দীর্ঘ ১৯ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপি আবারো বাংলাদেশে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয় নিশ্চিত হওয়ায় বিএনপির প্রতি দেশবাসীর ভালোবাসা এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর আস্থা প্রমাণিত হয়েছে। তারেক রহমান হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। কয়েক দিনের মধ্যেই তার নেতৃত্বে জনগণের পছন্দের সরকার শপথ গ্রহণ করবে। তাকে ও তার সরকারকে আগাম অভিনন্দন। ক্ষমতার বাইরে থাকার এই দীর্ঘ সময়ে দল হিসেবে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন ও নেতৃত্বশূন্য করতে ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিনের নেতৃত্বে এক-এগারোর তথাকথিত কেয়ারটেকার সরকার ২০০৭ ও ২০০৮ সাল এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার এমন কোনো উপায়-উদ্যোগ নেই, যা করেনি।
তারেক রহমানের ওপর এত নির্যাতন চালানো হয়েছিল যে তিনি রীতিমতো শারীরিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে ছিলেন। একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে মানসিক পীড়নের মধ্যে রাখা হয়েছিল। তিনি যদি নির্বাসিত জীবন বেছে না নিতেন, তাহলে শেখ হাসিনা জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছিলেন, তাতে তার ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর হাতে তার প্রাণ সংশয় হতে পারত, যা হাসিনার আমলে অনেক রাজনৈতিক নেতার ভাগ্যে ঘটেছে।
বিজ্ঞাপন
তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ওপর এক-এগারোর সরকার ও শেখ হাসিনা সরকারের নিপীড়নের কোনো সীমাপরিসীমা ছিল না। তাকে তার দল পরিচালনা করার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে বাড়ি থেকে বের হতে না দিয়ে। সাজানো মামলায় আদালত তথাকথিত ‘ওপরের নির্দেশ’ অনুযায়ী তাকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। সত্তরোর্ধ্ব অসুস্থ একজন রাজনীতিককে উপযুক্ত চিকিৎসার সুযোগও দেওয়াই হয়নি। শেখ হাসিনা চরম আক্রোশে জনসমাবেশে, জাতীয় সংসদে অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ করে তাকে মানসিকভাবেও ঘায়েল করা হয়েছে। তার ছোট ছেলে বিনা চিকিৎসায় পৃথিবী ত্যাগ করেছেন।
একটি রাজনৈতিক পরিবারকে ধ্বংস করার সূক্ষ্ম আওয়ামী পরিকল্পনার মধ্যে যেখানে মুখ খোলাও কারও জন্য নিরাপদ ছিল না, সেই পরিস্থিতির মধ্যে তারেক রহমান নির্বাসনে থেকেও বিএনপির ঐক্য ধরে রাখার জন্য দিনরাত কর্মতৎপরতা অব্যাহত রেখেছিলেন। দক্ষতা, সততা, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রিয়তার ঊর্ধ্বে উঠে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (১৯৭৭-১৯৮১) এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার (১৯৯১-১৯৯৬, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬) মেয়াদকে বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে সুশাসনের স্বর্ণযুগ বলা হলে ভুল হবে না।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া দুজনই ছিলেন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বাইরের মানুষ। উভয়ের পুঁজি ছিল দেশ ও জনগণের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা, যা তাদের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার কারণ। ভালোবাসা দিয়ে তারা জনগণের হৃদয় জয় করেছিলেন। তাই প্রায় দুই দশক বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থাকলেও জিয়া ও খালেদা জনগণের হৃদয়ে ছিলেন। এই ভালোবাসা জিইয়ে রাখার জন্য তাদের কোনো মূর্তি স্থাপন করতে হয়নি। পাঠ্যপুস্তকে তাদের বন্দনামূলক কোনো কিছু অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। শত শত প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম জিয়া পরিবারের সদস্যদের নামেও করা হয়নি। তাদের ভালোবাসার জন্য রাষ্ট্রীয় কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি, এজন্য কোনো আইনও প্রণয়ন করা হয়নি। জবরদস্তি করে, আইন করে যে ভালোবাসা আদায় করা যায় না, বাংলাদেশের জনগণ তা প্রমাণ করেছে ২০২৪-এর আগস্টে।
মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের উত্তরাধিকারী তারেক রহমান। তাদের অবর্তমানে তাদের গড়া দলের উত্তরাধিকারও বর্তেছে তার ওপর। তাদের দুজনের প্রতি জনগণের এই অকৃত্রিম ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্বও অর্পিত হয়েছে তারেক রহমানের ওপর। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে তার জন্য সময় এসেছে, তার বাবা-মার প্রতি দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ করার। এই সৌভাগ্য সবার জীবনে আসে না। যেমন আসেনি শেখ হাসিনার জীবনে, যিনি ক্ষমতাকে ব্যবহার করেছিলেন প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এবং তার শোচনীয় ও লজ্জাজনক পরিণতিকে তিনি নিজেই আমন্ত্রণ করেছেন।
বিজ্ঞাপন
আওয়ামী লীগ তাদের নিজেদের সৃষ্ট কারণে ১৯৭৫ সালের ক্ষমতার গগন থেকে ছিটকে পড়েছিল, যা পুনরায় তাদের হাতে ফিরে আসতে সময় লাগে দীর্ঘ ২১ বছর। কেন আওয়ামী লীগকে ছিটকে পড়তে হয়েছিল? আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাহচর্যে ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের, অর্থাৎ সংসদীয় গণতন্ত্রের সবক নিয়েছিলেন বলে জীবৎকালে স্বয়ং দাবি করতেন এবং এখনো তার অনুসারীরা তাকে তাদের ভাষায় ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’খ্যাত সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য ছিলেন বলে দাবি করেন, সেই শেখ মুজিব কতটা কাণ্ডজ্ঞানহীন হলে সংসদীয় ব্যবস্থার বিধানসংবলিত সংবিধানের অধীনে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদে কেবল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে চোখের পলকে সংবিধানের খোলনলচে একদলীয় রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা কায়েম করেন, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছেও বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে আছে।
মন্দ হাতে ভালো বস্তু পড়লে সেই বস্তুর যে দশা হতে পারে শেখ মুজিবের হাতে গণতন্ত্রের সেই অবস্থা হয়েছিল। হিন্দি ভাষার এক কবি বলেছেন, ‘অহম কা নশা চড়া তো ইনসান খুদ কো খুদা সমঝ ব্যয়ঠা’ (অহংকারের নেশা মাথায় উঠলে মানুষ নিজেই খোদা ভাবে।) তিনি নিজেও জানতেন না যে তার অহংকার তাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে।
গণতন্ত্রের নামে জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, একক নেতৃত্বের অহংকারে মুজিব তা আঁচও করতে পারেননি। রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা, ঔদ্ধত্য ও ভুল পরামর্শ তাকে ভ্রান্ত পথে চালিত করেছিল। বাংলাদেশে শেখ মুজিব সর্বপ্রথম দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহার করেছিলেন। একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর কৌশলগত সমর্থনে বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।
ওই সময় সংসদে যেহেতু আওয়ামী লীগের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন ছিল না, অতএব শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে পরিচালিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন এবং একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আওয়ামী লীগের চার কেন্দ্রীয় নেতার হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা চরিতার্থের বিচার অনুষ্ঠান। সুশাসনের দিকে কোনো মনোযোগ ছিল না তাদের। ফলে ২০০১ সালে ক্ষমতা থেকে তাদের বিদায় নিতে হয় এবং সরকার গঠন করে বিএনপি-জামায়াত জোট।
বিএনপি একা সরকার গঠনের চেয়েও অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী হলেও নির্বাচনি সমঝোতার অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে সরকারের শরিক হিসেবে রাখে। ভালোমন্দ মিলিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট তাদের মেয়াদ পূর্ণ করলেও ভবিষ্যতে তাদের ক্ষমতায় আসার পথ রুদ্ধ করার লক্ষ্যে এক-এগারোর নাটকের অবতারণা করা হয়, দেশ ও জাতির জন্য যার পরিণতি শুভ ছিল না।
সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকারের দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতির ফল ছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। অসৎ পরিকল্পনার ছকের অংশ হিসেবে বিএনপিকে মাত্র ৩০টি আসনে জয়ী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, যা বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্যও ছিল না। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ থেকে গণতন্ত্রকে আরেকবার নির্বাসিত করার পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ আর পেছন ফিরে তাকায়নি। তারা অন্তর্জাতিক আইন ও সভ্যজগতের রীতিনীতি অনুসরণের ধার ধারেনি। মানবাধিকার সংরক্ষণের কোনো তোয়াক্কা করেনি।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে তারা ক্যাঙারু কোর্টে মন গড়া অভিযোগ ও ভুয়া সাক্ষ্যে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদ, তিন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী, বিএনপির সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এ ছাড়া কারামেয়াদ কাটানোর সময় মৃত্যুবরণ করেন জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মাওলানা এ কে এম ইউসুফ, মাওলানা আবদুস সুবহান, বিএনপির আবদুল আলীমসহ আরও বেশ কিছুসংখ্যক নেতা।
জামায়াতের নেতৃত্বকে বিনাশ করে শেখ হাসিনা বিএনপিকে রাজনৈতিক ময়দান থেকে দূরে রাখার জন্য সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছিলেন। আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর মতো কোনো শক্তি না থাকায় তারা দানবে পরিণত হন। নিজেদের গণতন্ত্রের চাদরে ঢেকে কার্যত একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসন চাপিয়ে দিয়েছিল জাতির ওপর। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনার শাসনে মানবাধিকারের কোনো স্থান ছিল না বাংলাদেশে। এ ধরনের পরিস্থিতির আলোকে জাতিসংঘে সাবেক আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্র যখন পরিকল্পিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে শুরু করে, তাহলে তা অস্থিতিশীলতার সুস্পষ্ট ও সম্ভাব্য নির্দেশক, যার অনিবার্য পরিণতি অরাজকতা ও সহিংসতা।’ বাংলাদেশে তাই ঘটেছিল।
শেখ মুজিবকে স্বৈরাচারী হওয়া থেকে ঠেকিয়ে রাখা যেমন কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি, পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করা শেখ হাসিনারও ফ্যাসিবাদী রূপে আবির্ভূত হওয়া কেউ প্রতিহত করতে পারেনি। মানুষ বাকহীন হয়ে পড়লেও নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় ভেতরে ক্ষোভ পুষে রাখা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল? ছাত্র-জনতার সীমিত ক্ষোভ জনগণের ব্যাপক ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটানোর সুযোগ এনে দেওয়ায় শেখ হাসিনার পরিণতি ১৯৭৫-এর আগস্টের অনুরূপ হতে যাচ্ছিল, যা হতে পারেনি সেনাবাহিনীর সময়োচিত পদক্ষেপে।
পরবর্তী পরিস্থিতি দ্রুত গড়িয়েছে। নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সরকার গঠনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। দেশবাসী সুদিনের ও সুশাসনের অপেক্ষা করছে, যার স্বাদ তারা গত ১৯ বছর পায়নি।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রখ্যাত সাংবাদিক




