ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কড়া নাড়ছে সারাদেশে। অংশগ্রহণকারী সব দলের প্রার্থীরা নিজ নিজ সংসদীয় আসনের ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সারাদেশে চষে বেড়াচ্ছেন। একটাই উদ্দেশ্য ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করা।
রাতদিন এক করে ফেলছে সবাই। ১৯৯১-এর সাধারণ নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। রাত ১টা, ২টা কিংবা ৩টায় জনসভা করছেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। ভোটাররাও নিজেদের নেতার কথা শোনার জন্য, দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। অনেক আশ্বাসের বাণী শোনাচ্ছেন সংসদ সদস্য প্রার্থীরা।
বিজ্ঞাপন
শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় আবার সহিংসতা, কাঁদা ছোড়াছুড়িও দেখছি। গ্রাম থেকে শহর নির্বাচনকেন্দ্রিক অস্থিরতাও দেখছি। বাংলাদেশে স্বীকৃত বড় দুটো দলের কথা উল্লেখ করলেই সর্বপ্রথম চলে আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর নাম।
বাংলাদেশের জনগণের কাছে স্বৈরাচারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া আওয়ামী লীগ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। কিন্তু নির্বাচনের মাঠে না থেকেও অংশগ্রহণকারী দলগুলোর কাছে আওয়ামী লীগের সরব উপস্থিতি রয়েছে নানাভাবে। এ উপস্থিতি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সংশয়ের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সংস্কার কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে গণভোটের ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে।
আবার ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের সমর্থকরা সহাস্যে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনকে সাধুবাদ জানাবে তা ভাবারও কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না।
একটি দেশের গণমাধ্যম অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। বিগত সময়ে দেখা গেছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাংবাদিকতা নিজেদের লেখনীতে, বক্তব্যে, বুঝিয়ে দিতেন তারা আওয়ামী সমর্থক সাংবাদিক।
বিজ্ঞাপন
আবার গণমাধ্যমগুলো সরকারের লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে স্বাধীন গণমাধ্যমের সংজ্ঞাই পরিবর্তন করে দিয়েছে। ঠিক বর্তমান সময়ে কিছু কিছু গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদেরও একই ভূমিকায় উপনীত হতে দেখছি। যা অশনি সংকেত হিসেবে প্রতীয়মান।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন পরবর্তী যে সরকারই আসুক সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকা পূর্বের মতোই প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে বলেই আশঙ্কা হচ্ছে।
স্বাধীন সাংবাদিকতা একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে পরামর্শ দিয়ে বিভ্রান্ত না করে সঠিক দিক নির্দেশনার মাধ্যমে দেশের মঙ্গল ও উন্নয়নমুখী করার দিকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দলীয় সাংবাদিক সৃষ্টি না করে স্বাধীন সাংবাদিকতা করতে দিয়ে তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া।
বিগত সরকারের ভুলগুলো স্মরণ করে যারা ভবিষ্যৎ সরকার গঠন করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছেন, তারা যেন গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করে দেয়। তাহলে দেশের গণমাধ্যম ছায়া সরকার হয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারবে। যাতে মঙ্গল হবে সরকারের, মঙ্গল হবে দেশের আপামর সাধারণ জনগণের।
আরও পড়ুন
এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও তার সমর্থিত কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জনসমাবেশ এবং জামায়াতে ইসলামী ও তার সমর্থিত ১০ দলীয় জোটের নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচার প্রচারণা দেখলে বিগত সরকারের দলীয় সমাবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়।
জনসভায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিত থাকতো, কিন্তু ভোটের দিন সবাই সরকারের সাধারণ ছুটি ভোগ করতো। ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার প্রবণতা দেখা যেত। ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকার আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা চোখে পড়ছে না।
বিগত ১২টি নির্বাচনের মধ্যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের আমলে তিনটি নির্বাচন নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ যেমন ভোটারবিহীন নির্বাচন, নিশিরাতের নির্বাচন কিংবা আমি-ডামি’র নির্বাচন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, ১৯৮৮ সালের জেনারেল এরশাদের সময়কালীন বিএনপি বিহীন নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল অতি সামান্য।
বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় গ্রহণযোগ্য প্রতিটি নির্বাচনে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে অনীহা প্রকাশ করেছে। দিনটি সরকারি ছুটির আদলে স্বেচ্ছায় ছুটি ভোগ করতে। নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা এবং প্রবাসে অবস্থান করা ভোটারগণ ভোট দিতে না পারাও ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশ থেকে ভোট প্রদান করার সুযোগ রয়েছে সাথে ভোটের দিন নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিগণ ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অনুপস্থিতি ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
বিদেশের মিশনগুলো প্রবাসীদের ভোট প্রদান করতে তেমন একটা উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি। সরকারের মিশনগুলো পর্যাপ্ত গণসংযোগ করার জন্য সংবাদমাধ্যমের সহযোগিতা নিতে পারেনি। সরকার প্রথমদিকে যত না জুলাই আন্দোলনের ফলে সংস্কার কর্মসূচির প্রতি দৃষ্টিপাত করেছে ঠিক ততটা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতি দৃষ্টিপাত করেনি।
ফলে গণভোটের প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়ার ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে তেমন একটা প্রচারণা দেখা যাচ্ছে না। ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করছে রাজনৈতিক দলগুলো। সেখানে দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
সরকারের দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য বিশেষ করে লক্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
নতুবা ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক না হওয়ার সম্ভাবনা আছে। চার কোটি ভোটারের কাছে জাতীয় সংসদে ভোট প্রদান একটি নতুন অধ্যায়। তাদের উপস্থিতিকে সন্তোষজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া নির্বাচন কমিশনের অন্যতম কার্যাদির তালিকায় থাকা উচিত।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট

