সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

জামায়াত ক্ষমতায় যাবে না, কেন ও কীভাবে জানি! 

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু 
প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:১৬ পিএম

শেয়ার করুন:

Manju
ছবি- ঢাকা মেইল

জামায়াত মহলে সরকার গঠনের বিপুল উচ্ছ্বাস, জামায়াত নেতাদের সঙ্গে কূটনীতিকদের ঘনঘন উঠাবসা, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় জামায়াতের সরকারে যাওয়ার আভাস, এমনকি অতি সাধারণ মানুষের মুখে ‘বিএনপি-জামায়াতকে তো দেখলাম, এবার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে দেখি,’ ধরনের উৎসাহ দেখার পরও আমি জানতাম, জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। 

চব্বিশোত্তর সময়ে যত মানুষের সঙ্গে আমার আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক মতবিনিময় হয়েছে, নির্বাচন ও দলগত নেতৃত্ব নিয়ে আমি যে নিবন্ধগুলো লিখেছি, সর্বত্র উল্লেখ করেছি, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াত ৫০ থেকে ৬০টি আসন পাবে এবং এবার জামায়াতের সরকার গঠনের কোনো প্রশ্নই উঠে না। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার কথা বার বার মনে পড়েছে: ‘হনুজ দিল্লি দূর আস্ত!’ দিল্লি এখনো অনেক দূরে!   


বিজ্ঞাপন


আমার কথা ও লেখা জামায়াত সমর্থকদের ক্ষুব্ধ করেছে, আমাকে কটু ও অশ্রাব্য বাক্যবাণে আক্রমণ করেছে, যেন আমিই জামায়াতের সরকারে যাওয়ার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি, অথবা আমার সমালোচনার কারণেই জামায়াত ক্ষমতায় যেতে পারবে না। তারা যাই ভাবুক, আমার বিশ্বাসে আমি অটল ছিলাম। অবশ্য জামায়াত আমার ধারণার চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে, কিন্তু তা কোনোভাবেই সরকার গঠনের কাছাকাছি নয়।    

যারা মাঠে রাজনীতি করেন, জনগণের কাছাকাছি থাকেন, তারা কেন জনগণের পালস বোঝেন না, আমার কাছে তা রীতিমতো বিস্ময়ের ব্যাপার। ২০২৪ সালের শেষভাগে এবং গতবছর অক্টোবর-নভেম্বর বাংলাদেশে অবস্থানকালে আমি অন্তত ১০জন সম্পাদক এবং কয়েকজন সচিবসহ ডজনখানেক উর্ধ্বতন আমলার সঙ্গে আলোচনাকালেও তাদের অধিকাংশের মুখে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনার কথা শুনে হতবাক হয়েছি। আমি কোনো সম্ভাবনা দেখি না মর্মে মতামত ব্যক্ত করলে তারা মন্তব্য করেন, ‘যেহেতু আমি দীর্ঘকাল দেশের বাইরে থাকি, অতএব জনগণ জামায়াতকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য ভেতরে ভেতরে কতটা তাতিয়ে আছে, আমার পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়!’ আমি মনে মনে হাসি। 

বাংলাদেশে বসবাস করেও তারা জনগণকে বোঝেন না কেন? সম্পাদক, আমলাদের ধারণা যদি এতটা জনবিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে জামায়াতের নেতাকর্মীরা সরকারে যাওয়ার ব্যাপারে দুশ’ ভাগ আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হবেন, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের সাফল্যের পেছনে জামায়াত-শিবিরের মুখ্য ভূমিকা পালন এবং বিপ্লবোত্তর সময়ে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে ডাকসু-সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিরঙ্কুশ বিজয়ে জামায়াত মহল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার ব্যাপারে প্রায় শতভাগ নিশ্চিত ছিল। এজন্য তাদের দোষ দেওয়া যায় না। 

আমার বিভিন্ন লেখায় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে শিবিরের বিজয়ের  প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে তেমন পড়বে না উল্লেখ করায় আমি ‘আহম্মকের স্বর্গে’ বাস করছি মর্মে নিন্দিত হয়েছি। ‘ডাকসু’র কথাই ধরা যাক, পাকিস্তান যুগের শেষভাগে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন সবার দৃষ্টি থাকতো ‘ডাকসু’র দিকে। ‘ডাকসু’ কী কর্মসূচি গ্রহণ করে, তারই আলোকে কর্মসূচি ঘোষণা করতো আওয়ামী লীগের মতো প্রধান রাজনৈতিক দলকে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে ‘ডাকসু’র আর সেই মর্যাদা ছিল না এবং এখন পর্যন্ত ‘ডাকসু’ তার সাবেক মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে পারেনি। যখন যে রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন ‘ডাকসু’তে নির্বাচিত হয়েছে, তখন ‘ডাকসু’ বড় জোর ওইসব রাজনৈতিক দলের সম্প্রসারিত শাখা হিসেবে কাজ করেছে।  


বিজ্ঞাপন


অতএব, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিরঙ্কুশ জয় লাভ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ জামায়াতের সরকার গঠনের কোনো গ্যারান্টি ছিল না। এই সমীকরণটুকু জামায়াত কতটুকু বুঝেছিল, তা কেবল জামায়াত নেতারা জানেন, তা না হলে আল্লাহ জানেন। এ প্রসঙ্গে আইশ দেহলভীর (মৃত্যু: ১৮৭৪) একটি কবিতা মনে পড়ছে:

‘‘আগার আপনা কাহা তুম আপ হি সমঝে তো কিয়া সমঝে,
মজা কেহনে কা জব হ্যায়, এক কাহে আউর দুসরে সমঝেঁ,
কালাম-ই-মীর সমঝে, আউর জবান-ই-মির্জা সমঝে,
মাগার ইন কা কাহা, ইয়া আপ সমঝেঁ ইয়া খুদা সমঝে।”

(তুমি নিজের কথা কেবল নিজেই বুঝো, তাহলে কী বুঝো,
বলার আনন্দ তো তখন, যখন একজন বলে অপরজন বুঝে,
মীর তকীর কবিতা আর মির্জা গালিবের ভাষাও বোঝা যায়,
কিন্তু তাদের কথা হয় তারা বুঝে, না হলে শুধু খোদা বুঝে।)            

১৯৯৬ সালেও জামায়াত অনুরূপ আত্মবিশ্বাসী ছিল। তখনো সরকারে যাওয়ার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছিল জামায়াত এবং ৩০০ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল। নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে জামায়াতের ওই সময়ের আমির অধ্যাপক গোলাম আজমের বক্তৃতার সারবস্তু ছিল, “আমরা সরকারে যেতে প্রস্তুত। গৃহবধুঁ যদি সরকার চালাতে পারে, আমরা কেন পারবো না! ২৫ বছরে দেশ শাসন করেছে তিনটি দল, তারা দেশের কোনো উন্নতি করেনি। একবার আমাদের ভোট দিয়ে পরীক্ষা করুন।”  দেশবাসী জামায়াতকে পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে ফেলে তাদের তকলিফ দিতে চায়নি। আমার ওই সময়ের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, জামায়াত বড়জোর ১০টি আসন পাবে। আমার ধারণার চেয়ে কম আসন পেয়েছিল জামায়াত। মাত্র ৩টি।        

প্রশ্ন হলো, জামায়াতের শিক্ষিত ও দীক্ষিত লোকজন যা বুঝতে পারে না, আমি কীভাবে তা বুঝি?  আমার কাছে কি কোনো ‘ইলহাম’ বা কোনো আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা আসে? ইন্দ্রিয়াতীত কিছু? আমি কি অতিন্দ্রীয় অভিজ্ঞানের অধিকারী? আমি কি জাদুকর? গণক? জ্যেতিষী? ভবিষ্যদ্বক্তা? 

না, আমি ওসব কিছুই না। এমনকি আমি ওসবে বিশ্বাসও করি না। আমার অভিজ্ঞতা ও পূর্ব লব্ধ জ্ঞানেই আমি জানতাম, জামায়াত সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে না। ১৯৭০ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রতিটি নির্বাচনের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং নির্বাচন ও রাজনীতি বিষয়ক যৎকিঞ্চিৎ পঠন-পাঠন আমাকে ভবিষ্যৎ বলার মতো ঋদ্ধ করেছে বললে ভুল দাবি করা হবে না। জামায়াতের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনায় তাদের কর্মী সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীরা যতটা মাতোয়ারা হয়েছিলেন, তা সত্ত্বেও আমি জামায়াতের কোনো সম্ভাবনা দেখিনি। সম্মানিত সম্পাদক মহোদয় ও আমলাদের  মতামতের সাথে একমত পোষণ করতে পারিনি। 

কারণ, মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ, যা কাটিয়ে উঠতে হয়তো আরো কয়েকটি নির্বাচন, এমনকি আরেক প্রজন্ম লেগে যেতে পারে। ততদিনে আমি ‘বাগ-ই-বেহিশত’ এর তাসনীম ঝরনার পাশে বসে আনজির (ডুমুর), আনার, ইনাব (আঙুর), জায়তুন, শোয়ারা (খেজুর) ইত্যাদি ফল এবং ‘শরাবন তহুরা’র স্বাদ গ্রহণ করতে থাকবো। তবে জামায়াত ভয়াবহ এক বিপর্যয় থেকে উঠে এসেছে, জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে, এটা তাদের জন্য বিশাল অর্জন। এজন্য তারা অভিনন্দন লাভের যোগ্য।  

রাজনৈতিক পক্ষপাত দুষ্ট না হয়েও বিনা দ্বিধায় বলতে পারি যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি বিএনপিকে জনগণের ‘ন্যাচারাল চয়েস’ বা সহজাত পছন্দের দল হিসেবে দেখতে পেয়েছি। এরপর কি হবে তা নির্ভর করবে তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনের ওপর। ২০০৬ সালের পর বিএনপি ও জামায়াতের ওপর যে বিপর্যয় নেমে এসেছিল, সেজন্য বিএনপিও কম দায়ী ছিল না। আওয়ামী লীগ বার বার জনগণের ‘তথাকথিত ভোটে’ ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার জন্য আসলেও তারা কখনোই জনগণের ‘ন্যাচারাল চয়েস’ ছিল না। এমনকি ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালেও না। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু হয়েছিল ১৯৭০ সাল থেকে। 

এবার আমার পূর্বলব্ধ জ্ঞান সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করতে চাই, যা শুধু আমি নই, মানসিক ব্যাধিগ্রস্তরা ছাড়া এ জ্ঞান সবার মাঝে থাকে, কারো কারো মাঝে বেশি থাকতে পারে। কেবল রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়ে নয়। আমি নিজের ক্ষেত্রেও অনেক ঘটনা ঘটে যেতে দেখেছি, তা থেকে মাত্র দুটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি: 

আমার মামাতো ভাই মিনার। ডা, মিনারুল ইসলাম। ময়মনসিংহ শহরে থাকে। বয়সে আমার চেয়ে অনেক ছোটো। অনেক ভালোবাসি ওকে। কিন্তু বহু বছর ওর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। কারো মাধ্যমে ওর কোনো খবরও পাইনি। ২০০৭ সালে ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের সরকার আসার পর বেআইনি কাজকর্মের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু হলো। চারদিকে ধরপাকড়ের মাহোৎসব শুরু করেছিল সরকার। যাচাই-বাছাইয়ের কোনো বালাই ছিল না। 

এসব ঘটনা যখন ঘটছিল, হঠাৎ আমার মন বললো, মিনারের কোনো অঘটন ঘটেছে। তাৎক্ষণিকভাবে কারো কাছে ওর ফোন নম্বর সংগ্রহ করতে না পেরে মহাখালী টার্মিনালে গিয়ে বাসে চাপলাম। ময়মনসিংহ পৌঁছে মিনারকে খুঁজে বের করলাম। আমার ধারণা সঠিক ছিল। আসলেই বিপদ ঘটেছিল ওর। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ওকে তুলে নিয়ে যায়। সওয়াল-জওয়াবের পর হুমকি দেয়। জরিমানা আদায় করে এবং ময়মনসিংহ জেলা কারাগারে পাঠিয়েছিল। 

২০১৯ সালে একটি লেখায় ড. মাজহারুল হান্নান নামে এক আমলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করার প্রয়োজন ছিল। বহু বছর আগে তার সাথে শেষ দেখা হয় কলম্বোতে এক কনফারেন্সে। তখন তিনি ডেপুটি সেক্রেটারি ছিলেন। তার বর্তমান পদবী জানা প্রয়োজন। অনলাইনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ঘেঁটেঘুটেও তাকে খুঁজে না পেয়ে ঢাকায় পরিচিত কয়েকজনের কাছে ফোন করেও তার বর্তমান অবস্থান জানতে পারিনি। অতএব আমার লেখায় তার পদবী ছাড়াই কেবল তার নাম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে সাইডওয়াকে নামার পরই দেখি ড, মাজহারুল হান্নান এক স্টোরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে তিনি নিউইয়র্কে এসেছেন। 

এসব ঘটনা কাকতালীয় হতে পারে। কিন্তু এক ধরনের আধ্যাত্মিক নিবিড়তা অবশ্যই প্রয়োজন পড়ে। কয়েকটি ঘটনা এমন, বয়োবৃদ্ধ ঘনিষ্টজনের খোঁজ নিতে তাদের বাড়ির ৫০০/৭০০ গজ দূরে বাস করেন এমন কাউকে ফোন করেছি। তারা সোজা বলেছেন, ‘উনি তো মারা গেছেন।’ একশ বিশ মাইল দূর থেকে আমার মন বলেছে তারা মারা যাননি। তাদের বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়ে আমাকে জানাতে বলি। খোঁজ নিয়ে তারা আমাকে নিশ্চিত করেন। কেউ মারা যাননি। তারা জানতেন না তাদের উন্নাসিকতা ও প্রেমহীনতার কারণে।   

নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে আমার ধারণাও পূর্ব জ্ঞানলব্ধ। কোনো পক্ষ ও দলের অধিক অনুরাগ পোষণ না করে স্বচ্ছ অন্তকরণ এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণে যে কেউ পক্ষগুলো সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারবেন। কারো প্রতি অন্ধ আকর্ষণ বোধ করলে স্বকীয়তা হারিয়ে যাবে।  

এখন এ সম্পর্কিত কিছু কিতাবি তাত্ত্বিক আলোচনা তুলে ধরছি: 

ইংরেজি Precognition শব্দটির উৎস ল্যাটিন Prae (প্রায়ে) বা আগে এবং cognitio (কনিসিয়ো); যার অর্থ পূর্বে লব্ধ জ্ঞান বা ভবিষ্যদ্দর্শন। অর্থ্যাৎ ভবিষ্যৎ ঘটতে যাচ্ছে এমন ঘটনা সম্পর্কে সরাসরি জানা। পূর্বে লব্ধ জ্ঞান সম্পর্কে কোনো গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকায় এটিকে ‘স্যুডোসায়েন্স’ (Pseudoscience) বা ‘অপবিজ্ঞান’ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়, কারণ বিজ্ঞানীদের মতে এই জ্ঞান বা ভবিষ্যদ্দর্শন কার্যকারণ বা যৌক্তিকতার পূর্বশর্তগুলোর ধার ধারে না। তারা বিশ্বাস করেন যে, কোনো ঘটনা ঘটার আগে ফলাফল বা উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় না। 

তা সত্বেও পূর্বে লব্ধ জ্ঞান ইতিহাসের সকল পর্যায়ে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়েছে এবং এখনো হয়। প্রাচ্যের সকল ধর্মজাতির মধ্যে এ বিশ্বাস এত প্রতিষ্ঠিত যে এখনো সব দেশে ‘গণক’ ‘জ্যোতিষী’ ‘পীর’ সন্ন্যাসী’, ‘মাদুলি’ ‘তাবিজ’ ‘পানি পড়া’ ইত্যাদির ওপর বিশ্বাস ও কদর বেশি। 

কেবল প্রাচ্যে নয়, পাশ্চাত্যেও পূর্বে লব্ধ জ্ঞানের ওপর বিশ্বাস কম নয়। আমেরিকার ৪১ শতাংশ লোক বিশ্বাস করে যে দৈবজ্ঞানের অধিকারী অনেক মানুষ আছে। বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ঘাটতি ও অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বহু মানুষ এসবের প্রভাবকে বাস্তব বলে বিশ্বাস করে এবং এ কারণে ‘অতিপ্রাকৃত মনোবিদ্যা’র (Parapsychology) বলয়ে গবেষণা ও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। 

ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিমদের ঐশি কিতাবগুলোতে উল্লেখ করা নবীদের ইশ্বর বা আল্লাহর সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের কথা এবং কোনো নবীর স্বপ্ন দর্শনের কাহিনি রয়েছে, যে স্বপ্নগুলো ঐতিহাসিকভাবেও প্রমাণিত। মিশরের ফারাও স্বপ্নে ৭টি হাড্ডি-চর্মসার গাভি দেখেন যেগুলো ৭টি মোটাতাজা গাভিকে খেয়ে ফেলে। এছাড়া তিনি সাতটি তাজা গমের শীষ ও অন্যগুলো শুকনো শীষ দেখেন। কেউ যখন স্বপ্নের মর্ম বুঝতে পারে না এবং অলীক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেয় তখন ফারাও এর এক অনুচর তাকে কারাবন্দী ইউসুফের কথা জানায়, যিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারেন। 

ইউসুফ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেন, ‘৭ বছর মিশরবাসীদের উত্তমরূপে চাষ করে খাদ্যের জন্য প্রয়োজনীয় শস্যের অতিরিক্ত শস্য শীষসহ রেখে দিতে হবে। এরপর আসবে দুর্ভিক্ষর সাত বছর। তখন তারা আগের রেখে দেওয়া শস্য খাবে এবং কিছু রাখবে বীজ হিসেবে। এরপর একটি বছর আসবে যখন বৃষ্টিপাতের কারণে উদ্বৃত্ত ফসল হবে।’ তাই হয়েছিল। বুক অফ জেনেসিস অনুযায়ী ‘ইশ্বর ইউসুফকে ম্বপ্নের মাধ্যমে পূর্ব লব্ধ জ্ঞানে ধন্য করতেন এবং অন্যদের দেখা স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার সক্ষমতাও তাকে দিয়েছিলেন।’   

ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে যেকোনোভাবে তা বোঝার বা সম্ভাব্যতার পূর্ব লব্ধ জ্ঞানকে অনেক সময় অন্তর্দৃষ্টিগত অনুভবের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখানো হয়। এটা পূর্ব লব্ধ জ্ঞানের চেয়েও সুনির্দিষ্ট। ভবিষ্যদ্বাণী বলার চর্চা কয়েক হাজার বছরের পুরোনো চর্চা। কোনো ঘটনার ওপর স্বপ্নও অনেক সময় যে বাস্তব বলে প্রমাণিত হয়, তা সর্বজনবিদিত। এমনও নজীর আছে যে একই স্বপ্ন ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিভিন্নজন দেখেছে এবং ঘটনাটি ঘটেছে। এ ধরনের স্বপ্ন মানুষ সচরাচর ঘুম থেকে চমকে জেগে উঠে। 

বৌদ্ধ ধর্মে পূর্বে লব্ধ জ্ঞানের ভূমিকা রয়েছে, এবং তারা স্বপ্নকে মন থেকে সৃষ্ট কল্পনা বলে বিশ্বাস করলেও পাশাপাশি এটাও বিশ্বাস করে যে, স্বপ্নগুলো আসন্ন বিপদে সতর্কতা দেয়, এমনকি তাদের পরম সুখলাভের সুসংবাদের জন্য প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করে। 

ইতিহাসের পৃষ্ঠা জুড়ে পূর্বে লব্ধ জ্ঞানে ধন্য বহু ব্যক্তির উল্লেখ রয়েছে অথবা কিছু বিষয়ে নিবিড় চর্চার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কল্পনা অন্যতম। ঘটনাগুলো মানুষের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তারা ভবিষ্যৎকে তাদের সামনে দেখতে পান। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক জরিপ অনুযায়ী ৭৩ শতাংশ আমেরিকান কোনো না কোনো ধরনের অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতায় (Paranormal Experience) বিশ্বাস করে। এছাড়া ৪১ শতাংশ আমেরিকান ইন্দ্রিয়াতীত ধারণায় (Extrasensory Perception) বিশ্বাস করে।  

প্রাচীন গ্রিসে সংশয়বাদীরা ছাড়া ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানা বা দেখার দাবির ব্যাপারে কেউ কখনো আপত্তি করেনি। অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ) তার “অন ডিভিনেশন ইন স্লিপ” (ঘুমের মধ্যে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্পর্কিত) এ ভবিষ্যদ্বাণীমূলক স্বপ্নের ওপর গবেষণা করার পর স্বীকার করেন, “এটা খুব সহজে অনুমান করা যায় যে কিছু স্বপ্ন ভবিষ্যতের ঘটনার সংকেত ও কারণ হতে পারে। তবে তিনি এটাও বিশ্বাস করতেন যে “বেশিরভাগ ভবিষ্যদ্বাণীমূলক স্বপ্ন কাকতালীয় ঘটনা মাত্র।” 

যেখানে ডেমোক্রিটাস পরামর্শ দিয়েছিলেন যে ভবিষ্যতের ঘটনাগুলি থেকে উদ্ভুতগুলি স্বপ্নদ্রষ্টার কাছে ফেরত পাঠানো যেতে পারে, অ্যারিস্টটল প্রস্তাব করেছিলেন যে এটি বরং স্বপ্নদ্রষ্টার ইন্দ্রিয় ইমপ্রেশন যা ইভেন্টের দিকে এগিয়ে যায়। আরেক গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস (৪৬০-৩৭০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ) বলেন যে, ভবিষ্যতের ঘটনা স্বাপ্নিকের কাছে প্রেরণ করা যেতে পারে। অ্যারিস্টটলের মতে, স্বাপ্নিকের বোধ ভবিষ্যতের ঘটনার কাছে পৌঁছে যায়।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানিদের মতে, ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক কারণে হতে পারে। কিছু ব্যক্তির ভবিষ্যদ্বাণী করার স্বাভাবিক ক্ষমতা থাকতে পারে তাদের উচ্চতর অন্তর্দৃষ্টিমূলক বোধ এবং অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই পূর্ব লব্ধ জ্ঞান বা অনুমান হিসেবেও বর্ণনা করা যায় এবং এটা স্বপ্ন, কল্পনা বা এমনকি আসন্ন বিপর্যয়ের অনুভব হিসেবে বলা যেতে পারে।

মনোবিজ্ঞানিরা আরো মনে করেন যে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ব্যক্তির বলার ক্ষমতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চা, মানসিক কারণ, যেমন শারীরিক ও মানসিক যাতনা, এমনকি কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবনের কারণেও প্রভাবিত হতে পারে। অবশ্য তারা পুরোপুরি অস্বীকার করেন না যে, যদিও কিছু ব্যক্তি পূর্ব লব্ধ জ্ঞানের ক্ষমতাসম্পন্ন দাবি করে, বিজ্ঞানিরা এ ধরনের জ্ঞানের অবস্থাকে ‘অপবিজ্ঞান’ হিসেবে দেখে। যারা ভবিষ্যৎ দেখার সম্ভাবনায় বিশ্বাস করেন, তাদের জন্য এই ধরনের অভিজ্ঞতার কাছে খোলা মন এবং মানুষের উপলব্ধি ও ভবিষ্যদ্বাণী বোঝার চেষ্টা করা অপরিহার্য।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিখ্যাত সাংবাদিক

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর