রোববার, ২২ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন কেন জরুরি

মিতুল ভৌমিক
প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম

শেয়ার করুন:

অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন কেন জরুরি
অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন কেন জরুরি।

সম্প্রতি, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করার মতো একটি বড় দায়িত্বের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশের নব-নির্বাচিত সরকার। এসব অধ্যাদেশের সাংবিধানিক বৈধতা, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং নীতিগত নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঠেছে।

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেছেন যে ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হলেও, এ বিষয়ে তার কার্যালয়ের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং তাকে অসাংবিধানিকভাবে অপসারণের চেষ্টাও হয়েছিল।


বিজ্ঞাপন


সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন না থাকলে, সে সময়ে জারি করা যেকোনো অধ্যাদেশ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে উপস্থাপন করতে হয়। তা না হলে সেই অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারায়।

১৩তম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ শুরু হওয়ার কথা। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সব ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হবে। এরপর সংসদ সদস্যদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, এসব অধ্যাদেশ অনুমোদন, সংশোধন, নাকি বাতিল করা হবে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাড়াহুড়ো করে জারি করা অনেক অধ্যাদেশ “জরুরি প্রয়োজন” পরীক্ষায় টিকতে নাও পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৭–০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জারি করা ১২২টি অধ্যাদেশের মধ্যে মাত্র ৫৪টি পরে সংসদে অনুমোদন পায়। তাই এবার সংসদ কীভাবে এই বিষয়টি সামাল দেয়, সেটি সাংবিধানিক জবাবদিহিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে।

এর মাঝে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যাদেশগুলোর একটি হলো ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫। এই অধ্যাদেশে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে – ই-সিগারেট, ভেপ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্য নিষিদ্ধ করা; তামাকের সংজ্ঞা বিস্তৃত করা; সব ধরনের পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ করা; নির্ধারিত স্মোকিং জোন তুলে দেওয়া; দোকানে তামাকজাত পণ্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা; এবং প্যাকেটে বড় করে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা রাখা বাধ্যতামূলক করা।


বিজ্ঞাপন


জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট অনেকেই এসব উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে এই অধ্যাদেশ জারির প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ব্যবসায়ী, সংশ্লিষ্ট শিল্পখাত বা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই এটি জারি করা হয় বলে অভিযোগ আছে। অথচ ২০২১-২২ সালে একই ধরনের প্রস্তাব ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণে নির্বাচিত মন্ত্রিসভা ফেরত পাঠিয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই আইন কার্যকর করায় স্বচ্ছতা, বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে – বিশেষ করে যখন তামাক খাত সরকারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রাজস্ব দেয়।

২০২৬ সালের ১ মার্চ হাইকোর্ট আইনগতভাবে আমদানি করা ই-সিগারেট জব্দ করার ওপর স্থগিতাদেশ দেয় এবং অধ্যাদেশের ৬(গ) ধারা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তোলে। আদালত সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে বলেছেন কেন এই ধারা, যা সব ধরনের ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম ও হিটেড টোব্যাকো পণ্য নিষিদ্ধ করে, বাতিল করা হবে না।

আবেদনকারীরা যুক্তি দেন, এই আইন ভেপ-কে লক্ষ্য করে নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু প্রচলিত সিগারেটকে বৈধ রেখেছে অথচ ভেপ অনেক দেশে ধূমপানের ক্ষতি কমানোর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়, । তাদের মতে, এটি সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত আইনের দৃষ্টিতে সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই আইনি চ্যালেঞ্জের ফলে অধ্যাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের বাস্তবায়ন আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। এটি দেখায় যে যথাযথ রাজনৈতিক ও আইনি ঐকমত্য ছাড়া বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, এই অধ্যাদেশ এসেছে এমন এক সময়ে যখন দেশের আর্থিক অবস্থা বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে। সিগারেটের ওপর খুচরা মূল্যের প্রায় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত কর ধার্য করা হলেও প্রত্যাশিত রাজস্ব পাওয়া যায়নি। বরং অবৈধ সিগারেটের বাজার বৃদ্ধি হয়ে রাজস্ব আদায় আরও কমেছে। 

ইনসাইট মেট্রিক্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বাজারের প্রায় ১৩.১ শতাংশই অবৈধ সিগারেট। প্রতি মাসে প্রায় ৮৩০ মিলিয়ন করবিহীন সিগারেট বিক্রি হচ্ছে, যার ফলে সরকার বছরে অন্তত ৪,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। ২০২৪–২৫ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৬০০ মিলিয়নের বেশি অবৈধ সিগারেট জব্দ করলেও কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে এই অবৈধ বাণিজ্যের বড় অংশই ধরা পড়ে না।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, হঠাৎ করে কিছু নিষেধাজ্ঞা – যেমন খুচরা স্টিকে সিগারেট বিক্রি বন্ধ করা বা ভেপ নিষিদ্ধ করা, আরও বেশি ক্রেতাকে অবৈধ বাজারের দিকে ঠেলে দিতে পারে, ফলে কর আদায় আরও কমে যেতে পারে।

এদিকে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র ৬.৬ শতাংশে, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম কম। এই অনুপাত বাড়ানোই দেশের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

অন্যদিকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরে এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে – যা সম্ভবত ৪ থেকে ৫ শতাংশেরও বেশি।

এই পরিস্থিতিতে তামাকের মতো বড় রাজস্ব উৎসকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এমন নীতি গ্রহণের আগে খুব সতর্কভাবে ভাবতে হবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং চোরাচালান ও কর ফাঁকি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং রাজস্ব স্থিতিশীলতা – এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে হলে প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কার, এমন নীতি নয় যা হঠাৎ করে রাজস্ব প্রবাহে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

নতুন সরকারের উচিত অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো অধ্যাদেশই যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া অনুমোদন না দেওয়া। সব অধ্যাদেশ স্বচ্ছ ও পরামর্শভিত্তিক পদ্ধতিতে পর্যালোচনা করা হলে আইনের শাসন শক্তিশালী হবে এবং এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে, যেটা হচ্ছে – গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন অবশ্যই সংসদের মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত।

প্রতিটি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে আইনগত পর্যালোচনা, সংসদীয় বিতর্ক এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ নিশ্চিত করা অতি জরুরি।

এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর