টানা ৩৯ দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে কার্যত কোনো নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম হয়নি। সামনে মার্চ মাস— পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি। অথচ মার্চের শেষেই স্কুল খুলে পরপর সি.টি. (ক্লাস টেস্ট) নেওয়ার পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, নিয়মিত পাঠদান ছাড়া শিক্ষার্থীরা কীভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবে? ধারাবাহিক ক্লাস ছাড়া হঠাৎ পরীক্ষার চাপ শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক ও শিক্ষাগত উভয় দিক থেকেই অযৌক্তিক।
দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই মোবাইল ও ইন্টারনেটের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হয়, পড়াশোনার অভ্যাসে ছেদ পড়ে এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। এমনিতেই বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ২২০ দিন বিভিন্ন ছুটি ও অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে স্কুল বন্ধ থাকে। ফলে দীর্ঘ বিরতিতে শিক্ষার্থীরা পাঠাভ্যাস হারিয়ে ফেলে এবং ধীরে ধীরে পড়ালেখা থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে কোচিং সেন্টার, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, কওমি মাদরাসা ও অনেক কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সচল রয়েছে। অভিভাবকেরা ব্যস্ততার মধ্যেও সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন ,কওমি মাদরাসা, ইংলিশ মিডিয়াম ও কোচিংয়ে পাঠাচ্ছেন ঠিকই। তাহলে এক অংশের শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘ ছুটি, আর অন্য অংশের জন্য স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম; এই বৈষম্যের দায় কে নেবে? একই দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন দ্বৈত নীতি শিক্ষার্থীদের মনে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে। শিক্ষা নীতিতে সামঞ্জস্য না থাকলে সামগ্রিক মানও হয় ক্ষতিগ্রস্ত।
বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে এখনো শিক্ষার্থীদের হাতে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস পৌঁছায়নি। নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ছাড়া পরীক্ষা আয়োজন করা শিক্ষার্থীদের প্রতি অন্যায়। কেউ জন্মগতভাবে মেধাবী হয়ে ওঠে না; ধারাবাহিক পাঠ, সঠিক দিকনির্দেশনা ও অনুশীলনের মাধ্যমেই দক্ষতা গড়ে ওঠে। পরিকল্পিত পাঠদান ছাড়া পরীক্ষা নেওয়া মানে শিক্ষার্থীদের অপ্রস্তুত অবস্থায় মূল্যায়নের মুখে ঠেলে দেওয়া।
স্কুল বন্ধ রাখার পেছনে যানজট বা রোজায় শিশুদের কষ্টের যুক্তি তুলে ধরা হয়। কিন্তু একই সময়ে কোচিং সেন্টার ও কিছু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকে। সেখানে না যানজটের অজুহাত, না রোজার অসুবিধার প্রসঙ্গ সামনে আসে। এই দ্বৈত মানদণ্ড শিক্ষাক্ষেত্রে অসাম্যের স্পষ্ট উদাহরণ।
দেশে প্রায় ৬৫,৭০০টি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত। পরিবার-পরিজনসহ প্রায় এক কোটি মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত হয়; টিউশন ফি’র বড় অংশ ব্যয় হয় ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি ও বেতনে। দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে এ খাত চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, অনেক উদ্যোক্তা ঋণগ্রস্ত হন। সরকারি সহায়তা না থাকায় তারা বাস্তবতার তাগিদে পাঠদান চালু রাখতে বাধ্য হন।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষা কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র নয়। পর্যাপ্ত পাঠদান ছাড়া পরীক্ষা নেওয়া মানে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অনলাইনে বা বিকল্প পদ্ধতিতে পাঠদান চালু করা যেত। তাছাড়া শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই সিলেবাস প্রকাশ ও বাস্তবসম্মত একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করা হলে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল।
শিক্ষা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান— শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অবহেলা বন্ধ করুন। ন্যায্য, সমন্বিত ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। অন্যথায় এই দ্বৈত নীতির দায় ও ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরই বহন করতে হবে।
লেখক: শিক্ষক ও শিক্ষা আন্দোলনকর্মী
বিইউ/এফএ




