আগামীর বাংলাদেশ কেমন করতে চায় এ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে একটিপলিসি সামিটের আয়োজন করে যেখানে ৩১ দফা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। জামায়াতে ইসলামীর দিনব্যাপী এই সামিটে বিশিষ্ট ব্যক্তি, কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের সূচনা ও সমাপনী বক্তব্য রাখেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী এমন একটি রাষ্ট্র গঠনে বিশ্বাস করে যেখানে আধুনিক বাজার অর্থনীতি কার্যকর থাকবে, প্রশাসনিক কাঠামো হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক এবং ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ পাবে। তার ভাষায়, উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তা ন্যায়, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। তরুণদের দেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান ‘ইঞ্জিন’ হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, নতুন বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় যুব কর্মসংস্থান সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানহীন তরুণ সমাজ কোনো দেশের জন্য বড় ঝুঁকি আর কর্মক্ষম তরুণ সমাজই পারে একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে। তিনি একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন, যেখানে স্বচ্ছ বাজার অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে একটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক পরিবেশ, শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী আপসহীন থাকবে। দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছতা বজায় না থাকলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষাকে জামায়াত আমীর কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি ‘পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর দলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী প্রায় পাঁচ লাখ সদস্য রয়েছেন, যারা দেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতি, ধর্ম বা লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষায় তার দল অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে এবং এ বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ঐক্যের মধ্যদিয়েই একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখেনি।
পলিসি সামিটে ঘোষিত দলের পরিকল্পনার মধ্যে আছে-
বিজ্ঞাপন
১. দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। ২.ট্যাক্স ও ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) বর্তমান হার থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। ৩. স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু করা হবে (এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা এক কার্ডে)। ৪. আগামী ৩ বছরে সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়ানো হবে না। ৫. বন্ধ কলকারখানা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে চালু এবং ১০% মালিকানা শ্রমিকদের প্রদান করা হবে। ৬. ব্যবসাবান্ধব পলিসি তৈরি করা হবে। সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ৭. ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে। ৮. গ্রাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে ৫ লাখ গ্রাজুয়েটকে সর্বোচ্চ ২ বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ (কর্জে হাসানা) প্রদান করা হবে। ৯. মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেওয়া হবে।
১০. প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ প্রদান করা হবে। গরিবের মেধাবী সন্তানও যেন হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজে পড়তে পারে। ১১. ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনোমিক্স কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১২. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে। ১৩. সকল নিয়োগ হবে মেধাভিত্তিক। ১৪. ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ও ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে। ১৫. ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১৬. ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা হবে।
১৭. দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১৮. ৫ বছরে ১ কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ১৯. প্রতিটি উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন করা হবে। ২০. প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে ৫ বছরে ৫০ লাখ জব এক্সেস নিশ্চিত করা হবে। ২১. নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে। ২২. ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে। ২৩.স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা হবে। ২৪. আইসিটি সেক্টর উন্নয়নে ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা করা হবে। ২৫. ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ আইসিটি জব সৃষ্টি ও প্লেসমেন্ট করা হবে। ২৬. ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রফতানির জন্য ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন করা হবে। ২৭. আইসিটি সেক্টর থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার রফতানি আয় করার লক্ষমাত্রা গ্রহণ করা হবে। ২৮. আইসিটি খাতে সরকারের ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় সাশ্রয় লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। ২৯. শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। ৩০. দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে ৫-৭ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি করা হবে। ৩১. অর্থনৈতিক রেমিট্যান্সের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশি প্রফেশনাল, গবেষক, শিক্ষকদের দেশে নিয়ে আসা হবে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসেবে।

আগামীর বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে হলে প্রয়োজন টেকসই অর্থনীতি পলিসি। এজন্য বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অর্থনীতিকে গতিশীল করতে প্রতিবছর অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার মানসম্পন্ন বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন।আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় ৫১৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ অর্থবছরে বাস্তব প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৭ থেকে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে, যা আগের বছরের তুলনায় কম। ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ ধরা হয়েছে ৪ দশমিক ৮ থেকে ৫ শতাংশ। বিশ্লেষকরা মনে করেন সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা গতিশীল হলে জিডিপি বৃদ্ধি পায়। ২০২৬ সালে দেশটি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। ফলে রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো ও বৈদেশিক ঋণের সুদের হার বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এ বাস্তবতা মাথায় রেখেই নতুন সরকারকে অর্থনীতি পরিচালনা করতে হবে। জামায়াতের পলিসি এ যে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে তা দেশকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে । এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়েছে তার মধ্যে দৃর্নীতিকে জিরো টলারেন্স এ নিয়ে আসা। এটা সম্ভব হলে একদিকে যেমন ব্যয় কমবে ও তেমনি আয় বাড়বে। করের হার পর্যায় ক্রমে কমানোর কথা বলা হয়েছে এজন্য করের আওতা বাড়াতে হবে। রাজস্ব আহরণে হার বাড়াতে হবে এজন্য স্বচ্ছতার বিকল্প নেই। অর্থনীতিকে গতিশীল করতে প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হবে। রপ্তানি ক্ষেত্রে শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে চামড়া,জুতা, চা, চিংড়িসহ আরও আইটেম বাড়াতে হবে যেগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি করে রপ্তানি বাড়াতে হবে।
গত ষোলটি বছর ব্যাংক, নীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপেক্ষিত কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জট। দুর্নীতি সরাসরি প্রবৃদ্ধি কমায়, উন্নয়ন হ্রাসকরে। দুর্নীতির আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্তহীন প্রশাসন বিনিয়োগের বড় শত্রু হয়ে উঠেছে। জামায়াতের পলিসি সামিটে এ দূর্নীতিকে দূর করার কথা বলা হয়েছে যা পূরা অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে। কৃষি হলো আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি শক্তি। কৃষিতে যান্ত্রিকতা সংযোগ করতে হবে। দেশে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কৃষিতে কাজ করলেও জিডিপিতে এর অবদান ১৩–১৪ শতাংশ। যারা ক্ষমতায় যাবে তাদের কে কৃষি নিয়ে আরো যুগোপযোগী ও উৎপাদনমুখী পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রতিবছর ২০ লাখের বেশি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কর্মক্ষম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৮ শতাংশ। এ সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত থাকবে। কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে এ জনসংখ্যা সুবিধা নয়; বরং বোঝায় পরিণত হবে। যুব বেকারত্ব ইতিমধ্যে ১১–১২ শতাংশে পৌঁছেছে। মূল সমস্যা দক্ষতার অভাব।
পলিসি সামিটে বন্ধ কলকারখানা পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপে চালু এবং ১০% মালিকানা শ্রমিকদের প্রদান। কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা।গ্রাজুয়েশন শেষে চাকুরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে ৫ লক্ষ গ্রাজুয়েটকে সর্বোচ্চ ২ বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ প্রদান (কর্জে হাসানা)। এসব নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা আগামীর বাংলাদেশ গঠনে নতুন পথ দেখাবে। কৃষিকে সমৃদ্ধ করবে ও শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার

