সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ঢাকা

নতুন যাত্রার অপেক্ষায় বাংলাদেশ

রাশেদ ইসলাম
প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

শেয়ার করুন:

নতুন যাত্রার অপেক্ষায় বাংলাদেশ
রাশেদ ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে বয়সে তরুণ হলেও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় প্রবীণ। স্বাধীনতার পর থেকে সামরিক শাসন, গণআন্দোলন, সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, সংবিধান সংশোধন সবকিছুর মধ্য দিয়ে দেশ একটি জটিল তাৎপর্যপূর্ণ পথ অতিক্রম করেছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর অংশগ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের মান নিয়ে প্রশ্নও থেকে গেছে। এই দ্বৈত বাস্তবতার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের বাংলাদেশ একটি নতুন সময় বা নতুন যাত্রার অপেক্ষায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনো কখনো প্রতিহিংসায় রূপ নিয়েছে- এ কথা অস্বীকার করা কঠিন। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, মামলাবাজি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার এবং তদন্ত-প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়।


বিজ্ঞাপন


ক্ষমতাসীনরা বলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা, বিরোধীরা বলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপের কথা। সত্য হয়তো মাঝামাঝি কোথাও কিন্তু জনমনে যে ধারণাটি গেঁথে যায় তা হলো, ক্ষমতার সঙ্গে নিরাপত্তা আর ক্ষমতাহীনতার সঙ্গে ঝুঁকি জড়িয়ে আছে।

এই সংস্কৃতি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নয়, রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ প্রতিহিংসা-নির্ভর রাজনীতি নীতির ধারাবাহিকতা ভেঙে দেয়। নতুন সরকার পূর্ববর্তী সরকারের প্রকল্প বা নীতিকে সন্দেহের চোখে দেখে, আবার বিরোধী দল ক্ষমতায় গেলে একই প্রবণতা পুনরাবৃত্ত হয়। এতে উন্নয়ন হয়তো হয়, কিন্তু তা প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার ওপর দাঁড়িয়ে নয় ব্যক্তিনির্ভর বা দলনির্ভর কাঠামো।

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির অন্যতম দুর্বলতা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস। এক দল অপর দলকে রাষ্ট্র ধ্বংসের দায়ে অভিযুক্ত করে, অপর দল পাল্টা একই অভিযোগ তোলে। নির্বাচনি প্রক্রিয়া, ভোটের গ্রহণযোগ্যতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এসব ইস্যুতে বিতর্ক দীর্ঘদিনের।

ফলে সাধারণ নাগরিকের মনে প্রশ্ন জাগে রাজনীতি কি নীতির প্রতিযোগিতা, নাকি কেবল ক্ষমতার লড়াই? যখন নীতি নিয়ে সুসংগঠিত বিতর্কের পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অতীতের দায়-দোষের পুনরাবৃত্তি হয়, তখন গণতন্ত্রের মানসিক ভিত্তি দুর্বল হয়। তরুণ প্রজন্ম, যারা তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বেড়ে উঠেছে, তারা আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রত্যাশা করে। সেই প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক ভাষ্য এখনো অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে।


বিজ্ঞাপন


বিরোধী দলের এমপি হলে বাজেট বৈষম্য, কাঠামোগত প্রশ্ন

বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন ও উন্নয়ন বরাদ্দের কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের একটি অংশের দীর্ঘদিনের অভিযোগ বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় প্রকল্প অনুমোদন বা ত্বরান্বিতকরণে অনানুষ্ঠানিক বাধা সৃষ্টি হয়, অথবা অগ্রাধিকার কম দেওয়া হয়।

নীলফামারীর চারটি আসনসহ রংপুর বিভাগের ১৮টি আসনে জয় লাভ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১২ দলীয় জোট প্রার্থীরা। এতে যেমন সাধারণ মানু্‌ষের মনে দেখা দিয়েছে বাজেট বৈষম্যের শঙ্কা, তেমনি তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন গণহারে।

এটি কেবল রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। একজন ভোটার তার প্রতিনিধি যেই দলের হোক, উন্নয়ন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে তার অধিকার সমান। যদি রাজনৈতিক আনুগত্য উন্নয়ন বরাদ্দের অদৃশ্য মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তবে গণতন্ত্রের মূল নীতি‘জনগণই মালিক’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই সমস্যার সমাধান হতে পারে স্বচ্ছ বরাদ্দ কাঠামো, তথ্য উন্মুক্তকরণ এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ব্যবস্থা। উন্নয়ন সূচকভিত্তিক বরাদ্দের বাধ্যতামূলক নীতি এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা হলে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রভাব কিছুটা কমতে পারে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান যা বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত জন-অংশগ্রহণের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তরুণদের সক্রিয় উপস্থিতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বাইরে থেকে সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা।

গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ তৈরি হয় না, এটি দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অসন্তোষ, বৈষম্যবোধ কিংবা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সংকটের বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্র যদি কেবল আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাকে দেখে, তবে তার গভীর সামাজিক বার্তাটি অনুধাবন করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার আন্দোলনের পক্ষেও দায়িত্ব থাকে সহিংসতা পরিহার, সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা এবং সুস্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন।

আরও পড়ুন

সুদিন ও সুশাসনের অপেক্ষা

নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য নির্মূল হয়

২০২৪-এর ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে যে, তরুণ প্রজন্ম আর কেবল দর্শক নয়, তারা অংশীদার হতে চায় নীতি নির্ধারণে, রাষ্ট্র পরিচালনায়, ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে।

অর্থনৈতিক অগ্রগতি বনাম রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাংলাদেশ গত দুই দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে। রফতানি, প্রবাসী আয়, অবকাঠামো উন্নয়নসহ সব মিলিয়ে একটি পরিবর্তিত অর্থনৈতিক চিত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হয় তখনই, যখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা সমান্তরালভাবে বৃদ্ধি পায়।

বিদেশি বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এসবই রাজনৈতিক পূর্বানুমানযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। যদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়মিত অস্থিরতায় রূপ নেয়, তবে উন্নয়ন কাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

নতুন যাত্রার পূর্বশর্ত সংস্কৃতি ও কাঠামোর পরিবর্তন

বাংলাদেশ একটি নতুন সময়ের অপেক্ষায় এই প্রত্যাশা কেবল আবেগ নয়, বাস্তব প্রয়োজন। সেই নতুন যাত্রার জন্য কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন জরুরি, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি, বিরোধী দলকে শত্রু নয়, নীতিগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা। প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি সর্বদলীয় আস্থা গড়ে তোলা।

এর পাশাপাশি উন্নয়ন বরাদ্দেও স্বচ্ছতা থাকতে হবে। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অঞ্চলভিত্তিক প্রয়োজন ও সূচক অনুযায়ী বরাদ্দ নিশ্চিত করা। তরুণ ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ কেবল নির্বাচনের সময় নয়, নীতি প্রণয়ন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়াতেও অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিটি সংকটই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সবই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আজকের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন, কিন্তু প্রয়োজন একই, আস্থা, ন্যায় ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রতিহিংসার পুরোনো চক্রে আবদ্ধ থাকব, নাকি রাজনৈতিক পরিপক্বতার পথে হাঁটব? বাংলাদেশ হয়তো সত্যিই একটি নতুন সময়ের অপেক্ষায়। কিন্তু সেই সময় আসবে তখনই, যখন দল-মত নির্বিশেষে সবাই স্বীকার করবে রাষ্ট্র কারও একার নয়, এটি সবার।

নতুন যাত্রা শুরু হয় মানসিক পরিবর্তন দিয়ে। হয়তো সেই পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তেই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।

লেখক: সংবাদ কর্মী

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর