রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

এ শহর মায়ের জন্য আহাজারির সময় দেয় না, শুধুই ছুটে চলে...

ফারহানা ন্যান্সি
প্রকাশিত: ০৭ মার্চ ২০২৬, ১১:০১ পিএম

শেয়ার করুন:

এ শহর মায়ের জন্য আহাজারির সময় দেয় না, শুধুই ছুটে চলে...

যে শহরে আমার বসবাস, সে শহরের আবেগ,অনুভুতি, মায়া,ভালবাসা, সহানুভুতি, শব্দগুলোকে আমলে নেয়ার সময় নেই। কিংবা একজন আরেক জনের তরে নিঃস্বার্থ লেনদেন অথবা একটু খানি আপন মানুষগুলোর জন্য ভাবনার সময় এ শহর আমাদের দেয় না! শুধু ছুটে চলা আর ছুটে চলার এক অস্থির রেস।যেখানে প্রাধান্য পায়, ভাল থাকার অথবা  সুখে থাকার অসম প্রতিযোগিতা। কেনো এ শহরকে এমন নিষ্ঠুর বিশেষণ দিলাম,বলছি, চলার পথে এ শহরের ছোট্ট একটা অসমাপ্ত গল্প।

আজকে এক রিকশাচালক আমাকে নিয়ে বাসায় ফিরছে,কয়েকবার ফোন বাজছে তার,রানিং এ থাকায়, হয়তো ধরছেন না। আমি বললাম, ধরেন ফোনটা। চালাতে চালাতে ধরলো,ধরেই কড়া করে বললো, এতোবার ফুন দিতাছো ক্যারে, গাড়ি চালাইতাছি না!! ওপাশ থেকে তার আপন কেউ একজন বললো, তার মা আর নেই। রিকশার প্যাডেল স্লো হলো।ওপাশ থেকে কেউ কাদঁছে। উনি সাইড করে নামলেন।ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছেন, আর বলছেন, আমার কাছে তো ভাড়া নাই গো, আমি তো মায়েরে দেখতে পারমু না।তোমরা দাফন করে ফেলো।


বিজ্ঞাপন


ফোনটা রেখে, রিকশার পেছনে গিয়ে, নিঃশব্দে কাদঁছেন।আমি সবই বুঝতে পারলাম,তবুও কিছুটা বোকার মতো নিরুপায় হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মামা কি হইছে? এবার জোরে শব্দ করে কেঁদে বললেন, আপা, আমার মা মইরা গেছে!! চোখ মুছতে মুছতে আবার রিকশাটা চালানো শুরু করলো।জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বাড়ি কই? বললো,শেরপুর,বর্ডারের কাছে। সামনেই নামলাম আমি। ২ হাজার টাকা দিয়ে বললাম, রিকশাটা জমা দিয়ে, রওনা করেন, শেষ বারের মতো মা কে দেখে আসেন। কাদঁতে কাদঁতে এতো দোয়া করলো, আমার জন্য।  আমার গলার কাছে কেমন জানি দলা পাকায় আসলো....  যেতে যেতে কাকে জানি ফোন করে বললো, আমি আইতাছি, মারে দাফন করিস না। আমি জানি না, মানুষটা আজকে শেষবারের মতো তার মায়েরে দেখতে পাইলো কিনা।সারাদিন কাজের ফাঁকে আল্লাহ কে বলছি, মানুষটা যেনো পৌঁছাতে পারে, প্লিজ।

ঢাকার বুকে সত্য মিথ্যের এমন অসংখ্য গল্প থাকে। জীবনের তাগিদে অনেক নীতি বিসর্জন দেয়া মানুষ হয়তো এ শহরে এমন অনেক কষ্টের গল্পও বিক্রি করে। আমাদের মতো যারা ঐ ভালো থাকার অসম প্রতিযোগিতায় কিছুটা এগিয়ে, তাদের মানুষকে বিশ্বাস আর ভালবাসার, পার্সগুলোতে মরিচা পরে গেছে। তবুও আমি জানি আজকে এই মানুষটার আহাজারি মিথ্যে নয়।

এই শহর খেটে খাওয়া, বাস্তবতার কাছে হেরে যাওয়া মানুষগুলোকে কখনোই আপন করে টানে নেই।তবু তারা এ শহরে একটুখানি ভাল থাকার আশায় বারবার আসে। আর এ মানুষগুলো বাঁচে আশায়।তবুও অবধারিতভাবে এ শহর মায়ের মৃত্যুর আহাজারির সময় দেয় না।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর