সব দেশেরই নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রাণ। বাস্তবিক পক্ষে যেকোন জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতি, পরিপক্বতা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং সামাজিক সচেতনতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষার নামই নির্বাচন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- অনেক দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে, নির্বাচন শেষ হওয়ার পরেও উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। সাধারণ মানুষের জীবনে শুরু হয় বর্ণনাতীত যন্ত্রণা। এই নিপীড়ন-নির্যাতন শুধু নির্বাচনের পরে কয়েকদিন চলমান থাকে তা নয়, বরং দিনের পর দিন চলতে থাকে শৃঙ্খল বিক্রিয়ার (chain reaction) মতো। এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার অভিজ্ঞতা আমাদের তাড়িত করেছে। গণতান্ত্রিক চর্চার এই সময়ে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যেকোন সহিংসতা রাষ্ট্র, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর।
নির্বাচন-পূর্ব তর্ক-বিতর্ক বা মনোমালিন্যই নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক সময় একপক্ষের সাথে মতভিন্নতা বা মতদ্বৈততা অপরপক্ষ মেনে নিতে পারেন না। এভাবে বিরোধ সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে সেই বিরোধ সংঘাতে রূপ নেয়। এছাড়াও অন্যের মতাতের গুরুত্ব না দেওয়া, অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, ভিন্নমতের ব্যক্তিকে নির্মূল করার মানসিকতাও রাজনৈতিক সহিংসতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আমার ক্ষেত্রেও সেটি ঘটেছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি আমি ঢাকা মেইল. কম এ ‘বিএনপি’র ক্ষমতায় আসার পথ হবে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ শিরোণামে একটি কলাম লিখি। সেই কলামে আমি বিশ্লেষণ করেছিলাম, ‘বিএনপি’র সাথে জামায়াতের ১০০-১১০ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। ভোটের ব্যবধান ১০ থেকে ২০ হাজার হতে পারে। আর জামায়াত জোট খুলনা বিভাগে সবেচেয় ভালো করবে।
বিজ্ঞাপন
যশোরের ৬টি আসনের মধ্যে ৫টি আসন পাবে। জামায়াত জোট সর্বমোট ৭৫-৮০টি আসন পেতে পারে।’ কলামে আরও অনেক বিষয় পূর্বানুমান করা হয়, যা ৯০ শতাংশ সঠিক হয়েছে। এমনকি জামায়াত জোট ৭৪টি আসনে জয়লাভ করেছে। কিন্তু এই লেখা ছাপা হওয়ার পর পরই বিএনপি’র একজন ঘনিষ্ঠবন্ধু আমাকে বললেন, এই বিশ্লেষণ ঠিক নাই। এটি বিএনপি’র মনোবল ভাঙার জন্য লেখা হলো। পক্ষান্তরে জামায়াতের একজন বললেন, আমরা সরকার গঠন করতে যাচ্ছি। আর আপনি আমাদের দিলেন, ৭৫-৮০ টি আসন। এটি কেমন কথা? উত্তরে আমি বললাম, আমার হিসেবে যা মনে হয়েছে, তাই বিশ্লেষণ করেছি। জামায়াতের সেই বন্ধু আমাকে বললেন, ‘আপনি ছাত্রদল করতেন। আমি তো জানি। এই জন্য এমন লিখেছেন।’ আমি বললাম, এটাই স্বাভাবিক। আপনি যেমন শিবির করতেন।
এরপর তিনি আর তর্ক বাড়ালেন না। তিনি তর্ক না বাড়ালেও আমার ৩ জন টকশো বক্তার কথা মনে পড়লো। যাদের আদ্যক্ষরগুলো নিয়ে আমি নামকরণ করেছি জামাসা। জামাসাগণ যেমন টকশোতে বসে জামায়াতকে ২০-২৫টি আসন বন্টন করতেন। তেমনি অথর্ব এই জামায়াতের টকারের অবস্থা। অবশ্য এতে আমি থেমে যাইনি। কারণ আমার বিশ্বাস জন্মে ছিলো, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে বিএনপি ব্যাপক ব্যবধানে জয়লাভ করবে। আর এই ২ বিভাগেই ৩০০ আসনের মধ্যে ১২৮টি আসন বিদ্যমান। জামায়াতের ভিন্ন চিন্তা বাদ দিয়ে এই ২ বিভাগে রাজনৈতিকভাবে ভালো করার চেষ্টা করতে হবে ভবিষ্যত দিনগুলিতে। তবেই তাদের ও জাতির কল্যাণ।
আমাদের সকলের ভাবতে হবে নির্বাচন একটি সর্বজনীন জাতীয় উৎসব। এটিকে কোনক্রমেই আতংক হতে দেওয়া যাবে না। নির্বাচন হওয়া উচিত নাগরিক অধিকার প্রয়োগের শান্তিপূর্ণ অনন্য উৎসব। কিন্তু যখন রাজনৈতিক দলগুলো ফলাফল মেনে নিতে ব্যর্থ হয়, অথবা সমর্থকদের মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা জন্ম নেয়, তখন সেই উৎসব রূপ নেয় আতংকে। আমাদের দেশে ভোটের দিন শেষ হলেও উত্তেজনা শেষ হয় না; বরং অনেক সময় তা নতুন করে বিস্ফোরিত হয়। পরাজিত পক্ষের ঘরবাড়ি ভাঙচুর, হামলা, অগ্নিসংযোগ কিংবা সামাজিক বয়কট; এসব আচরণ গণতন্ত্রের চেতনাকে কলংকিত করে।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা পুরো সমাজকে বিভক্ত করে। একটি গ্রামে যদি দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, তাহলে সেই বিভাজন বহু বছর ধরে স্থায়ী হয়। একই স্কুলে পড়া শিশুদের পরিবার পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হয়। বাজার, মসজিদ, সামাজিক অনুষ্ঠান, সবখানেই তৈরি হয় বিভেদের ভয়াবহ দেয়াল। সহিংসতার ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। দোকানপাট ভাঙচুর, বাড়িঘর পোড়ানো, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া, এসবের সরাসরি প্রভাব পড়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে। দরিদ্র মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যারা দিন এনে দিন খায়, তাদের জন্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মানে কর্মহীন হয়ে অনাহারে থাকা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব প্রধানত সরকারের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। বিজয়ী দলের সমর্থক হোক বা পরাজিত পক্ষের, কেউ যদি সহিংসতায় জড়ায়, তাকে অতিদ্রুতই আইনের আওতায় আনতে হবে।
বিজ্ঞাপন
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে সহিংসতার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। মানুষ তখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। এটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। নির্বাচনোত্তর সহিংসতা ঠেকাতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় নেতাদের উচিত নির্বাচনের আগেই সমর্থকদের মধ্যে সহনশীলতা ও ফলাফল মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা। বিজয়ী হলে সংযম দেখানো, পরাজিত হলে ফলাফল মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বড় ভূমিকা রাখে। ভুয়া খবর, গুজব বা বিকৃত তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। অনেক সময় একটি মিথ্যা পোস্টই সহিংসতার সূচনা ঘটায়। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো যাচাই-বাছাই করে তথ্য প্রকাশ করা। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। প্রত্যেকটি তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া বিশ্বাস বা প্রচার করা উচিত নয়।
ডিজিটাল যুগে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করলে গণতন্ত্র ঝুঁকির মুখে পড়ে। অপরপক্ষে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ সুদৃষ্টি কাম্য। কারণ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার সবচেয়ে বড় শিকার প্রায়ই সংখ্যালঘু বা দুর্বল জনগোষ্ঠী। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা অনেক সময় সাম্প্রদায়িকতায় রূপ নেয়। এটি নিঃসন্দেহে মানবাধিকার লঙ্ঘন। সাথে সাথে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতিরও পরিপন্থী।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমান অধিকার। নির্বাচন কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ নয়। বরং এটি সমগ্র জাতির যৌথ সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। তাই রাষ্ট্র ও সমাজকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনো নিরীহ নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা তরুণ সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তারা যদি দেখে যে রাজনৈতিক মতভেদ মানেই মারামারি বা ধ্বংসযজ্ঞ, তাহলে তাদের মধ্যে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা কমে যায়। ফলে রাজনীতি হয়ে ওঠে ভীতিকর, নীতিহীন ও সহিংসতার সমার্থক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও মতভেদকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পরিবার থেকেও শিশুদের শেখাতে হবে, ভিন্ন মত থাকা অপরাধ নয়।
ধর্মীয় শিক্ষায়ও সহিংসতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। ইসলামসহ সব প্রধান ধর্মেই অন্যায়ভাবে কারও ক্ষতি করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাজনৈতিক মতভেদের কারণে কারও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া বা প্রাণনাশ করা কোনো নৈতিক বা ধর্মীয় আদর্শে সমর্থিত নয়। নৈতিক শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক চর্চা মানুষের মধ্যে সংযম ও মানবিকতা জাগ্রত করতে পারে। রাজনীতির সঙ্গে নৈতিকতার সংযোগ পুনঃস্থাপন করা জরুরি। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা অনেক সময় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের ফোফল। যদি জনগণ বিশ্বাস করে যে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, তাহলে সহিংসতার সম্ভাবনা কমে। তাই নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। স্বচ্ছতা, পর্যবেক্ষক নিয়োগ, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি, এসব পদক্ষেপ পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সহায়ক। প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার অভাবই অনেক সময় রাস্তায় উত্তেজনার জন্ম দেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শিখতে হবে। গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে, কিন্তু তা সহিংসতায় রূপ নেবে না। এই বিশ্বাস সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংলাপ, আপস এবং সাংবিধানিক পথ। এসবই হওয়া উচিত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র গ্রহণযোগ্য উপায়। ক্ষমতার পালাবদলকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা কোনো সভ্য জাতির জন্য কাম্য নয়। এটি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে, সমাজকে বিভক্ত করে এবং অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সহিংসতার মাধ্যমে রাজনৈতিক বিজয় টেকসই হয় না; বরং দীর্ঘমেয়াদে তা নিজ দলকেও ক্ষতির মুখে ফেলে।
আমাদের প্রয়োজন সহনশীলতা, আইনের শাসন এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব। নির্বাচন হোক প্রতিযোগিতার। কিন্তু ফলাফল হোক শান্তিপূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য। জয়ী পক্ষ দেখাক উদারতা, পরাজিত পক্ষ দেখাক ধৈর্য। রাষ্ট্র নিশ্চিত করুক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার। গণতন্ত্রের শক্তি বন্দুকের নল থেকে আসে না; আসে মানুষের আস্থা, অংশগ্রহণ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান থেকে।
গণতন্ত্রে জয়-পরাজয় স্বাভাবিক বিষয়। আজ যে দল ক্ষমতায়, কাল সে বিরোধী দলে। এটাই রাজনৈতিক চক্রের স্বাভাবিক গতি। কাজী নজরুল ইসলামের ‘সব্যসাচী’ কবিতার অংশবিশেষ এই প্রসংগে বলা যায়, কালের চক্র বক্রগতিতে ঘুরিতেছে অবিরত, আজ দেখি যারা কালের শীর্ষে, কাল তারা পদানত। আজি সম্রাট্ কালি সে বন্দী, কুটীরে রাজার প্রতিদ্বন্দী! কংস-কারায় কংস-হন্তা জন্মিছে অনাগত,তারি বুক ফেটে আসে নৃসিংহ যারে করে পদাহত!
কিন্তু যদি নির্বাচনকে ‘অস্তিত্বের লড়াই’ হিসেবে দেখা হয়, তবে ফলাফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। তখন প্রতিটি নির্বাচন হয়ে দাঁড়ায় সংঘাতের সম্ভাব্য সূচনা। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে প্রতিজ্ঞা করি, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নয়; চাই শান্তি, সংহতি ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা।
লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক




