বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ঢাকা

স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: নির্বাচনি ইশতেহারে কেন ফুটনোট?

সাইদুল ইসলাম
প্রকাশিত: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:২০ পিএম

শেয়ার করুন:

জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছে। বিএনপি, জামায়াত ও নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি- সবাই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও তরুণদের কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি স্টার্টআপ খাত এসব ইশতেহারে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে- সে প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে সামনে এসেছে।

বাংলাদেশ একটি তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু সরকারি ও প্রথাগত বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। এই বাস্তবতায় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাভিত্তিক অর্থনীতি শুধু বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য। তাই রাজনৈতিক ইশতেহারে স্টার্টআপ খাতের অবস্থান বিশ্লেষণ করা জরুরি।


বিজ্ঞাপন


বিএনপির ইশতেহার: প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট, তবে রোডম্যাপ অসম্পূর্ণ

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে স্টার্টআপ ও উদ্ভাবন খাতকে তুলনামূলকভাবে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ১০ বছরের করমুক্ত সুবিধা, ভর্তুকিযুক্ত ঋণ এবং স্টার্টআপ তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নাগরিক ও প্রবাসীদের অংশগ্রহণে আইনি কাঠামোর আওতায় জাতীয় ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম চালুর ঘোষণাও রয়েছে, যা স্টার্টআপে বিনিয়োগের নতুন দরজা খুলতে পারে।

এই প্রতিশ্রুতিগুলো নিঃসন্দেহে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য ইতিবাচক। তবে ইশতেহারে স্পষ্ট নয়- এই তহবিল কীভাবে পরিচালিত হবে, ক্রাউডফান্ডিংয়ের নিয়ন্ত্রক কাঠামো কী হবে, কিংবা করমুক্ত সুবিধা বাস্তবে উদ্যোক্তাদের জন্য কতটা সহজলভ্য হবে। ফলে বিএনপির ইশতেহারে স্টার্টআপ খাত স্বীকৃতি পেলেও, পূর্ণাঙ্গ নীতিগত রোডম্যাপ এখনো অনুপস্থিত।

জামায়াতের ইশতেহার: Employment and Entrepreneurship Ecosystem, কিন্তু স্টার্টআপ অস্পষ্ট


বিজ্ঞাপন


জামায়াতের ইশতেহারে Employment and Entrepreneurship Ecosystem গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে, যা কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের একটি বিস্তৃত ধারণা তুলে ধরে। আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি, নৈতিক ব্যাবসা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়ার মধ্য দিয়ে জামায়াত মূলত একটি সমন্বিত কর্মসংস্থান কাঠামোর কথা বলেছে।

তবে এই ইকোসিস্টেমের ভেতরে প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ, ইনোভেশন, ভেঞ্চার ফান্ডিং বা গ্লোবাল মার্কেটে প্রতিযোগিতামূলক উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়গুলো খুব একটা স্পষ্ট নয়। স্টার্টআপ খাত এখানে একটি আলাদা অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে নয়, বরং সামগ্রিক উদ্যোক্তা ধারণার ভেতর মিশে গেছে। ফলে তরুণদের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে কীভাবে এই ইকোসিস্টেমে এগিয়ে নেওয়া হবে- সে প্রশ্নের উত্তর ইশতেহারে নেই।

এনসিপির ইশতেহার: উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য, কাঠামোগত ঘাটতি

এনসিপির ইশতেহারে তরুণ ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পাশাপাশি স্টার্টআপগুলোর বিনিয়োগ সুবিধা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় স্টার্টআপ ডাটাবেইজ তৈরির কথাও বলা হয়েছে- যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংযোগ সহজ হতে পারে।

এনসিপির এই দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলকভাবে আধুনিক ও ডেটা-কেন্দ্রিক। তবে এখানেও বড় প্রশ্ন থেকে যায়- এই এক কোটি কর্মসংস্থান কোন খাতে, কীভাবে তৈরি হবে? স্টার্টআপ ডাটাবেইজ থাকলেও বিনিয়োগ নিরাপত্তা, করনীতি, রেগুলেটরি সংস্কার ও সরকারি সহায়তার কাঠামো ছাড়া তা কতটা কার্যকর হবে- সে বিষয়ে ইশতেহার নীরব।

তাহলে কেন স্টার্টআপ এখনো ফুটনোট?

তিনটি ইশতেহার তুলনা করলে দেখা যায়-

* বিএনপি কিছু নির্দিষ্ট আর্থিক প্রণোদনার কথা বলেছে।
* জামায়াত একটি বিস্তৃত Employment and Entrepreneurship Ecosystem-এর কথা তুলেছে।
* এনসিপি উচ্চাভিলাষী কর্মসংস্থান লক্ষ্য ও ডাটাবেইজের প্রস্তাব দিয়েছে।

তবুও কোথাও স্টার্টআপ খাতকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। সম্ভবত কারণ একটাই- স্টার্টআপ এখনো ভোটের রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে না। এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, ধৈর্য ও নীতিগত ধারাবাহিকতার বিষয়- যা ইশতেহারের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠে নাই।

কী থাকা দরকার ছিল?

স্টার্টআপ ও তরুণদের বাংলাদেশ কেবল একটি আকর্ষণীয় স্লোগান নয়; এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সেই জায়গা থেকেই প্রশ্ন উঠে- বর্তমান নির্বাচনি ইশতেহারগুলোতে আসলে কী কী থাকা দরকার ছিল, যা এখনো অনুপস্থিত বা অপর্যাপ্ত?

প্রথমত, প্রয়োজন ছিল স্টার্টআপকে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে স্বীকৃতি। কৃষি, রপ্তানি বা শিল্পখাতের মতো স্টার্টআপ খাতকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহারে তুলে ধরা উচিত ছিল। শুধু উদ্যোক্তা বা কর্মসংস্থানের সাধারণ আলোচনায় স্টার্টআপকে অন্তর্ভুক্ত না করে, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে এর ভূমিকা স্পষ্ট করা দরকার ছিল।

দ্বিতীয়ত, স্টার্টআপ-বান্ধব আইন ও রেগুলেটরি সংস্কারের রোডম্যাপ থাকা জরুরি ছিল। কোম্পানি নিবন্ধন, বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ, শেয়ার হস্তান্তর, দেউলিয়াত্ব আইন, এক্সিট পলিসি- এই বিষয়গুলো বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। ইশতেহারে এগুলোর সময়সীমাসহ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থাকলে তা বাস্তবতার সঙ্গে আরও বেশি সংযুক্ত হতো।

তৃতীয়ত, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন ছিল। স্টার্টআপ ফান্ড, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও এঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে- ফান্ডের উৎস, পরিচালনা কাঠামো, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা দরকার ছিল। একই সঙ্গে কর ছাড়ের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি হ্রাসের ব্যবস্থাও থাকা উচিত ছিল।

চতুর্থত, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় (Public Procurement) স্টার্টআপের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার জরুরি ছিল। অনেক দেশেই সরকারই স্টার্টআপের প্রথম বড় ক্রেতা। ডিজিটাল সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি বা নগর ব্যবস্থাপনায় সরকারি প্রকল্পে স্টার্টআপ অন্তর্ভুক্তির নীতি ইশতেহারে থাকলে তা বাস্তব কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিত।

পঞ্চমত, স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও মেন্টরশিপভিত্তিক উদ্যোক্তা উন্নয়ন কাঠামো স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল। শুধু অর্থায়ন নয়, স্টার্টআপ টিকে থাকে দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা ও নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগ, ইনকিউবেশন সেন্টার, অ্যাক্সেলারেটর প্রোগ্রাম এবং অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের মেন্টরশিপ কাঠামো ইশতেহারে থাকা জরুরি ছিল।

ষষ্ঠত, তরুণ ও নারীবান্ধব স্টার্টআপ নীতি আলাদাভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল। গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলের তরুণ, নারী উদ্যোক্তা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও ফান্ডিং ব্যবস্থার কথা ইশতেহারে উল্লেখ থাকলে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির প্রতিফলন ঘটত।

সবশেষে, প্রয়োজন ছিল বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির স্পষ্ট কাঠামো। কোন মন্ত্রণালয় বা সংস্থা দায়িত্বে থাকবে, কীভাবে অগ্রগতি পরিমাপ করা হবে এবং নির্বাচনের পর কত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান ফল পাওয়া যাবে- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তরুণ ও উদ্ভাবনী শক্তির ওপর। রাজনৈতিক দলগুলো এখন সেই বাস্তবতা স্বীকার করতে শুরু করেছে, কিন্তু ইশতেহারে তার প্রতিফলন এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়। স্টার্টআপ খাত কোথাও প্রতিশ্রুতি, কোথাও ধারণা, আবার কোথাও কেবল ফুটনোট হিসেবেই রয়ে গেছে। প্রশ্ন তাই থেকেই যায়- স্টার্টআপ ও তরুণদের বাংলাদেশ কি একদিন ইশতেহারের মূল লেখায় জায়গা পাবে, নাকি ভবিষ্যৎ গড়ার এই শক্তি সবসময় প্রান্তেই থেকে যাবে?

লেখক: সভাপতি, স্টার্টআপ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-স্যাব ও নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট- সিজিডি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর