চ এসে ধাক্কা দেয়। এসময় লঞ্চের ধাতব দেহের নির্মম আঘাতে পিষে যান যাত্রীরা। শেষ পর্যন্ত তিনজনের প্রাণহানির খবর এসেছে গণমাধ্যমে। 
লঞ্চ টার্মিনালে যে ঘটনাটি ঘটেছিল তাকে আপনি কী বলবেন? নেহাত দুর্ঘটনা? নাকি হত্যাকাণ্ড? আমার চোখে এখনো ভাসছে লঞ্চের কিনারায় শুয়ে থাকা রক্তাক্ত তরুণের মুখ। তার আতঙ্কিত দৃষ্টি নাকি একটি অথর্ব রাষ্ট্রের প্রতি ধিক্কার?

গণমাধ্যমের খবর বলছে, এবারের ঈদযাত্রায় আট দিনে দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন দুশোর বেশি মানুষ। আহতের সংখ্যা ছয়শোর বেশি। পুলিশ দায়ী করছে চালকের অসচেতনতা। আর সড়ক প্রকৌশলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাড়ির বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, চালকের ক্লান্তি, সড়কের বেহাল দশা ও দুর্বল নজরদারির কারণে এবার দুর্ঘটনার লাগাম টানা যায়নি। ঈদ যাত্রায় মানুষের বাড়তি চাপ তো নতুন কিছু নয় বাংলাদেশের জন্য। অথচ এর ব্যবস্থাপনায় আর আইনের কঠোর প্রয়োগে যারা রয়েছেন, তাদের দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট। 

নবাগত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কেউ কেউ যেভাবে শুরু থেকেই তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছেন, তা জাতির সঙ্গে তামাশার সামিল। সড়কে যখন মৃত্যুর মিছিল, তখন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বললেন, ‘সড়ক যোগাযোগটা স্বস্তির হয়েছে। যাত্রীরা সেবা পাচ্ছে না, বিশৃঙ্খলা আছে, নৈরাজ্য আছে, অনিরাপদ বোধ করছে, টিকিটের ভাড়া বেশি দিতে বাধ্য হচ্ছে...এ রকম কোনো কমপ্লেইন কিন্তু পাচ্ছি না।’   

এত ব্যর্থতার পরও তাদের আত্ম সাফাইয়ের কৌশল পুরনোদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। ২০১১ সালের ১৮ আগস্ট নৌ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তৎকালীন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছিলেন, ‘অশিক্ষিত চালকদেরও লাইসেন্স দেওয়া দরকার। কারণ, তারা সিগনাল চেনে, গরু-ছাগল চেনে, মানুষ চেনে। সুতরাং তাদের লাইসেন্স দেওয়া যায়।’ সেই গরু-ছাগল চেনা চালকদের হাতে যখন থাকে লাখো মানুষের প্রাণ, তখন তা বিপন্ন হবে এটাই কি স্বাভাবিক নয়?

ঈদ যাত্রায় দীর্ঘ এই মৃত্যুর মিছিল, অঙ্গহানির স্বীকার মানুষ কি বিচার পাবে? নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা কি তাদের নাগরিক অধিকার নয়? কর্তাদের হেয়ালীপনা আর দায়িত্বহীনতার মাশুল আর কত নিজের জীবন দিয়ে দিতে হবে তাদের? অতীতে হয়নি বলে কি এখন হতে মানা? পূর্বে যারা ব্যর্থ হয়েছে তাদের দোষারোপ করা অথবা তাদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করে বিমলানন্দ অনুভব করায় কোনো স্বার্থকতা নেই। এখন সময় উত্তর খোঁজার। জবাবদিহিতার। কেন এতো মানুষের প্রাণহানি ঘটল? এজন্য কারা দায়ী?  আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় খামতি ছিল কোথায়? নাকি রাজনৈতিক সরকারের সময় দলীয় সুবিধা দিতে গিয়ে ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর অদক্ষ চালকের প্রতি নমনীয়তাই কাল হয়েছে? উত্তর অবশ্যই পেতে হবে। করতে হবে জবাবদিহিতাও।

আড়াই মাসের ব্যবধানে ঈদুল আজহা। আবারও নিকটজনের সান্নিধ্যে ছুটবে মানুষ। আগামীর ঈদ যাত্রাকে নিরাপদ করতে এবারের ব্যর্থতার দায় ঘোচাতে হবে। দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে দোষীদের। কেউ যেন কোনোভাবেই পাড় পেয়ে না যায়। এসব প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিতে গণমাধ্যমকে অন্ধকারে রাখা যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনা মানুষের সৃষ্টি। শতভাগ শূন্যের কোটায় আনা সম্ভব না হলেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব নয়। নবাগতরা কতটা দক্ষতা পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে।  
  
লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর