শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ঢাকা

সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণ আবশ্যক

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
প্রকাশিত: ১৬ মার্চ ২০২৬, ১২:২৬ পিএম

শেয়ার করুন:

সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণ আবশ্যক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। এই সংসদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, নির্বাচিত সদস্যদের ৭৫ শতাংশই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তারা সংসদীয় আচার-আচরণে অভ্যস্ত নন। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এটি পঞ্চম জাতীয় সংসদ। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে মাত্র তিনটি জাতীয় সংসদ ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ, ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ এবং ১৯৯৬ সালে তৃতীয় সংসদ ছাড়া দেশে কার্যকর কোনো সংসদ ছিল না। এই তিনটি সংসদে অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানদের সমাবেশ ঘটেছিল। সংসদগুলোতে নির্বাচিত সদস্যদের অধিকাংশই ছিলেন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ।

বাংলাদেশের অবশিষ্ট সংসদ ছিল এক ব্যক্তি-কেন্দ্রিক। ব্যক্তির মর্জিমতো আইন ও প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করা হতো এবং স্পিকার যখন উল্লিখিত আইন বা প্রস্তাবের পক্ষে ‘যারা রয়েছেন, তারা ‘হ্যাঁ’ বলুন” বলার জন্য আহ্বান জানালে সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ কাঁপিয়ে চিৎকার করতেন ‘হ্যাঁ’, ‘যারা পক্ষে নেই, তারা ‘না’ বলুন’ বলার আহ্বানে কোনো সাড়া পাওয়া যেত না। স্পিকার বিধি অনুযায়ী তোতা পাখির মতো তিনবার ‘হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে,’ ‘হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে,’ ‘হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে,’ ঘোষণা করলে আইন বা প্রস্তাব পাস হয়ে যেত। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এব! সাত মাস স্থায়ী ২০২৪ এর সংসদ কেমন ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।


বিজ্ঞাপন


পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সামনে প্রথমেই এসেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ, যা সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পাস করে আইনে পরিণত করতে হবে। ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ এর ডামাডোলে নতুন সদস্যদের পক্ষে বুঝে উঠা অসম্ভব যে আসলে এ বিষয়ে তাদের করণীয় কী? তাদের সামনে আরো অনেক কাজ পড়ে আছে। তারা যদি সংসদীয় কার্যক্রম বুঝতেই না পারেন, তাহলে তাদের পক্ষে জনস্বার্থে বা দেশের বৃহত্তর কল্যাণে কোনো ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে না। এজন্য তাদের সংসদীয় আচার-আচরণ ও আইন প্রণয়ন পদ্ধতি ভালোভাবে রপ্ত করা জরুরি।

এজন্য প্রয়োজন তাদের জন্য নিবিড় প্রশিক্ষণ গ্রহণ। ব্যাপারটি সংসদ সদস্যদের কাছে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতে পারে। কারণ তারা সদ্য ভোটের পরীক্ষা বা তাদের জীবনের এক মহাযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। তাদের পদমর্যাদাগত অবস্থান অনেক ওপরে। বাংলাদেশের ‘ওয়ারেন্ট অফ পিসিডেন্স’ অনুযায়ী ১৩তম অবস্থানে তারা। কিন্তু অনেক সংসদ সদস্য এমন দাপুটে হয়ে উঠেন যে তারা এক ঘাটে বাঘ ও বকরিকে পানি খাওয়ানোর মতো নিজেদের সবার ঊর্ধ্বে ভাবেন। যে যাই ভাবুন, সংসদ এমন এক স্থান যেখানে প্রত্যেকের জন্যই প্রতিদিন কিছু না কিছু শেখার থাকে।

কিন্তু বেশিরভাগ সদস্য শেখার তাগিদ অনুভব করেন না। কাগজে লেখা বক্তৃতা পাঠ করেন এবং অনেকে দেখেও পাঠ করতে পারেন না, যা অতীতেও দেখা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের দ্বিতীয় দিবসেও তা দেখা গেছে, যা অনুচিত। স্পিকার তার দ্বিতীয় দিনে এ ব্যাপারে ইঙ্গিতও দিয়েছেন। এভাবে জনপ্রতিনিধিত্ব হয় না, জনগণের কথাও সংসদে তুলে ধরা হয় না।

প্রতিবেশি ভারতে নবীন পার্লামেন্ট সদস্য ও রাজ্য বিধান সভাগুলোর সদস্য, বিশেষ করে যারা প্রথমবার নির্বাচিত হন, তাদের প্রশিক্ষণের জন্য পার্লামেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ইন্সটিটিউট ও ব্যুরো রয়েছে, যেখানে সদস্যরা অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, সাবেক ও বিদ্যমান মন্ত্রী, সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র ব্যুরোক্রেটস, গণমাধ্যমের সম্পাদক ও বহু বছর পার্লামেন্ট কভার করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তারা রিসোর্সপারসন হিসেবে আসেন, তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, হাতেকলমে আইন প্রণয়ন কার্যাবলী শেখান।


বিজ্ঞাপন


শুধু নবীন পার্লামেন্টারিয়ানরাই নন, পার্লামেন্টের নবীন ও মাঝারি পর্যায়ের অফিসাররা, ভারতীয় ও বিদেশি সাংবাদিকরাও এসব প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন।

এসবের মধ্যে রয়েছে ‘পার্লামেন্টারি এন্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিসার্চ ইন্সটিটিউট (পারি), ‘ইন্সটিটিউট অফ কন্সটিটিউশনালা এন্ড পার্লামেন্টারি স্টাডিজ (আইসিপিএস), ‘ব্যুরো অফ পার্লামেন্টারি স্টাডিজ এন্ড ট্রেনিং এবং পার্লামেন্টারি রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং ইন্সটিটিউট ফর ডেমোক্রেসিস’ (পিআরআইডিই)। প্রতিষ্ঠানগুলো নয়াদিল্লিতে পার্লামেন্ট কমপ্লেক্স এলাকায় অবস্থিত এবং লোকসভা সচিবালয় কর্র্তৃক পরিচালিত।

আমি নিজেও ১৯৯২-৯৩ সালে ব্রিটিশ টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামের আওতায় ‘আইসিপিএস’ এ ফেলোশিপ প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার সুযোগ গ্রহণ করেছি। যে কোর্সগুলো সেখানে পড়ানো হয় এবং সাপ্তাহিক যে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় তা আমার কাছে অত্যন্ত ফলপ্রসু বিবেচিত হয়েছে এবং আমি নিজেকে সমৃদ্ধ করেছি।

বাংলাদেশে যেহেতু অনুরূপ কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, সেজন্য সরকার ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের উচিত ভারতের সঙ্গে শিক্ষা বিনিময় কর্মসূচির আওতায় প্রথমবার নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য পালাক্রমে সেসব প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। এতে সরকারের বাড়তি অর্থব্যয়েরও কোনো প্রয়োজন পড়বে না। ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কর্মসূচির জন্য আর্থিক সহযোগিতা ও বৃত্তি প্রদান করে।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর