মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ঢাকা

ভোটাধিকার: গণতান্ত্রিক চর্চা, জনতার উৎসব ও জনপ্রত্যাশা

মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ
প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

নারীর বঞ্চনা: বাল্যবিবাহ, তালাক ও সামাজিক সুরক্ষা

সদ্য সমাপ্ত হলো জাতীয় নির্বাচন। জাতির জন্য এ নির্বাচন বহুল প্রতীক্ষিত। গত ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন দেশব্যাপী এ জাতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। সরকার কঠোর নিরাপত্তা বলয়, শৃঙ্খলা ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করেছে। গতকাল ব্যক্তিগতভাবে ৪ (চার)টি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করি এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক চ্যানেলে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন প্রত্যক্ষ করি। ভোট প্রদানকারীদের মধ্যে চরম উৎসাহ ও উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়েছে। দেশব্যাপী গোটা জাতির মধ্যে উদ্দীপনা ও ঈদের আমেজ অনুভূত হচ্ছে। বাংলাদেশে এক চমৎকার দৃশ্য! ভোটারগণ দলে দলে ও স্বপরিবারে নির্বাচনী কেন্দ্রের দিকে যাত্রা করছে। প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে নারী ভোটার, তরুণ ভোটার ও প্রবীণ ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। এ যেন গণতন্ত্রের অভিযাত্রা এবং গণতন্ত্র মুক্তির অভিযান। দেশের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট প্রদানের সুযোগ পেয়ে চরমভাবে উচ্ছ্বসিত। একটি অংশীদারিত্বমূলক সরকার নাগরিকের প্রত্যাশা। যে ব্যবস্থায় রাষ্ট্র কোনো একক ব্যক্তি, দল, পক্ষ কিংবা চেতনার নয়। বরং এ বিরাজ করবে পূর্ণ গণতান্ত্রিক অবস্থা। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্র সকলের বা সর্বজনীন।

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। যে স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয়তাবাদ, সামাজিক সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হচ্ছে: গণতন্ত্র, মৌলিক মানবাধিকার, স্বাধীনতার নিশ্চয়তা ও মানবসত্তার মর্যাদা। যা একটি পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর আওতায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। গণতন্ত্র (Democracy) শব্দটি গ্রীক শব্দ Demos (জনগণ) ও Kratos (ক্ষমতা বা শাসন) থেকে এসেছে। যার অর্থ ‘জনগণের শাসন’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের একটি আদর্শ সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তাঁর মতে, গণতন্ত্র হচ্ছে “জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের সরকার”। যেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে। এটি এমন এক শাসন কাঠামো যেখানে নাগরিকদের স্বাধীনতা, সমান অধিকার ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা থাকে। এ রাষ্ট্র কাঠামোতে জনগণ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পায়। এ ক্ষেত্রে শাসনক্ষমতা কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে থাকে না। বরং জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। অবাধ গণতান্ত্রিক চর্চায় দেশের সামাজিক সংহতি, শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।


বিজ্ঞাপন


10

দীর্ঘ এক যুগ দেশের জনগণ অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশে ভোট প্রদান করতে পারেনি। শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা ও অধিকার হননের লিপ্সায় দেশের গণতন্ত্র নির্বাসিত হয়েছে বারবার। ২৪ জুলাই গণআন্দোলনের মাধ্যমে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পায়। ফলে নাগরিক আজ পূর্ণ আমেজ নিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করেছে। ভোটারদের সুবিধার্থে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। ভোটারগণ স্বস্ব নির্বাচনী এলাকায় যথাসময়ে পৌঁছে যায়। গত দুই/তিন দিন যাবৎ রেলস্টেশন, বাসস্টেশন ও নৌঘাটে প্রচণ্ড ভিড়। রাজধানী, মহানগর ও গুরুত্বপূর্ণ নগরীসমূহ আজ ফাঁকা। গোটা জাতি যেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে প্রত্যয়ী। আজ নাগরিকগণ অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্র সংস্কারে ঐক্যবদ্ধ। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী আয়োজনের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিতামূলক সরকার গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আজ জনগণ এ সুযোগ সচেতনভাবে গ্রহণ করেছে।

2

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ভোটার অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের জন্য ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রত্যক্ষ ভোটের পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালট ভোটের প্রয়োগ, প্রবাসী ভোট ও কারাগারে আটক নাগরিকদের জন্য ভোট প্রদানের সুযোগ রাখা হয়। নির্বাচন কমিশন সূত্রে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ৫০টি। মোট প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ২৮ জন। যার মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন এবং মোট নারী প্রার্থী ৮১ জন। এ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। মোট ভোটকেন্দ্র সংখ্যা ৪২ হাজার ৬৫৯টি।


বিজ্ঞাপন


18

দেশের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার অনেক বেশি। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন গণতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম মাধ্যম। এ প্রক্রিয়ায় গঠিত সরকার শক্তিশালী, জনবান্ধব ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য হয়। বিগত শতাব্দীর ৯০ দশকে স্বৈরাচারের পতনের মাধ্যমে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সূচনা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে কাস্টিং ভোটের হার ৫৫.৪%। এ ধারাবাহিকতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালে ৭ম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে কাস্টিং ভোটের হার ৭৪.৮২ শতাংশ। ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত হয় ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে কাস্টিং ভোটের হার ৭৪.৯৭ শতাংশ। ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং কাস্টিং ভোটের হার ছিল ৮৭.১৩ শতাংশ। এ নির্বাচনী পরিসংখ্যান প্রমাণ করে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ও হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ভোটারহীন এবং একতরফা (দশম, একাদশ ও দ্বাদশ) সংসদ নির্বাচনে কাস্টিং ভোটের হার ছিল অতি স্বল্প। এ ক্ষেত্রে পূর্ণ গণতান্ত্রিক চর্চা অনুসরণ করা হয়নি। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক। নির্বাচন কমিশন সূত্রে প্রদত্ত ভোটের হার ৬০.৬৯ শতাংশ। যা একটি পূর্ণ গণতান্ত্রিক চর্চার প্রমাণক মর্মে প্রতীয়মান। এ নির্বাচনের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে প্রায় ৪ কোটি নবীন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট প্রদানের সুযোগ পেয়েছে।

6

ভোট প্রদানের সুযোগ নাগরিকের অন্যতম অধিকার। ভোটের মাধ্যমে দেশের নাগরিক রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করে। ভোটের মাধ্যমে জনগণ ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করে। আগামী সরকার প্রদত্ত ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমেই গঠিত হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত সরকার, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক শর্তযুক্ত। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী ও দল একটি ইশতেহারের মাধ্যমে ভোটার বা নাগরিকগণের নিকট প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। নির্বাচিত সরকার বা জনপ্রতিনিধি দেশের নাগরিকের নিকট প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণে নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ। তাই ঘোষিত প্রতিশ্রুতি ও জনগণের মতামতকে প্রাধান্য নিয়ে সরকার পরিচালনা করতে হবে। এতেই একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সাফল্য। এতে জনগণের নিকট সরকারের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণিত হয়। সরকারের সাথে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায় বহুগুণে।

9

সদ্য সমাপ্ত একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক যাত্রার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সুযোগ হয়েছে রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের। দেশের স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রায়নে স্বচ্ছ নির্বাচন চর্চার ধারা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। আগামী সরকার নিশ্চয়ই দলীয় অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তৎপর হবে। নির্বাচিত রাজনৈতিক দল হিসেবে জনকল্যাণমূলক দর্শনের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ নিক। নতুন সরকার নিশ্চয়ই রাষ্ট্রকে উন্নয়নের উৎকর্ষতায় উপনীত করবে। অন্যথায় জননিগৃহীত হবে একদিন। যার অন্যতম দৃষ্টান্ত বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা শুভ হোক। নবগঠিত সরকার হোক কল্যাণের, উন্নয়নের ও নৈতিক দর্শনের। সামাজিক সংহতি ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা হোক সকলের অঙ্গীকার। আগামী নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য আগাম শুভকামনা।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর